মৃত্যুর ষষ্ঠ প্রধান কারণ ক্যান্সার

রওশন ঝুনু: ক্যান্সার সচেতনতার মাস অক্টোবর ২০১৮’র কর্মসূচি হিসেবে, আগামী ২ অক্টোবার থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন ক্যানসারের ফ্রী পরীক্ষা করাবে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে স্তন, জরায়ু ও জরায়ু মুখের ক্যান্সার, ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, পাকস্থলী, মূত্রথলির ক্যান্সার ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ফ্রি পরীক্ষা করানো হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসব সেবা সকলের জন্য উন্মুক্ত।

রোববার (৩০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ক্যান্সার সচেতনতা মাস ২০১৮, মিডিয়া ওরিয়েন্টেশন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যান্সারের তথ্য উপাত্ত উপস্থাপনসহ উক্ত কর্মসূচির কথা জানান হাসপাতালটির অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. এহতেশামুল হক।

তিনি লিখিত বক্তব্যে জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৃত্যুর ষষ্ঠ প্রধান কারণ ক্যান্সার। যেখানে পুরুষদের মধ্যে প্রধান হলো ফুসফুস ক্যান্সার এবং নারীদের মধ্যে স্তন, জরায়ু ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বর্তমানে বাংলাদেশে ২০ লাখ মানুষ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত আছেন। এছাড়াও প্রতি বছর নতুন করে দুই লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দেড় লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন মতিউর রহমান মোল্লাা, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক, অধ্যাপক মীম নাসিম সোবহানি খন্দকার, সহযোগী অধ্যাপক মো. আতিকুর রহমান প্রমুখ।

লিখিত বক্তব্যে ডা. এহতেশামুল হক আরো জানান, বাংলাদেশে পুরুষরা মুখ গহর, খাদ্যনালী ও পাকস্থলী এবং ফুসফুস এবং নারীরা স্তন, জরায়ু ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হন। বিভিন্ন সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাপ্ত একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পুরুষদের ২৩.৯ শতাংশ খাদ্যনালী ও পাকস্থলী, ২২.৯ শতাংশ মুখ গহর এবং ১৫.৯ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত।

অপরদিকে নারীদের ১৬.৯ শতাংশ স্তন, ১৫.৬ শতাংশ জরায়ু ও জরায়ুমুখ এবং ১১.৯ শতাংশ খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত। এছাড়াও অন্যান্য ক্যানসার যেমন, মলাশয়, মলদ্বার, রক্তের ক্যানসার নারী-পুরুষ উভয়েরই দেখা যায়। ন্যাশনাল ইন্সস্টিটিউট অফ ক্যানসার রিসার্চ এন্ড হসপিটাল এর ২০১৪’র এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শতকরা ২৯ ভাগ পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন ফুসফুস ক্যান্সারে এবং শতকরা ২৬ ভাগ নারী আক্রান্ত হয়েচেন স্তন ক্যানসারে।

ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান মোল্লা বলেন, এই উপমহাদেশে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ লোক হেডনেক বা মুখ ও গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত। বিশেষ করে যাদের পুষ্টির অভাবজনিত জনগোষ্ঠীর ধূমপান, গুল, জর্দাসহ তামাকজাত দ্রব্য খাওয়ার কারণে এ জাতীয় ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া, মুখে, গালে, গলায় লালচে ঘা থেকেও মুখের ও গলার ক্যান্সার হতে পারে।

ডা. এ কে এম আমিনুল হক বলেন, ৫০ উর্ধ্ব বয়স্ক লোকদের অল্প অল্প জ্বর ক্যান্সারের লক্ষণ। তবে বেশি জ্বর হলে অর্থাৎ তাপমাত্র ১০০ ডিগ্রির ওপরে থাকলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এছাড়া খাবার ও ঢোক গেলার সময় গলায় ব্যথা, কাশি এবং কাশির সময় গলা কিংবা শরীরের যে কোনো স্থানে ব্যথা অনুভ’ত হওয়া, কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া, ওষুধ ব্যবহারের পরও কাশি না সারা ইত্যাদি ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি বলেন, ক্যান্সার যতো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়বে, চিকিৎসা এবং ব্যয় ততোটাই সহজ হবে। ক্যান্সার দেরিতে ধরা পড়লে, আর্থিক ব্যয় ও চিকিৎসা দুটোই সাধ্যের বাইরে চলে যায়। তিনি বলেন, বিশেষ করে নারীরা স্তন ও জরায়ু ক্যানসারের লক্ষণ চিহ্নের কথা লজ্জা প্রকাশ করেন না। এক্ষেত্রে স্বামীদেরর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লজ্জা পেলে চলবে না, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে সারভাইক্যাল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের দাবী জানিয়েছেন তারা।

লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন উপস্থিত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ। তারা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের উপর জোর দিয়ে বলেন, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তাই কিছুদিন পর পর ক্যান্সার সংক্রান্ত কিছু পরীক্ষা করিয়ে রাখারও আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ক্যান্সার সচেতনতা উপলক্ষে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নেওয়া সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির তথ্য জানানো হয়।
ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে