কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ : প্রয়াণের ৩১ বছর

হিলাল ফয়েজী: বিশ্ববিপ্লবের কেন্দ্রভূমি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গণ্য হতো পৃথিবীর অগণিত মুক্তিকামীর কাছে। ৪৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ ফরহাদ যে বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবন অতিবাহন করে আজকের দিনে ৩১ বছর আগে প্রয়াত হলেন, তিনিও মাতৃভূমি বাংলাদেশে গণমুখী পরিবর্তন প্রক্রিয়ার রণকৌশলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরম সহায়ক বিবেচনা করতেন। সোভিয়েত রাজধানী মস্কোতে গিয়েছিলেন গুরুতর ব্যাধির চিকিৎসায়। ভালো হয়ে গেলেন বলে জানলাম। কিউবা সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তারপর, হঠাৎ মস্কো থেকে গভীর বিষাদের সংবাদে অশ্রুসজল আমরা তাকে ঘিরে থাকা হাজারো জন।

আমাদের দেশে সাধারণত নেতা বলতে একজন বড় অবয়বের সামন্তভঙ্গির দশাসই মানুষ ভেবে নেওয়া হতো। ছোটখাটো অবয়বের মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন ভিন্ন ধাঁচের। বিশাল সামন্ত পরিবার কিংবা ঢাকা শহরের প্রভাবশালী পরিবারেরও কেউ ছিলেন না। প্রান্তিক উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের বৃহত্তর দিনাজপুরের বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার একজন মোহাম্মদ ফরহাদ নামের একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট তরুণ ষাটের দশকের সূচনায় প্রবেশ করলেন তদানীন্তন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায়। ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর প্রায় তিনটি দশকজুড়ে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে অবস্থান গ্রহণ করে একজন জাতীয় নেতায় সুচিহ্নিত ব্যক্তিত্ব হিসেবেই জীবনাবসান ঘটল তার। সে বিচারে একজন কমিউনিস্ট দায়িত্ববান, করিতকর্মা সফল ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিস্ম্ফুটিত। প্রয়াণের ৩১ বছরেও কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কতটুকু প্রাসঙ্গিক? এ প্রশ্নের সত্যনিষ্ঠ উত্তরেই মিলবে মোহাম্মদ ফরহাদের রাজনৈতিক ভূমিকার সাফল্য-সার্থকতা কিংবা নিরর্থকতার বিষয়টি। এ প্রশ্নটির কিছুটা জবাব মিলবে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। আশির দশকের শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে বোধ করি খুবই নির্ভরযোগ্য একজন রাজনৈতিক মিত্র তিনি পেয়েছিলেন তদানীন্তন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক তথা প্রধান নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের কর্মধারায়। মোহাম্মদ ফরহাদের নিজ দল ও মিত্র দলগুলোর নেতৃবৃন্দও বলতে পারবেন রাজনীতির মাঠে তার অনুপস্থিতির কথা। শুরু হোক ষাটের দশক নিয়ে।

গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ‘মফস্বলের’ এক তরুণ কর্মী এসে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই তরুণ কর্মীই ছাত্র ইউনিয়নের দৃশ্যত প্রধান পদে নেই; কোষাধ্যক্ষ তিনি, অথচ কার্যত প্রধান নেতা তিনি। পাকিস্তানি সামরিক শাহির আইয়ুবি শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছে কঠিন-অন্ধকার-দানবীয় অত্যাচারের মাঝেও। গোপনে কথা বলে সমঝোতা করে নিলেন বঙ্গবন্ধু-মণি সিংহ-খোকা রায় ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়ার সহযোগী তৎপরতায়। অতএব জাতীয় রাজনীতির যে দুটি মূলধারা ছাত্র সমাজে ক্রিয়াশীল, সেই ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়নের যুগপৎ কাঁধে দায়ভার পড়ল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রতিবাদ সূচনা করার। প্রস্তুতি নেওয়া হলো ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সূচিত হবে সে বজ্র আয়োজন।

এ সময় সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করায় ঠিক ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হয়ে গেল ছাত্র বিক্ষোভ। এমনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পশ্চাতে মোহাম্মদ ফরহাদ যে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়েছিলেন, তা সহযোদ্ধাদের বিস্ময় এবং শ্রদ্ধা কুড়াল। এই সহযোদ্ধারা হলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, কাজী জাফর আহমদ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, বদরুল হক প্রমুখ। বস্তুত ‘৬২-র আন্দোলনের মস্তিস্ক’ অভিধায় নিঃশব্দে ভূষিত মোহাম্মদ ফরহাদ ষাটের দশকজুড়েই আত্মগোপনে থেকে ‘৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি সোভিয়েত-গণচীন মতাদর্শিক লড়াইয়ের ডামাডোলে ছাত্র ইউনিয়নকে (মতিয়া গ্রুপ) দেশজুড়ে বিস্তৃত ও গভীরতর করে তোলার এক বিশাল কর্মযজ্ঞের তিনিই ছিলেন নেপথ্য প্রধান ব্যক্তিত্ব। যতটুকু জানি, তার মতো ‘খুঁটিনাটিবিশারদ’ এবং ‘কুশলী পরিকল্পক’ ষাটের দশকে আর কেউ পরিস্ম্ফুটিত হয়ে ওঠেননি।

এদিকে পাকিস্তান হওয়ার পর স্বল্প ক’জন ব্যক্তি গোপনে কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং সংগঠনের টিমটিম শিখা প্রজ্বলিত রেখে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্রমাগত ভূমিকা রেখে চলছিলেন। মুসলিম লীগের কঠিন দমন নীতির মাঝে আত্মগোপন করে ষাটের দশকে এক দল দুঃসাহসী তরুণঘেরা মোহাম্মদ ফরহাদের ভেতর খুঁজে পেলেন পার্টি বিকাশের জিয়নকাঠি। স্বল্প বয়সী মোহাম্মদ ফরহাদ ষাটের দশকে পঙ্‌ক্তি খুঁজে পেলেন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের। যতটুকু জানি, ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি আত্মগোপন থেকে চিরকুট পাঠিয়ে মোহাম্মদ ফরহাদ জানিয়েছিলেন সাইফুদ্দিন মানিককে- ‘গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেছে।’ গণঅভ্যুত্থান শব্দটি সেই থেকে যুক্ত হলো আমাদের গণআন্দোলনের পথরেখায়। বস্তুত সেনানিবাসে বঙ্গবন্ধু বন্দি থাকার সময় ওই বলীয়ান ‘গণঅভ্যুত্থান’ ব্যতীত বঙ্গবন্ধুর মুক্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ২নং দফায় ৬ দফাকে ধারণ করে যে ১১ দফাভিত্তিক ব্যাপক ঐক্য নির্মিত হয়েছিল, সেই ঐক্যের তরণীতে গণঅভ্যুত্থানের দাউদাউ আগুন জ্বেলেছিল দেশবাসী। তবে যথাযথ স্বীকৃতি পেয়েছে বলে মনে হয় না। সোভিয়েতসহ ২১টি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির পটভূমি রচনায় বাংলাদেশ ও ভারতের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রশ্নে অনন্য। পুরো রণাঙ্গনজুড়ে অজস্র ক্যাম্প, রিক্রুট ক্যাম্প তৈরি করে দেশের ভেতর থেকে ক্যাডারদের এনে জড়ো করে একটি বাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধে শামিল করার মতো বিশাল এবং কষ্টকর চ্যালেঞ্জে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রাখে। মোহাম্মদ ফরহাদের ভূমিকা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে থাকে। স্বাধীন দেশে তাই ১৯৭৩ সালের কংগ্রেসে মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদে বৃত হন।

