তিন গুণীকে সম্মাননা দিল ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই

নিউজ ডেস্ক: অর্থনীতি, কৃষি ও সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিন বিশিষ্ট গুণীজনকে সম্মাননা দিয়েছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। তারা তিনজনই এ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। সংগঠনটির ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে শনিবার বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তিত্ব অর্থমন্ত্রী ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শাইখ সিরাজ। আরও রয়েছেন বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য ফাহিম হোসেন চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি এ. কে. আজাদ। সংগঠনের মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি হল ও ২৬টি বিভাগের পৃথক অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও অনুষ্ঠানে যোগ দেয়।

বিকেলে সিনেট ভবনের সামনের খোলা চত্বরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার পাশাপাশি জাতীয় পতাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন। নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যকলা বিভাগের ছাত্রীরা।

৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৭০ পাউন্ডের কেক কেটে, রঙিন বেলুন উড়িয়ে, নেচে-গেয়ে ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচিতে শনিবার উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন প্রাঙ্গণ। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আড্ডা আর স্মৃতিচারণে মুখর হয়ে ওঠে অ্যালামনাই ফ্লোর।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল অ্যাসোসিয়েশনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। এ বছর অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কৃতী অ্যালামনাইকে সম্মাননা দিল সংগঠনটি।

অ্যালামনাই ফ্লোরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্তদের ফুল দিয়ে উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে, উত্তরীয় পরিয়ে পুরস্কার দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের জন্য আজ একটি গর্বের ও সম্মানের দিন। দুটি কারণে এ গর্ব। প্রথমত, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ৭০ বছর পার করছে ও নিজেদের তিন কৃতী মানুষকে সম্মান দেখাতে পারছে। দ্বিতীয়ত, এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্রী, প্রাক্তন অ্যালামনাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু-দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে, পাশাপাশি সংকট সামাল দিতে অনুকরণীয়, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব দিয়ে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, সেসবের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ ও ‘স্পেশাল রিকগনিশন ফর আউটস্ট্যান্ডিং লিডারশিপ’ দেওয়া হয়। এ স্বীকৃতি অ্যালামনাইদের জন্যও গর্বের বিষয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে প্রায় ৭০ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোথায়, তা তিনি জানেন না। কারণ তারা নানা মাপকাঠিতে র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণ করে। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যা আছে, তা অন্য কোনোটিতে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছে। এত বড় গৌরবের অর্জন পৃথিবীর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বহু গুণী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন। এটি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদেরও গর্বের। সম্মাননাপ্রাপ্তদেরও অভিনন্দন জানান তিনি।

সম্মাননা পেয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, তিনি সাধারণত কোনো সংবর্ধনা নেন না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি সংবর্ধনা দেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের এই আহ্বান তিনি এড়িয়ে যেতে পারেননি। তিনি গৌরব বোধ করছেন সম্মাননা পেয়ে।

মন্ত্রী বলেন, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ৭০ বছর পার করছে। এতে তিনি আনন্দিত। দু’বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে পা দেবে। সেটি উদযাপনের জন্যও তিনি অপেক্ষা করছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, জাতি গঠনে ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত বড়। এটিকে আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়।

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ সম্মাননা পেয়ে বলেন, আজ থেকে বহু বছর আগে তিনি যখন কৃষিকে গণমাধ্যমে তুলে ধরার কাজ শুরু করেন, তখনও ৮০ ভাগ লোক কৃষিকাজের সঙ্গেই জড়িত ছিল। তিনি ঠিক করেছিলেন, টেলিভিশনকে কেবল বিনোদনের বাপ হিসেবে নয়, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, ৮০ ভাগ তরুণ গ্রামে বাস করে। তাদের কৃষি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আগামী দিনের কৃষি হবে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি।

রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তিনি গান করেন বহুদিন। অনেক সাধনার পর তার ফল পেলে অনেক আনন্দ হয়। তিনিও আনন্দিত। যতদিন বাঁচেন, সুস্থভাবে যেন গান করে যেতে পারেন, এটাই প্রত্যাশা তার।

অনুষ্ঠানের সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এই কৃতী তিন ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা দিতে পেরে তারা নিজেরাই সম্মানিত বোধ করছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সততা সর্বজনবিদিত। কৃষি ও কৃষকের কথা গণমাধ্যমে তুলে ধরে শাইখ সিরাজ কৃষি খাতে অনন্য অবদান রাখছেন। ফাহিম হোসেন চৌধুরী সঙ্গীতকেই তার জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে নিয়েছেন। এই তিনজনের জন্য অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গর্বিত।

এ. কে. আজাদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভর্তির টাকা থাকে না, লেখাপড়া অব্যাহত রাখার মতো টাকা থাকে না। অ্যাসোসিয়েশন ভর্তির টাকার পাশাপাশি প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীকে মাসে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে বৃত্তি দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এ. কে. আজাদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের টয়লেট ফ্যাসিলিটি বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এ কেন্দ্রের মিলনায়তন সংস্কারের কাজেও হাত দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। সম্মাননাপ্রাপ্ত তিন গুণীজনের জীবনী সংবলিত সম্মাননাপত্র পাঠ করেন অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী সেলিনা খালেক, মুনিরা খান ও মাহমুদা খাতুন মিনা।

সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের আপ্যায়ন করানো হয়।