সংস্কারপন্থি দলছুট নেতারা ফিরছেন বিএনপিতে

নিউজ ডেস্ক: আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ওয়ান-ইলেভেন পর্বের ‘সংস্কারপন্থি’সহ বিভিন্ন সময়ের বহিস্কৃত দলছুট নেতাকর্মীদের। আগামী ১৫ অথবা ১৬ অক্টোবর গুলশান কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের দলে সক্রিয় করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হবে। লন্ডনে চিকিৎসাধীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় তাদের দলে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

বিএনপির হাইকমান্ড পরিকল্পনা করেছে, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আগামী আন্দোলন শুরু করার আগেই দলকে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে নিয়ে আসার। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলছুট এসব নেতাকে বিএনপিতে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব দলছুট নেতার মধ্যে অর্ধশতাধিক সংস্কারপন্থির পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বহিস্কৃত প্রায় শতাধিক নেতাও রয়েছেন।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের মধ্যে অনেককেই দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদেরও ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার জন্যই দল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিএনপিদলীয় সূত্র জানায়, ‘সংস্কারপন্থি’ অভিযোগে দলের বাইরে অবস্থানকারী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেডএ খান এবং মোফাজ্জল করিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাহ মো. আবুল হোসাইন, সাবেক হুইপ ও পিরোজপুর জেলার সাবেক সভাপতি সৈয়দ শহীদুল হক জামাল, সাবেক হুইপ রেজাউল বারী ডিনা, সাবেক সাংসদ ও চাঁদপুর জেলা সাবেক সভাপতি এসএ সুলতান টিটু ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হায়দার খান, সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার শহিদুজ্জামান, সাবেক সংসদ ও দলের বরগুনা জেলার সভাপতি নূরুল ইসলাম মণি, সাবেক সাংসদ শামীম কায়সার লিঙ্কন, বগুড়ার সাবেক দুই সাংসদ ডা. জিয়াউল হক মোল্লা ও জিএম সিরাজ, সাবেক সাংসদ মোশাররফ হোসেন মঙ্গু, বরগুনা জেলা সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ ইলেন ভুট্টো প্রমুখ। তবে তাদের মধ্যে সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেনকে দলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না। অন্য সবাইকেই দলের কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত করা হবে।

দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময় দল থেকে বহিস্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন ধরেই চলমান ছিল। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দল থেকে বহিস্কৃত এসব নেতার একটি একটি তালিকা তৈরি করে দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়। 

এ তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদলের ‘সোনালী অতীত’ হিসেবে পরিচিত সানাউল হক নীরু। আরও রয়েছেন পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনবারের পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ এম এ হান্নান, ঢাকা মহানগর জাসাস দক্ষিণের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারসহ শতাধিক নেতা।

একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই ‘সংস্কারপন্থি’, বহিস্কৃত ও অভিমানে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়া নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দশম জাতীয় নির্বাচনে সরকারের নানা প্রলোভনেও এসব নেতা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। বরং খালেদা জিয়ার আশ্বাসে ‘নির্বাচন ঠেকাও’ আন্দোলনে নানা উপায়ে সম্পৃক্ত থেকেছেন। তবে নানা কারণে তাদের আর দলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলের বাইরে থাকা এসব নেতা। তারা বিভিন্ন উপায়ে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গুলশান কার্যালয়ে দলের সাবেক দুই এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। অতীতের সব ভেদাভেদ ভুলে তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে দলের জন্য কাজ করতে বলেন তিনি। পর্যায়ক্রমে সংস্কারপন্থি অন্য নেতাদেরও ডাকা হবে- এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয় ওই সময়। পরে সাবেক সাংসদ ও দলের সুনামগঞ্জ জেলা সভাপতি নজির হোসেনকে কার্যালয়ে ডেকে এনে তার সঙ্গেও কথা বলেন খালেদা জিয়া। এরপর দলের বহিস্কৃত সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তির বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে আর কোনো কার্যক্রম না থাকলেও খালেদা জিয়া পর্যায়ক্রমে সব নেতার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন। এরই মধ্যে কারাবন্দি হন তিনি। 

ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ২৫ জুন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দলের মধ্যে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দলের ১২৭ জন সাবেক মন্ত্রী-সাংসদ সমর্থন করেন তাকে। তখন থেকে ওই অংশটি বিএনপিতে ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত। সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের পর খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন ও দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বহিস্কার করেন। সে সময় দলের মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত হন প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।

বহিস্কৃত নেতাদের বিষয়ে বিএনপি সূত্র জানায়, নব্বই দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের স্বার্থে তখন আলোচনার ভিত্তিতে সাময়িক সময়ের জন্য ছাত্রদলের প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত সানাউল হক নীরুকে বহিস্কার করা হয়েছিল। অথচ সেই সাময়িক সময় দীর্ঘ ২৫ বছরেও শেষ হয়নি। অন্যদিকে গুলশান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার প্রভাবে এতদিন পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান মিন্টুকে দলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। একইভাবে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জনপ্রিয় নেতা আলহাজ এম এ হান্নান ২০০৯ সালে বহিস্কৃত হন। অভিযোগ, এই আসনের সাবেক এমপি লায়ন হারুন অর রশীদের প্রভাবে তার বহিস্কারাদেশ এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। সাংগঠনিক নেতা হিসেবে পরিচিত ঢাকা মহানগর জাসাস দক্ষিণের সাবক সভাপতি জাহাঙ্গীর শিকদারের মতো আরও অনেক নেতাকেই বছরের পর বছর বহিস্কৃত করে রাখা হয়েছে ‘ব্যক্তিস্বার্থে’। এবার দলের স্বার্থে তাদের বিএনপিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। সংস্কার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভক্তির রেখা মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।