এবারও সবার সেরা রাজশাহীর মেয়েরা

নিউজ ডেস্ক: বিতর্ক উৎসবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করল রাজশাহী শহরের পিএন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা। এরই মধ্য দিয়ে এবারও রাজশাহীর শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে উঠল এ উৎসবে। গতবার বিতর্ক উৎসবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল রাজশাহী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বিতর্ক দল। ঢাকার নামিদামি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে তারা বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের ষষ্ঠ আসরে ফাইনালে ওঠে পিএন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। ফাইনালে নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুলকে যুক্তির শক্তিতে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বিদ্যালয়টির বিতর্ক দল।

‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ স্লোগানে বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) এবং সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে গত মার্চে ৬৪ জেলার ৫২০টি স্কুলে শুরু হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। স্কুল পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় এ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ৯টি অঞ্চলের সেরা ১৬ স্কুল চূড়ান্ত পর্বে ওঠে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এক হাজার ৫৬০ জন তার্কিক।

চূড়ান্ত পর্ব থেকে সেরা চারটি স্কুল আসে সেমিফাইনালে। সেমিফাইনালে খুলনা জিলা স্কুল ও ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে হারিয়ে শনিবার রাজধানীর ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল কলেজ মিলনায়তনে মুখোমুখি হয় রাজশাহী পিএন বালিকা বিদ্যালয় ও নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল।

‘প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে’- এ বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে জোর বিতর্ক হয় চূড়ান্ত পর্বে। পক্ষে ছিল নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল। দলটির তার্কিকরা যে যুক্তি দেয়, পরক্ষণেই তা খণ্ডন করে রাজশাহীর পিএন বালিকা স্কুলের তার্কিকরা। যেই যুক্তিকে ছাপিয়ে আসে আরেক যুক্তি।

বিতর্ক যে খুব উপভোগ্য ছিল, তার প্রমাণ মিলনায়তন ভর্তি দর্শক। প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও তার বক্তৃতায় সে কথাই বললেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথানের অন্যতম নায়ক তিনি। তুখোড় বক্তা হিসেবেও সুখ্যাতি রয়েছে তার। তিনিও মেনে নেন স্কুলপড়ূয়ারা বক্তৃতাতে কম যায় না। তিনি বলেন, এত প্রাণবন্ত বিতর্ক সচরাচর দেখা যায় না। স্কুলপড়ূয়া তার্কিকদের জ্ঞানের গভীরতা তাকে মুগ্ধ করেছে।

এবারের বিজ্ঞান বিতর্ক ছিল মেয়েদের উঠে আসার আসর। ফাইনালে আসা ছয় তার্কিকের পাঁচজনই মেয়ে। ফাইনালের সেরা বক্তা নির্বাচিত হয়েছে পিএন বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও দলনেতা ফাইরাজ চৌধুরী। 

উৎসবের বিশেষ অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য তাকে তৃপ্ত করে। বুঝতে পারেন দেশ সঠিক পথে চলছে।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। বক্তৃতা করেন অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুজ্জামান, টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এস এম শাহাব উদ্দিন, বিএফএফ-এর প্রধান নির্বাহী সাজ্জাদুর রহমান, সমকালের ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ। বক্তারা স্মরণ করেন সমকালের প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ারকে। যার হাত ধরে এ বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।

পুরস্কার হিসেবে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সৌজন্যে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ উভয় দলের প্রত্যেক সদস্যকে ল্যাপটপ, ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেওয়া হয়। দুই সেমিফাইনালিস্ট দলের তার্কিকদের দেওয়া হয় স্মার্টফোন, সনদপত্র ও ক্রেস্ট।

পক্ষ দলের হয়ে বিতর্কে অংশ নেয় দলনেতা সামান্তা আফরিন তাহিমুন, রায়হানুল হাসান সিফাত ও দেবস্মিতা পাল। বিপক্ষে ছিল দলনেতা ফাইরাজ চৌধুরী ওয়েভ, সুবহা তামান্না মৃত্তিকা ও আনতারা আনিকা। পক্ষ দলের বক্তারা বলে, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিখলেও বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারছে না। কুসংস্কার থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারছে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়ারাও জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছেন।

প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে সহায়ক- এমন যুক্তি তুলে ধরে বিপক্ষ দলের বক্তারা। তারা বলে, বিজ্ঞান শিক্ষা অর্জন আর বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া এক নয়। মানবিক কিংবা বাণিজ্য বিভাগে পড়েও যে কেউ বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারে। কওমি মাদ্রাসায় পড়লে বিজ্ঞানমনস্ক মনন তৈরি হবে না, এমন যুক্তি অবান্তর।

দুই পক্ষের জোর তর্ক-বিতর্কে আসে দেশ-বিদেশের নানা উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বেহাল দশা। শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের খুটিনাটি। এতে মুগ্ধ তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর হাতে যখন কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন তুলে দেওয়া হয় রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তিনিও সেখানে ছিলেন। কিন্তু এ যুগের তার্কিকরা ওই কমিশনের প্রতিবেদন সম্পর্কে যতটা জানে তা তিনিও জানতেন না।

ছাত্রজীবনে বিতর্ক করার স্মৃতি থেকে তোফায়েল আহমেদ বলেন, তখন তাদের জন্য অবাধ তথ্যপ্রবাহ ছিল না। স্কুলে যেতে হতো খালি পায়ে। আজ গ্রামে খালি পায়ের মানুষ পাওয়া যায় না। অভাব, দারিদ্র্য দূর হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশকে এক সময় দারিদ্র্যের মডেল বলা হতো। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মডেল। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী সুরেশ প্রভু সেদিন বাংলাদেশের গ্রাম ঘুরে উন্নয়ন দেখে অবাক হয়েছেন। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন অসাধারণ’।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের তারুণ্য হবে আগামীর উন্নয়নের চালিকা শক্তি। তারাই গড়বে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ।

সভাপতির বক্তব্যে মুস্তাফিজ শফি বলেন, শিক্ষার্থীরাই শিক্ষা দিয়েছে ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ। যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’। আজ যারা স্কুলে পড়ছে তাদের সবাইকে এক একটি বাংলাদেশ হতে হবে। জাতিকে এগিয়ে নিতে হবে।

নির্বাহী পরিচালক শাহাব উদ্দিন বলেন, সমকাল শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না, সমাজকে বদলাতেও চায়। তাই সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই আরও অনেক কার্যক্রমের মতো বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব আয়োজন করে। সমকাল একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়তে ভূমিকা রাখতে চায়। যেখানে যুক্তিই হবে শক্তি।

শিশু তার্কিকদের যুক্তির শক্তির তারিফ করেন সাজ্জাদুর রহমান ও নূরুজ্জামান। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বিএফএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের অংশীদার হিসেবে তারা গর্বিত। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বিজ্ঞানের আলো জ্বেলে চলেছে এ উৎসব। একে আরও বিস্তৃত করার ইচ্ছার কথা জানান তিনি।

চূড়ান্ত বিতর্কে বিচারক ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সভাপতি তানজিবুল আলম, সাবেক কৃতী বিতার্কিক রাশেদুল ইসলাম পল্লব, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং অর্গানাইজেশনের সাবেক সভাপতি আবদুল্লাহ আহমেদ চৌধুরী, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সভাপতি ইফতেখারুল ইসলাম ও বিজ্ঞান বিতর্কের মডারেটর হাসান জাকির।