নির্বাচন পূর্ব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

নিউজ ডেস্ক: বছরজুড়ে রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে আবর্তিত হলেও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। নির্বাচন-পূর্ব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জাতিসংঘের প্রতিনিধিও আসতে পারেন প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতি দেখতে। প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে তাদের ঢাকা মিশনের মাধ্যমে নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাস্তবতা থেকে কূটনৈতিক হিসেবনিকেশ চলছে এ নির্বাচনকে ঘিরে।

মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে ভারত-চীনের কূটনৈতিক অবস্থান কী হয়, তা নিয়ে ইতিমধ্যে যথেষ্ট ঔৎসুক্য দেখা দিয়েছে পশ্চিমা মহলে। এখন পর্যন্ত সরকারি দল আওয়ামী লীগ দক্ষতার সঙ্গে ভারত ও চীন উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে।

কৌশলগত আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত, চীন, জাপানসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত প্রভাবশালী দেশগুলো। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিও সতর্ক লক্ষ্য রয়েছে এসব দেশের। এর আগে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন উগ্র ধর্মান্ধ দলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বিএনপি পশ্চিমা দেশগুলোর আস্থা হারায়। আবার বিএনপি সরকারের আমলে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দশ ট্রাক অস্ত্র চালান করার প্রচেষ্টায় এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ঢাকায় এলে তার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাক্ষাৎ বাতিল করার ঘটনায় ভারতেরও চূড়ান্ত আস্থা হারায় বিএনপি। সার্বিক অবস্থায় বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চীনও বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেনি। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আওয়ামী লীগ তার অবস্থান অনেক বেশি দৃঢ় করতে সমর্থ হয়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গত এক বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র এবং বিতর্কিত আইন প্রণয়নের মতো ঘটনায় পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রমকে খানিকটা সমালোচনার দৃষ্টিতেই মূল্যায়ন করেছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভূমিকা নিয়ে কয়েক মাসে পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও সমালোচনাধর্মী বিবৃতি দিয়েছেন। সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ আইন পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদও। পশ্চিমা দেশগুলোর এ অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করতে চাইছে বিএনপি ও তাদের সমমনারা। গত পাঁচ মাসে বিএনপির পক্ষ থেকে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, বার্তাও পাঠানো হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নানা শঙ্কার কথা নানা মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে জানিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে ইউরোপে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় প্রবাসীদের অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর, মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাতেও ছুটে বেড়িয়েছেন। তাদের এ তৎপরতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে ধর্মীয় মৌলবাদী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক এখনও চলমান থাকায় দলটিকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তেমন ঘটেনি বললেই চলে।

এদিকে কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির চিত্রসহ নানা ইতিবাচক চিত্র পশ্চিমা বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ সময় আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে একই সঙ্গে ভারত ও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে। সরকার একই সঙ্গে ভারত ও চীনকে বিনিয়োগের সুবিধা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে আস্থায় এনে আস্থার সম্পর্ক দৃঢ় করেছে। সব মিলিয়ে এখনও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আওয়ামী লীগই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দেশের পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগী মিত্র রাষ্ট্রগুলো এ দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। এ ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান সে দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসা বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যেই তুলে ধরেছেন। তবে বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত আগামী জাতীয় নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সংশয় এখনও কাটেনি। এ কারণেই নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিস্থিতি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলো।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরই বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষজ্ঞ দলের। সংস্থার প্রথা অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন দেশেই নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিনের এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে। এই রেওয়াজ অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশেও তিন পর্বে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই এ বিশেষজ্ঞ দলের ঢাকায় আসার তারিখ চূড়ান্ত হবে। দলটি তিন সপ্তাহ অবস্থান করবে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিও বাংলাদেশ সফর করতে পারেন। এর আগে ২০১৩ সালেও তৎকালীন নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে এসেছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ফার্নান্দেজ অস্কার তারানকো। এবারও পরিস্থিতি সাপেক্ষে একই পর্যায়ের কেউ ঢাকা সফরে আসতে পারেন। এ ছাড়া কমনওয়েলথ, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের একাধিক প্রতিনিধিরও আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে ভারতেও এই নির্বাচন হবে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ভারত কোন চোখে বিবেচনা করছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী অন্যান্য দেশেরও বিপুল ঔৎসুক্য রয়েছে। কারণ, এর আগে মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার নির্বাচনে প্রায় প্রকাশ্যেই ভারত-চীন টানাপড়েন দেখা গেছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে এমন টানাপড়েন দেখা না গেলেও আঞ্চলিক রাজনীতি ও স্বার্থের বিষয়কে কেউই হালকাভাবে দেখছে না।

দিল্লির একটি সূত্র জানাচ্ছে, বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ভারত কখনই কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে- কোন বিশেষ দলের সঙ্গে নয়। ভারত বিশ্বাস করে, বাংলাদেশে জনগণের রায়েই সরকার নির্বাচিত হবে।

রাজনীতি কিংবা নির্বাচনকে ঘিরে চীনের কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা প্রকাশ্যে কখনও দেখা যায়নি, এখনও যাচ্ছে না। দেশটি বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আর চীনের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। এই কূটনৈতিক অবস্থান জাপান এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রেও অনেকখানি প্রযোজ্য। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে এ দেশগুলোর অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর বিপরীতই বলা চলে।