কোটা সংস্কারে অনেক জটিলতা রয়েছে

অধ্যাপক মীজানুর রহমান:   কোটা সংস্কার নিয়ে দেশে অনেকদিন ধরেই ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের সুপারিশ অনুমোদন করা হয়। সেই সঙ্গে কোটা বহাল রাখা হয় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে। পাশাপাশি বলা হয়— যদি কখনও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য কোটার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তবে সরকার তা করতে পারবে। তবে এ জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মন্ত্রিসভায় কোটা বাতিলের সুপারিশ অনুমোদন, কোটা সংস্কারের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান ।

কোটা সংস্কার নিয়ে মন্ত্রিসভায় যে অনুমোদন করা হয়েছে তা নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন— কোনও কোটা থাকবে না। মন্ত্রিসভা থেকেও বলা হয়েছিল। এই জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই অনুমোদন সেই ধারাবাহিকতারই ফল। যতই কোটা সংস্কারের কথা বলা হোক না কেন, এখানে অনেক জটিলতা রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন মূলত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে ৩০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ ছিল তার বিরুদ্ধে। অন্য কোনও কোটা নিয়ে এত কথা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দ কোটা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছিল না। মেধা কোটা থেকে সেই কোটা অনেকসময় পূর্ণ করা হচ্ছিল। সরকারও বিষয়টা ঠিকমতো সম্পৃক্ত করতে পারছিল না। ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মেধাবীরা যদি নির্বাহী, প্রশাসনে বেশি কাজের সুযোগ পায় তাহলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে আশা করা যায়। তবে সত্যিই তারা মেধাবী কি-না সেটা একটা প্রশ্ন। আমাদের দেশের মেধাবীদের কি বড় বড় কাজের যোগ্যতা আছে? দেশে এখন চার লাখ বিদেশি বিভিন্ন বড় বড় জায়গায় কাজ করছে। আর দেশের মেধাবীরা পুলিশ হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছে।

কোটা সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। সেটা নিয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। এখন যদি জেলা কোটার কথা বলি, ধরা যাক, নীলফামারী, পঞ্চগড় বা কুড়িগ্রামের কোনও পরিবার ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করল। বসবাস করতে লাগল গুলশানের মতো কোনও অভিজাত জায়গায়। ওই পরিবারের সন্তানটি পড়াশোনা করলো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ জেলা কোটার সুবিধা নিয়ে সে নিজের এলাকার নাম লিখল কুড়িগ্রাম। যেই ছেলেটি কুড়িগ্রামে থাকল না, সেখানে পড়াশোনা করল না জেলা কোটার সুবিধা নিয়ে সেই চাকরির যোগ্যতা অর্জন করল। অথচ জেলা কোটা করা হয়েছিল জেলায় থেকে অবকাঠামোগত সুবিধা, উন্নত শিক্ষা যারা পায় নাই তাদের জন্য। যদি বলা হত, কুড়িগ্রামের জেলা কোটায় সুবিধা নিতে হলে তাকে ওই এলাকার বাসিন্দা হতে হবে ও পড়াশোনা করতে হবে তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু বিষয়টি সে রকম ছিল না।

অন্যদিকে আদিবাসী যে কোটা রয়েছে দেখা যাচ্ছে চাকমারাই সেই সুবিধা পাচ্ছে। এদের অনেকেই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, প্রশাসনের বড় অফিসার, ব্যবসায়ী হয়ে বসবাস করছে রাজধানীর গুলশান, বনানী এলাকায়। তাদের সন্তানও পড়ছে নামি জায়গায়। অথচ তারা আদিবাসী কোটার সুবিধা পাচ্ছে। অথচ কোটা করা হয়েছিল পার্বত্য অঞ্চলগুলোর সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য যারা উন্নত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

প্রাইমারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ৬০ ভাগ নারী কোটা রয়েছে। কারণ তারা মাতৃস্নেহে শিশুদের পড়ায়। নারীদের যে কোটা রয়েছে সেটা থাকা উচিত। তা না হলে কর্মক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়তে পারে।

আমাদের দেশে রেললাইন নিয়ে কাজ করে এমন কোনও ইনস্টিটিউশন নেই। সেখানে পোষ্য কোটাতে টেকনেশিয়ানরা পারিবারিক ধারাবাহিকতায় কাজ করছে। অন্যদিকে ক্লিনারদের কাজটাও একইভাবে চলছে। শাহবাগের কোটা আন্দোলনকারীরা এসব কাজ করতে যাবে না। করলেও পরিষ্কার করবে না। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে কোটা উঠিয়ে দেওয়া যাবে না।

চাকরি ক্ষেত্রে না হোক, পড়াশোনা বা যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা, সুবিধাবঞ্চিতরা যাতে বৃত্তি বা বিশেষ সুবিধা পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।