রাফায়েল দুর্নীতির নেপথ্য রাজনীতি

যুদ্ধ করলে অস্ত্র প্রয়োজন। এজন্য গড়ে উঠেছে অস্ত্র কোম্পানি। আর এই অস্ত্র কোম্পানি ঘিরে রয়েছে এক দালাল চক্র। যাদের কাজ বিভিন্ন দেশের সরকারকে মোটা অঙ্কের কমিশন খাইয়ে অস্ত্র কেনাতে রাজি করানো। অস্ত্র কেনার কমিশন তো আর চাল ডাল কেনার কমিশনের সমান নয়। এটা এমনই এক অঙ্ক যেখানে শত কোটি চলে যায় ব্যক্তি বিশেষের ফান্ডে। 
 
আর এ কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে অস্ত্র কেনা বেচা নিয়ে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে। এসব কেনা বেচায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ইস্যু অভিযোগ হিসেবেই থেকে যায়। মামলা করে এসব দুর্নীতি ধরা যায় না। কারণ অস্ত্র বিক্রির কমিশন তো কেউ একা খায় না। এর ভাগবাটোয়ারা হয় কয়েকজনের মধ্যে। আর এ কারণে এসব বিষয় যখন আদালতে উঠে তখন কেউ কারো বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় না। কান টানলে মাথা আসার মত পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন।
 
 ভারতে বোফোর্স কেলেঙ্কারি, বাংলাদেশে মিগ কেলেঙ্কারি সব অভিযোগ পর্যন্তই নথিভুক্ত। ভারতে তেমনি রাফায়েল কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজনীতি সরগরম। কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে রাফায়েল কেলেঙ্কারির অভিযোগ এনেছে। ফ্রান্সের জঙ্গি বিমান নির্মাণ সংস্থা ড্যাসল্ট এই রাফায়েল বিমান তৈরি করে। রাফায়েল জঙ্গি বিমান এতটাই অত্যাধুনিক যেটা যুক্তরাষ্ট্রে ৪ টা এফ-১৬ জঙ্গি বিমানকে এক সঙ্গে কাউন্টার দিতে পারে বলে মনে করা হয়। ফ্রান্সের বিমান বাহিনী এই যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করে থাকে। ভারত ফ্রান্সের কাছ থেকে ৩৬ টি রাফায়েল বিমান কেনার চুক্তি করে। আর কিছু বিমান ভারতের মাটিতে তৈরি হবে। এজন্য ড্যাসল্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় আম্বানি গোষ্ঠীর।  
 
রাহুলের অভিযোগ রাফায়েল কিনতে ভারতকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে ফ্রান্স কে। আর এটা মোদীর জন্য হচ্ছে। তিনি নিজের পকেট ভারী করেছেন রাফায়েল চুক্তিতে। রাহুল গান্ধী রাফায়েল বিমানের দাম একেক সময়ে একেক রকম বলেছেন। কখনও তিনি রাফায়েল জঙ্গি বিমানের দাম ৫০০ কোটি রুপি, ৬০০ কোটি রুপি কিংবা ৭৫৪ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করেছেন। 
 
অন্যদিকে ফ্রান্স থেকে আনতে প্রতিটি রাফায়েল বিমানের দাম ধরা হয়েছে ১৪০০ কোটি রুপি। তারপর আছে এই চুক্তির পিছনে কাজ করেছে অনিল আম্বানীর কোম্পানি। তাদের কারণে রাফায়েল চুক্তি হয়েছে। ভারতে এই আম্বানি কোম্পানি একটি ঠগবাজ কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে শেয়ার কেলেঙ্কারির জনক হিসেবে যেমন দরবেশ বাবার নাম করা হয় তেমনি ভারতে শেয়ার কেলেঙ্কারির দরবেশ হচ্ছে এই আম্বানি গ্রুপ। এদের বাপ ধীরুভাই আম্বানি ছিলেন সবকিছুর স্রষ্টা। উনি মারা গেলে দুই ভাই মুকেশ ও অনিল আম্বানি পুরো সম্পত্তির মালিক হয়। শেয়ার কেলেঙ্কারি নিয়ে যখন এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে তখন দুই ভাই আলাদা হওয়ার ঘোষণা দেয়। যাতে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না হয়। এভাবে কংগ্রেস সরকারের আমলে এরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠে।
 
 এখন এই কলা গাছ হাতি হয়ে ভারতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। বলা হয় মোদী সরকারকে ক্ষমতায় আনতে এই আম্বানিরা বহু টাকা ব্যয় করেছে। তাই মোদীর বড় বড় চুক্তিতে রয়েছে এই আম্বানি গ্রুপ। আর এ কারণে রাহুলের ক্ষোভ এই আম্বানিদের ওপর। যারা রাফায়েল চুক্তির সঙ্গে জড়িত আছে। রাহুলের উদ্দেশ্য এক ঢিলে দুই পাখি মারা। মোদীকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করে আম্বানিকে নিজেদের কব্জায় আনা। 
 
ভারত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র চুক্তি করছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে যেসব চুক্তি হচ্ছে তা নিয়ে কংগ্রেস কিন্তু কোনো ক্ষোভ দেখাচ্ছে না। সেই সব চুক্তি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছে না রাহুল গান্ধী। শুধু রাফায়েল নিয়ে রাহুল রাজনীতির মাঠ গরম করছে। তার লক্ষ্য আম্বানি গ্রুপকে বাগে আনা। যাতে আগামী লোকসভা নির্বাচনে আম্বানি গ্রুপ কংগ্রেসের হয়ে কাজ করে।
 
  ভারত কারও সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। তবে কেন এই অস্ত্র কেনা হচ্ছে? পাকিস্তানকে শায়েস্তা করার জন্য অস্ত্রের মজুদ ভারতের বহু আগেই ছিল। চীনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের কথা বলা হলেও বিভিন্ন অর্থনৈতিক ফোরামে চীন-ভারত বন্ধু, যেমন ব্রিকস। চীন-ভারত দুদেশের মধ্যে রয়েছে হাজার কোটি রুপির লেনদেন। যে কারণে ডোকলাম নিয়ে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা চললেও তা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়নি। এমন অবস্থায় ভারত রাশিয়া থেকে উচ্চ প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
 
 যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ভারতকে মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাশিয়া ভারতকে পুরান মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে। তাহলে বিশ্বে ভারতের শত্রু কারা? যে পাকিস্তানকে ভারতের চিরশত্রু বলা হয় সেই আইএসআই নির্বাচিত ইমরান সরকার মুকিয়ে আছে ভারতে সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। তাহলে বর্তমান বিশ্বে ভারতের শত্রুটা কে? কার জন্য ভারতের এই অস্ত্র কেনা ও তা নিয়ে অর্থ কেলেঙ্কারির গল্প?
 
সুমন দত্ত
লেখক সাংবাদিক
তথ্যসূত্র. টাইমস অব ইন্ডিয়া, জিনিউজ, দ্যা হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস