নির্বাচনী রাজনীতির নানা মাত্রা

আহমদ রফিক: বাংলাদেশে এ বছরটি নির্বাচনের ঘনঘটায় বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। বহু উচ্চারিত এ কথাটির প্রমাণ মিলছে প্রতিদিনের বিচিত্র ঘটনায়। জাতীয় সংসদের নির্বাচন সামনে রেখে এসব ঘটনার বৈচিত্র্য এতটাই যে, মনে হচ্ছে যেন এবারের সংসদ নির্বাচন বুঝিবা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, পক্ষ-প্রতিপক্ষ দু’দিক থেকেই। ক্ষমতাসীন দলে বা জোটে আশঙ্কা আর কথিত বিরোধী দলে ও জোটে আকাঙ্ক্ষা। 

এ দুইয়ের দ্বন্দ্বে তথা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শুধু নির্বাচনের ময়দানই সরগরম নয়, পরিবেশ রীতিমতো উত্তপ্ত- বিবৃতি, বক্তব্য, পাল্টা বিবৃতি ও বক্তব্যে দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো নানা খবরে ঠাসা; ছোট কিংবা বড়, সিঙ্গেল কলাম বা ডাবল-ট্রিপল কলামজুড়ে। দৈনিকের প্রথম পাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রায়ই দখল করে থাকে নির্বাচন নিয়ে বিবিধ খবর আর সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় তো আছেই হেভিওয়েট কলামিস্টদের অভিমত প্রকাশ ও পর্যালোচনায়। 

বিশ্নেষণ ও পর্যালোচনার বিষয় মূলত নির্বাচন; সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু। তবে নির্বাচনেরই মোটামুটি প্রাধান্য। সে ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নানামাত্রায় দুই জোটে তথা দুই শিবিরে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কথায় ও তৎপরতায়। রাজপথ, মাঠ, ময়দান, আকাশ-বাতাস উত্তপ্ত সেই জের ধরে। এমনই প্রকাশ যেমন বাস্তবে, তেমনি দৈনিক পত্রিকার পাতায়। 

সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এবারকার নির্বাচন যেন রাজনীতিতে সংশ্নিষ্টদের জন্য জীবন-মরণ লড়াই। সত্যই কি এতটা গুরুত্ব এবারকার (২০১৮) সংসদ নির্বাচনের? নির্বাচনের কথা উঠলেই আমার মনে পড়ে যায়, ইতিহাস সৃষ্টির তাৎপর্যে চিহ্নিত তিনটি নির্বাচনের কথা, যা ১৯৪৬, ১৯৫৪ ও ১৯৭০-এ অনুষ্ঠিত। এগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই। কারণ এগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ও ব্যক্তিবলয়ে বহুলিখিত, বহুচর্চিত। 

দুই. 

ওই তিন নির্বাচনের রাজনৈতিক বিবেচনায় ও তুলনায় নির্বাচন ২০১৮ কি ততটাই তাৎপর্য বহন করে? ততটা না হলেও হয়তো কিছুটা তো বটেই। না হলে নির্বাচন নিয়ে এবার এত রাজনৈতিক ঘটনার প্রকাশ ঘটবে কেন, এত রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টাই-বা চলবে কেন? সর্বোপরি যে যার মতো করে কূটকৌশলী তৎপরতার প্রকাশ তো কম নয়। 

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ নির্বাচন অনুষ্ঠান মূলত দুটি শিবিরকে কেন্দ্র করে- প্রথমত, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের শরিকি জোট। কারও মতে, এখানে বড় বিস্ময় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার জাতীয় পার্টি একাধিক চরিত্রে বিরাজিত। কিন্তু একই সঙ্গে মাঝেমধ্যে তার বিপরীতধর্মী বক্তব্য নির্বাচনী আসনের সংখ্যা ও লড়াই নিয়ে। বিষয়টি স্পষ্ট হবে আসন ভাগাভাগির সময়। 

সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদকে নিয়ে যেমন চমকের শেষ নেই, কি তার ব্যক্তিজীবনে কিংবা রাজনৈতিক জীবনে; তেমনি এ কথাও সত্য যে, তার ওপর নির্ভরশীলতার দিকটি রাজনৈতিক বিচারে গভীর প্রশ্নবিদ্ধ। এক ডাল থেকে অন্য ডালে তার বিচরণ আর স্ববিরোধী ভূমিকা নিতে তার তুলনা তিনি নিজেই। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তেমন সাক্ষ্যই দেয়। 

বিস্ময়কর যে, এত অদ্ভুত আচরণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জনাব এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টির গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তার রাজনৈতিক শক্তির কিছু শিকড় কাটা পড়লেও অজ্ঞাত কারণে মূল শিকড়টি সম্ভবত এখনও অক্ষত। তবে তার নৈরাজ্যিক আচরণে জাতীয় পার্টি যেমন বিভাজিত, তেমনি তার রাজনৈতিক শক্তি কতদিন ধরে রাখতে পারবে, তা বলা কঠিন, বিশেষ করে তার অবর্তমানে। 

জাতীয় পার্টিপ্রধান এরশাদের রাজনীতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই তার বিরোধী পক্ষ সংগঠন; কিন্তু বিএনপি, বিশেষত খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্কটি শত্রুপ্রতিম। শেষোক্ত শাসনামলে এরশাদ দীর্ঘদিন কারাগারে, অনেক মামলার তিনি আসামি; তবে সবচেয়ে বড় তথ্যটি হলো, কারাবাসকালে গুরুতর জন্ডিসে আক্রান্ত এরশাদকে জেলের বাইরে হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। বহুকথিত বিষয়, রক্তে ২৬ মাত্রার বিলিরুবিন সত্ত্বেও তিনি একসময় সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

এসব ঘটনা তার পক্ষে ভুলে যাওয়ার নয়; তাই এবং আরও একাধিক কারণে তার পক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোটে যুক্ত থাকার বিকল্প নেই। আর ক্ষমতাসীন বিএনপির আমলে তার রাজনীতি ছিল নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কূটকৌশলের। এভাবে চলেছে এরশাদের রাজনীতি, এমনকি নির্বাচনকালেও। 

তিন.

বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে প্রধান দুই জোটের আপ্রাণ চেষ্টা, তাদের নিজ নিজ পায়ের নিচে মাটি মজবুত করা, জনসংযোগে শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা। সে চেষ্টা সংগঠনগত দিক থেকে একাধিক দলকে শিবিরভুক্ত করা, বিচ্ছিন্নদের আছে টেনে আনা। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ, দিনকয় আগে বিএনপির ঐক্য প্রক্রিয়ার মেলা। পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার আপাত সাংগঠনিক ঐক্য। মূলত নির্বাচনী ঐক্য। 

এই বৃহত্তর ঐক্যজোট তথা ঐক্য প্রক্রিয়ার মূল দাবি বা স্লোগান আদর্শিক বিচারে একটি বাক্যে নিহিত : অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিশ্চিতি, এর কোনো বিকল্প নেই। বাকি দাবি-দাওয়ার ধারা-উপধারাতে রয়েছে নিরপেক্ষ শক্তিমান নির্বাচন কমিশন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নেতাকর্মীদের নির্বিচার গ্রেফতার বন্ধ করা এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি। 

তাদের পক্ষের লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিক্ষাবিদদের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের উপযোগী মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। হয়তো তাদের চিন্তায় ঐতিহাসিক উদাহরণ- ১৯৫৩ সালে প্রাক-নির্বাচনকালে পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের মতো ফ্যাসিস্ট সরকারও রাজবন্দিদের ব্যাপকহারে মুক্তি দিয়েছিল; এমনকি তাদের জানের শত্রু কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদেরও। 

এমনই এক রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগিয়ে চলেছে বিএনপি জোট তাদের নির্বাচনঘটিত প্রস্তুতি ও আয়োজন নিশ্চিত করতে। সম্প্রতি তাদের রাজনৈতিক কর্মিসভা-জনসভায় মূল বক্তব্য, রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। এসব কিছুই নির্বাচনকেন্দ্রিক কলাকৌশল এবং সবই সাময়িক। কোনোক্রমে ক্ষমতাসীন হতে পারলে এসব নীতিবাক্য বাজে কাগজের ঝুড়িতে নয়, বরং আবর্জনার স্তূপে চলে যায়। এমন আচরণ সবার জন্যই সত্য। 

এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ দল ও তাদের সরকার কি কিছুটা অস্বস্তিতে আছে? তারা প্রতিপক্ষ শিবিরের প্রতিটি পদক্ষেপ তীক্ষষ্ট দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এমনকি সে পর্যালোচনার ভিত্তিতে তাদের সরকার গ্রহণ করছে প্রতিরোধক ব্যবস্থা। এ নির্বাচন সামনে রেখে তাদের মূল রাজনৈতিক স্লোগান- উন্নয়ন। তাদের ভাষায়, সে উন্নয়ন সর্বমাত্রিক- পরিবহন খাত থেকে আকাশ। সর্বোপরি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এক কথায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন’। 

তাছাড়া রয়েছে যাতায়াত ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নতি সাধনে নদীর ওপর সেতু নির্মাণ (যেমন পদ্মা সেতু), রাজধানীর ফ্লাইওভার তো আছেই, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা এবং অনুরূপ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন মেট্রোরেল। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে তাদের আবার ক্ষমতাসীন হওয়া খুবই জরুরি। এর বিকল্প নেই। 

স্বভাবতই লক্ষ্য অর্জনে তাদের কর্মকৌশল বিচিত্রমুখী। তাদের লক্ষ্য, তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নানাবিধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে গণসংযোগ গড়ে তোলা; সভা-সমাবেশ, মিছিল-পোস্টার, ইশতেহার ইত্যাদির মাধ্যমে। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগকে ব্যাপকভাবে সক্রিয় করে তোলা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে, বিশেষভাবে শহরে, গ্রামগঞ্জে। 

তাদের নির্বাচনী প্রচার মূলত দ্বিমুখী। প্রথমত, উন্নয়নের বহুবিধ কর্মসূচি ঘোষণা এবং বাস্তবে নির্বাচনী জয়ের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষভাবে বিএনপিকে রাজনৈতিক-সাংগঠনিকভাবে কোণঠাসা করা এবং তা নানাবিধ কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। সে উদ্দেশ্যে যেমন রাজধানী ঢাকার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নানা মাধ্যমে কর্মতৎপরতার সূচনা আওয়ামী লীগের, তেমনি ঢাকার বাইরে বৃহত্তর পরিসরে একই কায়দায় জনসংযোগ সংগঠনগুলোর। 

বলতে গেলে কিছুটা আগামই কর্মতৎপরতা শুরু আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে। ‘কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠ দখলের কৌশল গ্রহণ করেছে’ তারা। কারণ জয় তাদের পেতেই হবে- ওই যে কথায় আছে না, ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’। এবার তারা নিজ দলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারেও সজাগ। তবে তা কতটা সফল হবে বলা কঠিন। কারণ এ দেশে বিরাজমান রাজনীতিতে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা 

ব্যক্তি পর্যায়ে বড় প্রকট। সেখানে দলীয় আদর্শ হালে পানি পায় না। 

চার.

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধারা এভাবে চলছে কিছুটা হলেও বাদ-প্রতিবাদে। বিএনপি নেতাদের প্রধান অভিযোগ, তাদের নেতাকর্মীদের বিনা অপরাধে হয়রানি করা ও জেলে পাঠানো হচ্ছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? 

একটি জনপ্রিয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় অগ্রাধিকারভিত্তিক ডাবল কলাম সংবাদ শিরোনাম : ‘গায়েবি মামলা, এবার ফখরুলদের বিরুদ্ধে’ (২.১০.২০১৮)। এ বিষয়ে ‘অভিযোগ নাশকতার’। ছোট শিরোনামে লেখা হয়েছে : ‘উস্কানি যানবাহন ভাংচুর, ককটেল বিস্ম্ফোরণ, পুলিশের ওপর 

হামলার অভিযোগ। সরেজমিন এ ধরনের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি।’ 

এসব কারণেই কি মার্কিনি লবি ও কূটনীতিকদের পরামর্শ, সব দলের সমঅধিকারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক নীতিমালার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে আসন্ন সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করা। ঘটনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিএনপির ঐক্য প্রক্রিয়া এখনও মতভেদ দূর করে সংহত ও সংঘবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায়। এত অল্প সময়ে সুসংগঠিত হওয়ার পথে বাধা কম নয়। তুলনায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি অনেক বেশি। তাদের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বিশেষভাবে একটি জায়গাতেই। আর তা হলো, শাসন সংক্রান্ত সদাচার। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখা, যাতে তাদের আচরণে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। 

ভাষাসংগ্রামী, কবি, রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক