সম্পাদক পরিষদের আপত্তি নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে

নিউজ ডেস্ক:  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা সম্পর্কে সম্পাদক পরিষদের আপত্তি নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে। রোববার সচিবালয়ে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া এ আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের আপত্তির কারণে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর আহ্বানে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক আহ্বান করা হয়। বৈঠকে আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী ছাড়াও ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এ ব্যাপারে আরও জানান, আইনটি সংসদে পাস হলেও এ নিয়ে এখনও আলাপ-আলোচনার সুযোগ আছে। প্রয়োজনে এটা সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে। বৈঠক শেষে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাংবাদিকদের বলেন, এ আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। সম্পাদক পরিষদ সংসদে পাস হওয়া আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে সুনির্দিষ্ট আপত্তি জানিয়েছে। এই ধারাগুলো সংবিধানে বর্ণিত মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারকে লঙ্ঘন করবে। সরকারের তরফ থেকে তিনজন মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, এ ব্যাপারে তারা আলোচনা করে সমঝোতায় আসতে পারবেন।

এর আগে সরকারের অনুরোধে গত শনিবারের মানববন্ধন কর্মসূচি স্থগিত করে সম্পাদক পরিষদ। এর পর রোববার সচিবালয়ে বৈঠকে বসেন সম্পাদক পরিষদে থাকা দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকরা। আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী ছাড়াও বৈঠকে অংশ নেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং ভারপ্রাপ্ত তথ্য সচিব আবুয়াল হোসেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য হয়েছে, এ রকম একটা আইন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু এ আইন যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা কিংবা বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না করে, সে ব্যাপারে কিছু আপত্তির কথা জানিয়েছেন সম্পাদকরা। তাদের দেওয়া আপত্তি অনুসারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ ধারাটা মোটামুটি আমরা একমত হওয়ায় এই ধারা যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। আপত্তি থাকা অন্য ধারাগুলো নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, ৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে অনেক এজেন্ডা আছে, এ কারণে ওই বৈঠকে সম্ভব না হলে এর পরের মন্ত্রিসভায় এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। ওই সভায় মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও আইসিটি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে সঙ্গে নিয়ে আইনমন্ত্রী হিসেবে সম্পাদক পরিষদের আপত্তিগুলো তুলে ধরব। এরপর মন্ত্রিসভা যে টার্মস অব রেফারেন্স দেবে, সে অনুসারে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আইনের কতিপয় ধারা সম্পর্কে সম্পাদক পরিষদ কিছু সংশোধনী, পরামর্শ, আপত্তি, উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আলোচনার মাধ্যমেই সেগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করছি। কারণ, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ডিজিটাল অপরাধ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এ অবস্থায় এ ধরনের অপরাধ থেকে রক্ষার জন্যই এই আইন করা হয়েছে। আইনে ডিজিটাল অপরাধীদের শক্ত হাতে দমনের জন্য বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পটভূমি হচ্ছে সংবিধান। সংবিধানে বর্ণিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্রসহ সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণে সরকার সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশকে অপরাধমুক্ত ও ডিজিটাল নিরাপদ সমাজ গড়ার জন্য সবাই আমরা একমত হয়েছি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের কর্মীরা যেন এ আইনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্যও সবাই একমত পোষণ করেছেন। ফলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আপত্তি ও উদ্বেগ দূর করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

বৈঠকের ব্যাপারে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম আরও বলেন, এই আইন পাস হওয়ার আগে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের দুবার আলোচনা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা ছিল, তারা এটা চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে তৃতীয়বার সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বসবেন। কিন্তু সেই বসা আর হয়নি; বরং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এই আইন পাস করা হয়েছে। এরপরও সম্পাদক পরিষদ আশাবাদী, আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান হবে। তিনি বলেন, সম্পাদক পরিষদ এ আইনকে বাতিল করতে বলছে না; এটা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সম্পাদক পরিষদ অত্যন্ত সচেতন। এ ব্যাপারে আইন হওয়া উচিত বলেও সম্পাদক পরিষদ মনে করে। কিন্তু সেই আইন কোনোভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের বিরুদ্ধে হতে পারে না।

বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, দি ইনডিপেনডেন্ট সম্পাদক শামসুর রহমান এবং বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

এ আইনটি নিয়ে রোববার বিকেলে বিএফইউজে ও ডিইউজে এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন তিন মন্ত্রী ও তথ্য উপদেষ্টা।