সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না

আবু সালেহ রনি: ‘রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ?’ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নৃশংস গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এই প্রশ্ন রেখে আদালত বলেছেন, ‘রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।’

গতকাল বুধবার চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলা হয়েছে। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অপরাধ প্রমাণে ১৪টি বিবেচ্য বিষয়সহ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন আদালত।

১৪ বছর অপেক্ষার পর সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া আলোচিত এ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ১৯৭১ সালের বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রক্ত ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। আইনের শাসন গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তি এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা চালিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ও লাল-সবুজের পতাকাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালায়।

বিচারক আরও বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বিচার না চালানোর প্রচেষ্টা চালানো হয় ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি বঙ্গবন্ধু হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। জাতির পিতাকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে (তৎকালীন বিরোধী দল) নেতৃত্বশূন্য করার হীনচেষ্টা চালানো হয়।

‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’- এই উদ্বৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। এতে তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের (বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার) সহায়তায় প্রকাশ্যে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সামনে যুদ্ধে ব্যবহূত হয় এমন স্পেশাল মারণাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে, কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ?

‘সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না’- মন্তব্য করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বলেন, ‘সাধারণ জনগণ চায়, যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করতে। সেই সভা-সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এই ধারা চালু থাকলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনগণ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে।’ পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, আদালত এমন নৃশংস বর্বরোচিত হামলার মতো কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না।

গ্রেনেড হামলায় আহত কয়েকজনের বিষয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘মারাত্মকভাবে জখম হয়ে দেশে-বিদেশে চিকিৎসা নিয়েও এখনও অনেকে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন, যাদের চোখে ঘুম নেই, গ্রীষ্ম বা শীত সব সময়ই শরীরের বিভিন্ন অংশে স্প্লিন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন, যাদের পরিবারের সুস্থ সদস্যরাও প্রাণহীনভাবে বেঁচে আছেন। ঘটনার সময় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ডান কানে গুরুতর জখম হয়।’ তাই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে উল্লেখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলেও মনে করেন আদালত।

সূত্র: সমকাল