দুদককে পঙ্গু করতে চায় একটি মহল

নিউজ ডেস্ক: দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে একটি বিশেষ মহল। রাষ্ট্রের একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী এ প্রতিষ্ঠানের আইন খর্ব করতে আট বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে তারা।

এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবে ২০১০ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার আগে সংশ্নিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বিধান রেখে দুদক আইন সংশোধন করা হয়েছিল; যা হাইকোর্টের রায়ে অবৈধ ঘোষিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রেখে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ প্রণয়নের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

গত ২০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় খসড়া এ আইন অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই খসড়াটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।

দুর্নীতিবিরোধী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এ খসড়া আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা আইনটি পাস না করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে। দুদক কর্তৃপক্ষও বলেছেন, যেসব সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতি করবে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে- আইন অনুযায়ী তাদের গ্রেফতার করা হবে।

সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তদন্তের ক্ষেত্রে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে আইনটি এর আগেও পাস হয়েছিল। পরে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে অনুমোদন নেওয়ার বিধান বাতিল হয়ে যায়। এবারও গ্রেফতারে অনুমতি নেওয়ার আইন পাস হলে পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সমকালকে বলেন, মহান সংসদে যে আইন পাস হবে কমিশন সেই আইন মেনে নিতে বাধ্য। এ নিয়ে কমিশন সরকারের সঙ্গে কোনো দেন-দরবারও করবে না। তবে সরকার দুর্নীতিবাজদের পক্ষে আইন প্রণয়ন করবে- এটি কমিশন মনে করে না। তাই আইনটি সংসদে পাস হলেও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে।

খসড়া আইনে দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, কোনো বিশেষ শ্রেণিকে দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষার জন্য আলাদা কোনো আইন হতে পারে না। এ ধরনের কোনো আইন পাস হলে সেটি হবে সংবিধান পরিপন্থী। সরকারি চাকরি আইনের খসড়া পাস হলে ক্ষমতাবান মানুষের বিরাট একটি অংশ দুদকের আওতার বাইরে চলে যাবে। স্বাধীন দুদককে অকার্যকর ও অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে স্বার্থান্বেষী একটি মহলের স্বার্থে এ খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধান দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ এই সরকারের আমলেই বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে বিশেষ পরিস্থিতিতে দুর্নীতির আওতার বাইরে রাখা হলে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

দুদকের প্রধান প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বলেন, সরকারি চাকরি আইনের খসড়ায় সরকারি কর্মকর্তা গ্রেফতারে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে এ বিধানটি বৈষম্যমূলক ও সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। খসড়া আইনটি পাস হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুদক ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, খসড়া আইনটি পাস হলেও তা পরে বাতিল হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

এর আগে ২০১০ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চপদস্থ প্রভাবশালী একটি অংশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়টি দুদক আইন সংশোধনী খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করিয়েছিলেন। এতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২(ক) ধারা যুক্ত করে সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে অনুমোদনের বিষয়টি কার্যকর করা হয়েছিল। খসড়া এ আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছিল ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর। আইনের গেজেট প্রকাশ হয়েছিল একই বছরের ২০ নভেম্বর।

পরে ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে চার আইনজীবী ৩২(ক) ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। পরের বছর ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটের শুনানি শেষে ৩২(ক) ধারা অবৈধ ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর দুদক তার হারিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ফিরে পায়।

স্বার্থান্বেষী মহলটি এ সময় নেপথ্যে থেকে দুর্নীতি তদন্তের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিয়ে নিতে ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েনি। এরপর ওই একই মহল সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৫-এর খসড়ায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে সরকারের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করতে সরকারের অনুমতি লাগবে বলে একটি ধারাও সংযুক্ত করে। পরে এ আইনটিও পাস হয়নি।

এবার তারা দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তা গ্রেফতার না করার পক্ষে নতুন আইন তৈরির নামে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করতে তৎপর হয়ে উঠেছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি চাকরি আইনের এ খসড়া সংবিধান পরিপন্থী। এটি দুদকের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিধানের ফলে সমাজে একধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী হবে। খসড়া আইনটিতে সরকারি কর্মকর্তা গ্রেফতারে অনুমতির বিধান রাখায় সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হয়েছে।

দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দুদক আইনে বলা হয়েছে, অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, সব ক্ষেত্রে দুদক আইন প্রাধান্য পাবে। সরকারি চাকরি আইনের খসড়া অনুমোদন পেলে দুদকের এই আইনি ক্ষমতা কোন পর্যায়ে থাকবে, তা ভাবার বিষয়।