মূল সংকট আস্থার

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার শপথ নিলেন রাজনৈতিক নেতারা। তারা নির্বাচনী প্রচার ও নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে ভূমিকা রাখার শপথ নিয়েছেন। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সংবাদটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) আয়োজিত ‘শান্তিতে বিজয়’ প্রচারাভিযান কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ দেশের ৪০ জেলা থেকে আগত প্রায় ৪০০ রাজনীতিক যে শপথ নিলেন, তা আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক বটে; কিন্তু এর সুফল নির্ভর করছে রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ওপর। ওই অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন। তারাও নানা রকম ইতিবাচক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

ইতিপূর্বে এই কলামেই লিখেছিলাম, দেশের রাজনীতিতে সর্বাগ্রে দরকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ অনেক কিছু অর্জন করাই সম্ভব হবে। বাংলাদেশ তো বটেই, প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক দেশেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশা বরাবরই পোষণ করে। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল এর নজির আমাদের সামনেই আছে। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ কিংবা সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু যে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন তাই নয়, এর ফলে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বচ্ছ, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়টি আমাদের দেশে নতুন কোনো আলোচনার বিষয় নয়। তবে কখনও কখনও তা মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে কিংবা উঠছে বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে।

অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন ইত্যাদি। কিন্তু এসব ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। সরকার বলছে, সবকিছু সংবিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে। সংবিধান তো দেশ-জাতির কল্যাণের জন্যই। এ যাবৎ এই লক্ষ্যে সংবিধানে বহুবারই সংশোধনীও আনা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে (নতুনভাবে কোনো বিষয় যুক্ত করা কিংবা বর্জনে) কোনো জনমত গ্রহণ করা হয়নি। দলীয় চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেক ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হয়েছে। অতীতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও কয়েক মাস বাকি আছে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে এর নিরসন করা সম্ভব না হলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই শুধু নয়, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করাটাও কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এসব ক্ষেত্রে সুখকর নয়। দলীয় সরকারের অধীনে এ দেশে প্রশ্নমুক্ত, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে- এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে কতটা আছে, এ প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের বড় আয়োজন, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই আয়োজন কি যথাযথভাবে করা সম্ভব হবে? নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে কতটা দক্ষতা-সক্ষমতার পরিচয় দিতে পেরেছে?

দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের দেশের কোনো কোনো রাজনীতিক বিগত কয়েক দশকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। জনস্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পেলে অবস্থা যা হওয়ার বা হতে পারে, তাই তো হয়েছে এখানে। অথচ এও সত্য, এ দেশের রাজনীতিকদের অর্জন-ত্যাগ কোনোটাই কম নয়। ইতিহাসে এসবের স্পষ্ট সাক্ষ্য মেলে। কিন্তু রাজনীতিকে বক্রপথে টেনে নেওয়ার পেছনে কখনও কখনও যেসব চিত্র ফুটে উঠেছে, সেসবই আমাদের সর্বনাশের পথটা প্রশস্ত করে দিয়েছে। দলীয়করণ এ দেশের বড় ব্যাধি। এর অপচ্ছায়া নানা ক্ষেত্রেই পড়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবেই; কিন্তু হিংসাশ্রয়ী হয়ে ওঠার অবকাশ নেই। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রশ্নমুক্ত কিংবা গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচনের আলামত এখন পর্যন্ত কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্পষ্ট নয়। আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজনীতিতে মূল সংকট হলো আস্থার।

নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনআস্থা নেই। তাদের কারো কারোর কথাবার্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে এই আস্থার সংকট আরও পুষ্ট করেছে। তারা তাদের হূতআস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিমধ্যে কয়েক দফা সুযোগ পেলেও এ ক্ষেত্রে তারা সফল তো হনইনি, উপরন্তু আরও কিছু প্রশ্ন ও নেতিবাচকতার জন্ম দিয়েছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসছে, অথচ এখন পর্যন্ত তারা সব দলের জন্য সমান অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। সমতল ভূমি নির্বাচনের অন্যতম শর্ত হলেও তা এখন পর্যন্ত এতটা অসমতল যে, এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করা কতটা যুক্তিযুক্ত- এ প্রশ্ন উঠবেই। নির্বাচন কমিশনের ওপর জনআস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, তা আরও পুষ্ট করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাই দায়ী। নির্বাচনী পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার জন্য নির্বাচন কমিশন আমাদের সুধী সমাজকে ডেকেছিল। সেখানে বলেছিলাম, যদি সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হয়, তাহলে সবার সমান সুযোগ অবশ্যই সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাচনীবিধি ঘোষণার আগে কোনো দলই প্রচার চালাতে পারবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আরও আগে থেকেই যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা আরও হ্রাস পেয়েছে। একটি দল কিংবা জোটের নেতারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আর অন্যরা শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ-মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিও পালন করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমন চিত্র স্থিতিশীলতা নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যায়নীতির ক্ষেত্রেও তা বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।

পরমতসহিষুষ্ণতা, সমানাধিকার, আইনের শাসন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নির্মোহ অবস্থান ইত্যাদি প্রায় প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে নেতিবাচকতাই সামনে চলে আসে। দেশের রাজনীতিতে মেরুকরণের নানা রকম প্রক্রিয়া চলছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হয়েই থাকে। জোটগত নির্বাচন শুধু এ দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই হওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে এসব বিষয় যেভাবে উপহাস কিংবা ব্যঙ্গাত্মক আক্রমণের তীরে বিদ্ধ হয়, তা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। আগেই বলেছি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে দরকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে আমাদের সব প্রত্যাশাই হোঁচট খাবে। দলীয় সরকারের অধীনে এখানে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না- এই ধারণা পুষ্ট করার দায় সরকার এড়াতে পারে না। তাদের কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের কারণেই এমন ধারণা জন্ম নিয়ে তা ক্রমেই পুষ্ট হয়েছে। তাছাড়া স্ববিরোধিতা আমাদের দেশের রাজনীতিতে অন্যতম বড় সমস্যা। এই স্ববিরোধিতা শুধু রাজনীতির চিত্রই যে মলিন করছে তাই নয়, এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের ওপরও। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অনেক কাজেই তড়িঘড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলেও আস্থার সংকট প্রকট হচ্ছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অনেক কিছুই পুনর্বার উঠে এসেছে। সুজনের তরফে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা এসব কতটা আমলে নেবেন কিংবা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন- বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্নের উত্তর আশাব্যঞ্জক হওয়ার কোনোই কারণ নেই। আমাদের স্পষ্ট কথা হলো, আমরা পঙ্কিলতামুক্ত রাজনীতি ও নির্বাচন চাই। আমরা চাই জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, তাদের মতামত স্বাধীনভাবে পেশ করার পথটা মসৃণ হোক। অনুমতির রাজনীতি কিংবা গণতন্ত্রের নিরসন ঘটুক। নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড হোক বিতর্কমুক্ত ও নির্মোহ। সুস্থ ধারার রাজনীতিচর্চার পথটা সুগম হোক। সহনশীল রাজনৈতিক চর্চার শপথ নিলেই তো শুধু হবে না, এর যথাযথ বাস্তবায়নে দরকার সরকার ও প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা। একই সঙ্গে দরকার আস্থার সংকট নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছর পরও আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়া বিতর্কমুক্ত করতে পারিনি, নির্বাচন ও রাজনীতিকেন্দ্রিক আস্থার সংকট কাটাতে পারিনি, তা সত্যি খুব দুঃখজনক। যেভাবে কিংবা যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়গুলো বিশ্নেষণ করি না কেন, দেশে যে বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট বিরাজ করছে, তা তো অস্বীকার করা যাবে না।

আমাদের দায়িত্বশীলরা উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার- প্রতিশ্রুতি এ যাবৎ কম ব্যক্ত করেননি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসবের বাস্তবায়ন চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ইতিমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে অনেক কথা বলা হয়েছে। সুপারিশ-প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সবকিছুই যদি অমূলক বলে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান, তাহলে এর ফল ভালো না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বাগ্রে উদ্যোগী হতে হবে সরকারকেই।