জাতীয় ঐক্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের

নিউজ ডেস্ক: বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক জোট-মহাজোট থাকার পর আবারও নতুন করে ‘জাতীয় ঐক্য’ গঠনের বিষয়টি নিয়ে সরগরম হয় উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে শনিবার বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের সূচনা হয়।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী এ ঐক্য আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছেন রাজনীতিবিদরা। মুখে এই ঐক্যকে গুরুত্ব না দিলেও কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এদিকে সংসদের বাইরে থাকা বড় দল বিএনপি মনে করছে, জাতীয় ঐক্য তাদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে একটি শক্তিশালী ভিত তৈরি করে দেবে। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরাও এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ কী- তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্নেষণ করছেন। বিশ্নেষকরা কেউ বলছেন, এতে বিএনপি অনেক লাভবান হবে। আবার কেউ বলছেন, এখনও মূল্যায়ন করার সময় হয়নি। সময়ই বলে দেবে জোটের ভবিষ্যৎ।

নানা টানাপড়েনের পর শনিবার রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে একসঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়ান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের প্রধান মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থসহ ডজনখানেক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, শিক্ষাবিদ মোমেনা খাতুনসহ দেশের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিও এ মঞ্চে ছিলেন।

ঐক্য প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রার প্রথম দিনেই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আলটিমেটাম দেন  তারা। মূল পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো- নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন। এ দাবিতে ১ অক্টোবর থেকে মাঠে নামারও ঘোষণা দিয়েছেন নেতারা। এ অবস্থায় নির্বাচনী রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’।

ঐক্য প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের মিত্র ১৪ দলের নেতারা। তাদের মতে, এটা ‘ষড়যন্ত্র’ এবং জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের জোট। এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। তবে বিশ্নেষকরা বলছেন, শনিবারের ঘোষণার পর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে এই ঐক্যকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সাধারণ মানুষের মনে এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- তা হলো এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ কী? বিএনপি এবং সমমনা দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন রাজনৈতিক দলের এ ঐক্য প্রক্রিয়া শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই থেমে যাবে, নাকি ভবিষ্যতেও দেশের রাজনীতিতে বড় একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে?

এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সমকালকে বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী, সে প্রশ্নের জবাব এখনই চট করে দেওয়া যায় না। কিন্তু এই ঐক্য প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে, সেটা জোর দিয়েই বলা যায়। সরকারের আচরণ ক্রমাগত জনবিরোধী হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেভাবে দমন করা হয়েছে, তা সাধারণ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যেভাবে মানুষের কণ্ঠরোধ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার বদলে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের বিপরীতে একটি শক্ত রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন সামনে রেখে এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, বিএনপির বিপুল জনসমর্থন আছে, আর অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের ইতিবাচক পরিচিতি রয়েছে নাগরিক সমাজে। এ দুটির সমন্বয়ের ফলে আগামী নির্বাচনে আর যা-ই হোক, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হবে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট। তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচনের পরও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, যদি এই জোট আরও এগিয়ে যেতে পারে।

টানা ১০ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কারণে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলও নেই। বিএনপি সংসদের বাইরে গিয়ে রাজপথে সাংগঠনিক সক্ষমতার পরিচয়ও দিতে পারেনি। নানা কারণে রাজপথের আন্দোলনে এ দলটি এখন অনেক দুর্বল। এ অবস্থায় এই ঐক্য বিএনপিকে কতটুকু শক্তি জোগাবে! রাজপথের লড়াইয়ে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে এই ঐক্য- এখন আলোচিত হচ্ছে এ প্রশ্নটিও।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক অজয় রায় সমকালকে বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়া কতদূর যাবে, আগামী নির্বাচনেই বা কীভাবে অংশ নেবে, সেগুলোর কোনোকিছুই পরিষ্কার নয়। তবে দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব তীব্রভাবেই অনুভূত হচ্ছে। সেই অভাবটা যদি এই ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পূরণ হয় সেটাও দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, একটা দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে সেই দলের মধ্যে এক ধরনের স্বেচ্ছাচার মনোবৃত্তি দেখা যায়। যেটা এখন আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদারনৈতিক মনোভাবের হলেও আওয়ামী লীগের সব নেতা এরকম নন। বরং বিপরীত চিত্রটাই বেশি চোখে পড়ছে। যেভাবে আন্দোলন দমন, অভিযান, আইন প্রণয়ন হচ্ছে, সেটা আধিপত্যকেই প্রকটভাবে সামনে আনছে।

অজয় রায় আরও বলেন, এ অবস্থায় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে আধিপত্যের মাত্রা আরও ভয়াবহ হবে। যেটা দেশের সার্বিক রাজনীতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। এ কারণে এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে অধ্যাপক অজয় রায় ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের রাজনীতিতে ভারসাম্য খুবই প্রয়োজন। এই ঐক্য প্রক্রিয়া সেই ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ১৪ দলের নেতা ও সরকারের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু এই ঐক্য প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তারা এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে একদিকে ‘ক্ষমতায় যাওয়ার ষড়যন্ত্র’ এবং অন্যদিকে ‘জনবিচ্ছিন্ন’ নেতাদের নিছক আস্ফালন হিসেবেও মন্তব্য করছেন। আসলেই কি আওয়ামী লীগ ঐক্য প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে না?

এ বিষয়ে লেখক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এটা বলা যাবে না। গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এক ধরনের অস্বস্তিতেও পড়েছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের নানামুখী বক্তব্য থেকেই সেটা স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঐক্য প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী, সেটা সময় বলে দেবে। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারা যে দাবি দিয়েছেন, সেই দাবির সমর্থনে রাজপথে কতটা শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারবে, দাবি আদায় না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কী হবে, সবকিছুই আগামীতে তাদের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হবে। কিন্তু এই ঐক্য প্রক্রিয়া রাজনীতিতে অনেক দিন পর একটা বড় নাড়া দিয়েছে, এ নিয়ে সন্দেহ নেই।

ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতের অবস্থান কী? এ প্রশ্নটিও সামনে চলে এসেছে। এর আগে ড. কামাল হোসেন স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার দল কোনো ঐক্য করবে না। ঐক্য প্রক্রিয়ার মঞ্চেও জামায়াতের কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি ঘাতকদের বাঙালি নিধনে প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ সহযোগী এই দলটির শীর্ষ নেতারা অনেকেই ছিলেন যুদ্ধাপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হওয়ায় অধিকাংশ শীর্ষ নেতা সর্বোচ্চ সাজায় দণ্ডিত হয়েছেন। ফলে সাংগঠনিকভাবে দলটি অস্তিত্ব সংকটেও রয়েছে। এ অবস্থায় ঐক্য প্রক্রিয়ার কারণে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান কি আরও দুর্বল হলো?

এ প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এই জোটের ফলে বিতর্কিত রাজনৈতিক চিন্তার ধারক জামায়াত আরও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এমনিতেই তাদের নিবন্ধন নেই। আগামী নির্বাচনে অন্য দলের প্রতীক বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। তবে জামায়াতের চিহ্নিত বিতর্কিতদের কোনো দল বা জোট মনোনয়ন দেয় কি-না, সেদিকেও জনগণের দৃষ্টি থাকবে। অতএব, ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও জামায়াতকে চিন্তার পরিবর্তন করেই মাঠে নামতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন এই রাজনৈতিক মোর্চার আত্মপ্রকাশের ফলে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। বিরোধী জোট ভোটে অংশ নেবে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এদিক থেকে এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে হবে। 

সূত্র: সমকাল