প্রস্তুতি ছিল তার। সারাদেশে ষাটের দশক থেকেই সাজাচ্ছিলেন প্রকাশ্য পার্টির উন্মুক্ত একালের নেতৃত্ব। কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যরূপে স্বাধীন দেশে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বিশেষত মোহাম্মদ ফরহাদের উদ্যোগ ছিল সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশের মতো নানাভাবে পশ্চাৎপদ দেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য করে ক্ষমতা রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার বাস্তবতা বা বিপদের প্রশ্নটি তখন কোনোভাবেই গ্রাহ্য হয়নি। তদুপরি বাংলাদেশকে বিপ্লবের প্রক্রিয়ার অগ্রগমনের সঙ্গে সোভিয়েত মৈত্রীকে রাজনীতি ও কৌশলের সঙ্গে অঙ্গীভূত করার প্রশ্নেও কোনোই দ্বিধা দেখিনি। মোহাম্মদ ফরহাদ এ দুটি ক্ষেত্রে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে যেন টগবগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের ওপর ঘনিয়ে আসা মহাবিপদ সম্পর্কেও ফরহাদ নেতৃত্ব যথাযথ প্রস্তুত ছিল বলে মনে হয় না। বিশেষত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা শিবির থেকে বিপদের সম্ভাবনাকে কার্যত খাটো করে দেখেছে পার্টি নেতৃত্ব। বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গে মৈত্রী জোট করে বাংলাদেশের বিপ্লবী প্রক্রিয়া অগ্রসর করার ক্ষেত্রে ফরহাদ নেতৃত্বের উদ্যোগে কোনো ঘাটতি ছিল না। বাকশাল গঠনের ধারণায় কমিউনিস্ট পার্টির অসম্মতির কথা প্রকাশ্য ছিল না। তার গোপন পার্টি কাঠামো স্বল্পাকারে বজায় রাখার ক্ষেত্রেও পার্টি নেতৃত্ব সফল হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনার পর মোহাম্মদ ফরহাদের নেতত্বে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল, পার্টি এবং গণসংগঠনের পক্ষ থেকে, তা ইতিহাসের এক অসাধারণ ঘটনা। কিন্তু তারপর হঠাৎ জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় কমিউনিস্ট পার্টির যে পশ্চাদপসরণ, তা পার্টির ভাবমূর্তি ও মহিমাকে খর্ব করে। সেই জিয়া সরকারই পার্টি নিষিদ্ধ করে; মোহাম্মদ ফরহাদকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত করে কারারুদ্ধ করা হয়।

আশির দশকে বিশেষত ক্ষেতমজুর আন্দোলন বিস্তার বিকাশে মোহাম্মদ ফরহাদ নেতৃত্বের উদ্যম ও উদ্যোগের সাফল্য পার্টিকে রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে স্থাপিত করে। এরশাদবিরোধী ব্যাপক ঐক্যে শেখ হাসিনার পরই মোহাম্মদ ফরহাদ নেতৃত্বের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে এসে মোহাম্মদ ফরহাদ যে সফল পার্লামেন্টারিয়ানের স্বাক্ষর রাখেন, তা ছিল অনন্য।

১৯৮৭ সালে জীবনাবসানের আগে সোভিয়েত শক্তির অর্থনৈতিক বিকাশ প্রভাবে ২০০০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে বিপ্লব সম্পন্ন করার যে অভাবনীয় স্বপ্ন মোহাম্মদ ফরহাদ তার সঙ্গীদের দেখাচ্ছিলেন, ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ফরহাদের দেখানো ওই স্বপ্ন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তবে কখনোই প্রশ্ন উঠবে না বিপ্লবের লক্ষ্যে তার কর্মনিষ্ঠা, নিবেদন, অনলস পরিশ্রম, সাধনা এবং স্বপ্নের সততা প্রশ্নে।

মুক্তিযোদ্ধা ও প্রকৌশলী