ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ বৈঠক

মোহাঃ খোরশেদ আলম: ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে ১৬ জুলাই বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্রাদিমি পুতিন ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে একরকম কৌতুহল সৃষ্টি করে। কারণ হিসেবে বলা যায়, স্নায়ুযুদ্ধের (১৯৪৫-১৯৮৯) সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র ও তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, তবে ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পরেও তাদের মধ্যে পুরাতন দ্বন্দ্ব রয়ে যায়, আর মাঝে মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে তা চরম আকার ধারন করলেও ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর রাশিয়া ও আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মধ্যে দৃশ্যপট সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যায়।

এক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নের হারানো গৌরব পূনরুদ্ধারে যেসব কূটনৈতিক দক্ষতায় বিশ্বের শ্রত্রু-মিত্র প্রায় সকল দেশের সহিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পারমানবিক বিষয় নিয়ে একে অপরের কাছাকাছি হচ্ছে, অপরপক্ষে ট্রাম্প বুঝে-না-বুঝে, পুতিনের বিপরীতমুখী কৌশল অবলম্বন করছে আবার কোথাও পুতিনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্যাকেজ বিভিন্নভাবে বাস্তবায়নে সহযোগিতা ও সমর্থনও দিচ্ছে। যেমন-উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক খ্যাত কিম জং উনের সহিত ১২ জুন ট্রাম্পের সহিত ঐতিহাসিক বৈঠক ও নাটকীয় ভঙ্গিতে করমর্দনে কিম জং উনকে রীতিমত আত্বপ্রকাশ করলেন।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই সম্মেলন সফল করার বিষয়ে এবং উত্তর কোরিয়ার নেতাকে বিশ্ব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাশিয়ার অনেক অবদান রয়েছে। আবার ক্রেমলিন থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল সংক্রান্ত ব্যাপারে ট্রাম্পের নির্লিপ্ততা একরকম বৈধতা দেয়ার সামিল। মার্কিন নির্বাচনে ১২ রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ আনার পর ট্রাম্পের সাথে পুতিনের বৈঠকের ব্যাপারে আপত্তি জানানো হলেও, সেই বৈঠকে ১২ রুশ গোয়েন্দার জোরালো কোন ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস আদায় না করতে পারলেও ট্রাম্প রাশিয়ার নেতা পুতিনকে বিভিন্নভাবে প্রশংসা করেছেন। কখনো ভাল নেতা, আবার কখনো পুতিনকে বলেছেন টাফ কুকি। গত মার্চে বিতর্কিত নির্বাচনে পুতিনের জয়ে ট্রাম্প উচ্চশিত ভূয়সী প্রশংসা ও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

সিরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন জটিল ইস্যুতে কখনো রাশিয়ার মুখোমুখি হতে চাননা। ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় যখন ত্বরান্বিত করে, তখন রাশিয়াকে ছাড় দেয়া ব্যতীত ট্রাম্পের কিইবা করার আছে! মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেন, ট্রাম্পের পক্ষে রাশিয়া ওই নির্বাচন প্রভাবিত করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিপক্ষে না করে তিনি ডেমোক্র্যাট দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, নির্বাচনে হারার কারনে তারা এইসব অভিযোগ তুলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়া মহাদেশের অনুন্নত দেশের স্বৈরাচারী নেতার আদলে এসব কথা বলছেন। কারন তিনি নিজেও ভালভাবে জানেন, তার দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ডেমোক্র্যাট দলের কথায় চলেনা। বিশাল সুনামের সহিত এবং দায়িত্বশীলতার সাথে সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্পর্শকাতর বিষয়ে রিপোর্ট প্রদান করেন এটা সারা বিশ্বের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞগন জানেন।

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগের পর এই দুই নেতার সম্পর্কের বিষয়টি বিশ্বের সবার নজরদারির মধ্যে রয়েছে। যদিও পুতিন ও ট্রাম্প সর্বদা অভিযোগটি নাকচ করে আসছে। কিন্তু দুই নেতার তড়িঘড়ি শীর্ষ বৈঠক এবং বৈঠকের আগে টানা এক ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের সচেতন ও বিশেষজ্ঞগণ অনুধাবন করছেন এক ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়ী হওয়ার পেছনে রাশিয়ার যে কারিশমা আছে তাতে দুই নেতা তামাম বিশ্বকে আড়াল করে একটি প্যাকেজ আলোচনা চালিয়ে নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেই আলোচনায় ট্রাম্পকে বিজয়ের পেছনে পুতিনের বিনিময় আদায় করার ব্যাপারটি প্রাধান্য পাওয়াটা অসম্ভবের কিছুনা। কারণ পুতিন হয়তোবা ট্রাম্পকে পোষা ময়না পাখির ন্যায় খাচায় আটকিয়ে রেখে রাশিয়ার স্বার্থ আদায় করার চেষ্টা করছেন। তাইতো দীর্ঘ এক ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্পের বিভিন্ন শর্তের দাবীর ফর্দিটি হয়তোবা দীর্ঘ হওয়ায় ট্রাম্পের জন্য বুমেরাং হয়েছে অর্থাৎ ট্রাম্পের জন্য শ্যাম রাখি, নাকি কুল রাখি অবস্থা।

