দেশবাসীকে নতুন কী বার্তা দেবে বিএনপি ?

নিউজ ডেস্কঃ দেশবাসীকে নতুন কী বার্তা দেবে বিএনপি? আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের জনসভা সামনে রেখে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়তে অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দাবির মুখে বিএনপি শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার ঘোষণা দেবে, নাকি কৌশলী ভূমিকা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি আপাতত সামাল দিয়ে যাবে? একইসঙ্গে রাজনৈতিক গুণগত মানোন্নয়নে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পদে ভারসাম্য আনার ঘোষণা দেবে, নাকি সংবিধান অনুযায়ী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর যে একচ্ছত্র ক্ষমতার রয়েছে সেটাই আঁকড়ে থাকবে- এ প্রসঙ্গও উঠছে? এ বিষয়গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। অন্যদিকে অপেক্ষায় রয়েছেন ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ার উদ্যোগী নেতারাও। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু দুটিতে অবস্থান স্পষ্ট করার ওপরই নির্ভর করছে বিএনপিকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা না করার সিদ্ধান্ত।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সূত্র মতে, শনিবারের জনসভায় সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ৭ দফা দাবি এবং নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কী করবে তার ১২ দফা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উপস্থাপন করবে দলটি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াতকে জনসভায় আমন্ত্রণ না জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বিএনপি দল হিসেবে এককভাবেই জাতীয় ঐক্যে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক গুণগত মানোন্নয়নেরও ঘোষণা দেবে তারা। ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দেবে।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, তারা তাদের দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শনিবারের জনসভায় জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। নির্বাচনের আগে ও পরে দলের করণীয় বিষয়গুলোও প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সব দলকে নিয়ে একটি বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ঐক্য প্রক্রিয়ায় তারা খুব কাছাকাছি এসে গেছেন। জামায়াতকে বৃহত্তর জোটে না নেওয়ার যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দাবির ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি একক দল হিসেবেই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে। এখানে অন্য কোনো দলের নাম বা প্রশ্ন আসবে কেন?

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়তে গত মঙ্গলবার যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যের যৌথসভায় স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দলের সঙ্গে ঐক্য গড়া হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বৈঠক শেষে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রেস ব্রিফিংয়ে এ ঘোষণা দেন। ওই বৈঠকে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ এ ব্যাপারে জানান, ২৯ সেপ্টেম্বরের জনসভায় দেশবাসীর সামনে বিএনপি তার অবস্থান তুলে ধরবে। এ ঘোষণার পর গতকাল বুধবার দিনভর রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির দাবি-দাওয়া ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য চূড়ান্ত করতে বেশ কয়েক দিন ধরে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে। এর আগে দলের থিঙ্কট্যাঙ্ক ও দল সমর্থিত সুশীল সমাজের কাছ থেকে বিএনপির ভবিষ্যৎ রূপকল্পের ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে একটি খসড়া দাবি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খসড়া দাবি ও লক্ষ্য কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করে তাদের অনুমোদনও নেওয়া হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, এ মুহূর্তে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্যে বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে এ নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আশা করি, সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে অচিরেই তারা জাতীয় ঐক্য গড়তে পারবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২৯ সেপ্টেম্বর সমাবেশ করবে বিএনপি, ২০ দল নয়। সেখানে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে দলীয়ভাবেই সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমাবেশে দলীয় কর্মপরিকল্পনা ও দাবি তুলে ধরা হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ৭ দফা :এ মুহূর্তে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায় করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে ৭ দফা দাবি চূড়ান্ত করা হয়েছে। অবশ্য এসব দাবি ঐক্য প্রক্রিয়ার সব দলেরই মূল দাবি হিসেবে থাকছে। দাবিগুলো হলো- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ইভিএম ব্যবহার না করা। এসব দাবির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার বাকি অংশীদাররাও কমবেশি একমত। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিটি ছাড়া বাকি দাবিগুলো তাদের ৫ দফার মধ্যেও রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, সরকার আবারও যে একতরফা নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে, তা রুখতেই তারা সব রাজনৈতিক দলকে এক কাতারে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিএনপি বড় ধরনের ছাড় দিতেও প্রস্তুত।

গুণগত পরিবর্তনে ১২ দফা :রাজনৈতিক গুণগত মানোন্নয়নে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার উদ্যোগী নেতাদের দাবিতেও রাজনৈতিক গুণগত মানোন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে বিএনপি এ দাবি পূরণের আশ্বাস দিচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা; সব প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসানে জাতীয় ঐকমত্য গঠন; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলীয়করণের ধারার বদলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা; রাষ্ট্রক্ষমতায় গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা; স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা; স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করা; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; দুর্নীতি প্রতিরোধে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথভাবে সংস্কার ও কার্যকর করা; সব নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান; সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় এ মূলনীতিকে অনুসরণ করে জাতীয় মর্যাদা এবং স্বার্থ সংরক্ষণ করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা; প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৎ পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা; কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদকে মদদ না দেওয়া এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া; সর্বনিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করে, আয়ের বৈষম্যের অবসানকল্পে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ এবং শ্রমজীবী জনগণের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জাতীয় নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণ করা।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, এ মুহূর্তে দেশের স্বার্থে এবং আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে তিনি নিজের আসনটিও ছেড়ে দিতে রাজি। সবার আগে দেশের মানুষকে অত্যাচার ও নির্যাতন মুক্ত করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।