১২ জুন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সহিত শীর্ষ বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ করমর্দন হয় অথচ পুতিন-ট্রাম্পের দুই নেতার করমর্দন ৩ সে.-এর বেশি স্থায়ী হয়নি এবং বৈঠকের সময় তাদের কোন হাসি-খুশি দেখাচ্ছিলনা। তাদের এই দৃশ্য পুরো বিশ্বের মানুষকে আরো তাক লাগিয়েছে। মার্কিন মিডিয়াতে তাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অপরপক্ষে বৈঠকের পর ট্রাম্প তার টুইটার বার্তায় রাশিয়ার সাথে আমেরিকার খারাপ সম্পর্কের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের পূর্ববর্তী নেতাদের দোষারোপ করেছেন। আমেরিকার জনগন রাশিয়াকে প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী দেশ হিসেবে সর্বদাই ভাবেন। সদ্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর আর্মড সার্ভিস কমিটির গুরুত্বপূর্ন সদস্য সিনেটর ম্যাককেইন রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আর ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমর্থনের পাল্লা হিলারী ক্লিলটনের বিরুদ্ধে নেয়ার একটি উদ্যোগের পেছনে রাশিয়ার ভূমিকা ছিল।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় চালানো সাইবার হামলা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভ‚য়া সংবাদ ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে একাজ করেছিল রাশিয়া। ট্রাম্প-পুতিনের শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ সম্মেলনে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি তার নিজের গোয়েন্দা সংস্থাকে, নাকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বিশ্বাস করবেন? উত্তরে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া এটি করেনি বলে জানিয়েছেন পুতিন। তিনি এটি বলেই ক্ষান্ত নয়, তিনি আরো মন্তব্য করেন মি. পুতিন এটি কেন করবেন তার কোনো কারণ আমি দেখিনা। ট্রাম্পের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফলে দেখা যায়, নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্প কখনো জোরালোভাবে রাশিয়ার বিপরীতমুখী কোন কাজ বা সংঘর্ষ হওয়ার মতো কিছু করেননি। কখনো বৈদেশিক নীতি-নির্ধারণে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা দূর্বল রাষ্ট্রের শাসকের ন্যায় পিছু হটে আসতেন। বুদ্ধিমান পুতিন ট্রাম্পকে বহুমাত্রিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ যা পেয়েছেন,তা কিভাবে আরো দীর্ঘায়িত করে অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচনেও ট্রাম্পকে আবার ক্ষমতা আনা ও এর প্রতিদান বিষয়টি আলোচনা থাকার কারণে রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি অমিমাংসিতভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ার কারনে মিডিয়ার সামনে ট্রাম্প-পুতিনের হাস্যোজ্জ্বল চেহারার পরিবর্তে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একদিকে তার বিদেশ নীতির অদক্ষতা ও অন্যদিকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন।

এই দুই মেরুর মাঝে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্রাদিমি পুতিন দূরদৃষ্টি রাজনীতি ও প্রজ্ঞার কারনে আমেরিকার ব্লকে যেসব দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি ছিল, তা আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে রাশিয়া। শুধু তাই নয়, পূর্বে আমেরিকার সর্বদিক দিয়ে মূল প্রতিদ্ব›দ্বী ছিল রাশিয়া। এখন আমেরিকা রাশিয়ার সহিত কোন প্রতিদ্বদ্বীতায় না গিয়ে চীনসহ অপরাপর দেশের সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে প্রতিদ্ব›দ্বীতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া আমেরিকার সহিত অন্যান্য দেশের দ্বন্দ্ব রাশিয়া গ্রামের বড় মোড়লের ন্যায় সমাধানে উপস্থিত হয়।

যুদ্ধে বিদ্ধস্ত সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া, চীন, ভারত, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে আমেরিকা আগে যেভাবে খবরদারি করেছে, বর্তমানে সে খবরদারি হারিয়ে ফেলেছে। চীন বিগত ২০১০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করেছে। বর্তমানে বিশ্বস্ততা ও বাস্তবসম্পমত বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে বিনিয়োগ তথা সার্বিক বিষয়ে উন্নয়নের ফলে রাশিয়ার পর চীনকে বিশ্বস্ত বন্ধু মনে করছে। উল্লেখ্য, ছয় জাতি পারমানবিক চুক্তি থেকে আমেরিকা অন্যায়ভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করার ফলে ইরান ৯৫০ টন ইউরোনিয়াম মজুদ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী পারমানবিক কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শুধু তাই নয়, ইরানের তেল রফতানি বন্ধ করে দেয়ার যে সর্বশেষ হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট সেরকম কিছু করলে আরব উপসাগরে পানি পথে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। আগে কোন দেশের অন্যায়ের ছিটে-ফুটা দেখে ব্যবস্থা নিতে গেলে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানসহ কিছু দেশ অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থানে নেই। ট্রাম্প নিজের হাতে শক্তি তার ভুলের কারনে শিথিল করছে, এতে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া ও অপরাপর দেশ। ফলে বিশাল পরাশক্তির একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তার ব্যক্তিগত খায়েস ও অদূরদৃষ্টির কারণে ছেলেমি ও ভাড়ামি হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সর্বশেষ, প্লেবয় মডেল ক্যারেন ম্যাকডোগালের সাথে সম্পর্কের স্পর্শকাতর কথোপকথনের অডিও ফাঁস, আর এই ঘটনার জন্ম ২০১৬ সালে মার্কিন নির্বাচনের দুই মাস আগে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর ফাঁস করেছে। তাকে নিয়ে তার দেশের জনগণও বিরাট হুমকির মুখে আছেন এবং পুরো বিশ্ব কোন দিকে মোড় নিবে তা এমূহুর্তে বলা মুসকিল, এজন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে বিশেষষজ্ঞদের ধারণা ট্রাম্পের বিভিন্ন খামখেয়ালীপনা মন্তব্য নিজ দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। আবার তারা এও আশা করেন, বিশাল গণতন্ত্রকামী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্প পরবর্তী আবারও পূনর্গঠিত হয়ে অগ্রসর হবে কিন্তু বিশ্বের নানান প্রান্তে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে।

লেখকঃ  বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা নিউজ২৪.কম