তারা দু’জন

নিউজ ডেস্ক: অভিনয়ের সুবাদে ফেরদৌস ও পূর্ণিমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব। কাজের মধ্য দিয়ে একে অপরকে, শিল্পী সত্তাকে চিনে নেওয়া। জুটি হিসেবে তাই দর্শকের মনোযোগ কাড়তে সময় লাগেনি তাদের। এই তারকা জুটির বন্ধুত্বের গল্প নিয়েই এ আয়োজন। লিখেছেন সাদিয়া মুনমুন

একেই বলে বন্ধু। একে অপরের বোঝাপড়া, কাজে সহযোগিতা, বিপদ-আপদে পাশে থাকা- সবই নজর কেড়েছে চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষদের। অন্যদের মতো ফেরদৌস কিংবা পূর্ণিমা কেউ কারও দোষ আবিস্কার করতে পারেননি! অনেকে তাই বন্ধুত্বের নজির হিসেবে ফেরদৌস-পূর্ণিমার কথা বলে থাকেন। কিন্তু কবে থেকে তাদের এই বন্ধুত্ব? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল ‘মধু পূর্ণিমা’ ছবির শুটিং থেকে তাদের পরিচয়; পরে তা বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছে। ‘মধু পূর্ণিমা’ ছিল জুটি হিসেবে তাদের প্রথম ছবি। তার আগে পূর্ণিমা ও ফেরদৌস মাত্র একটি ছবিতে কাজ করেছেন। সে হিসেবে বলা যায়, অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরুতেই তাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া। তারপরও এই তারকার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বন্ধুত্বের গল্প। ফেরদৌস শোনালেন গল্পের শুরুটা। 

“তখনও মুক্তি পায়নি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবিটি। এরই মধ্যে প্রস্তাব পেলাম ‘মধু পূর্ণিমা’ নামে ছবিতে অভিনয়ের। ছবিতে আমার সহশিল্পী পূর্ণিমা। এর আগে আমাদের কখনও আলাপ হয়নি। শুটিংয়ে গিয়ে যখন আলাপ হলো, মনে হলো অপরিচিত নই, আমরা পরস্পর অনেক দিনের চেনা। কাজের বিষয়ে সহযোগিতাপরায়ণ ছিল বলেই চরিত্র দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সব রকম চেষ্টা করে যেতে পেরেছি। তখন থেকেই কাজের বিষয়ে ভালো একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু কেন জানি প্রথম ছবির পর জুটি হিসেবে একসঙ্গে তেমন কাজ করা হয়ে ওঠেনি! নির্মাতারা দু’জনকেই নিয়ে আলাদা জুটি গড়ে ছবি নির্মাণ করেছেন। যে কারণে এফডিসি কিংবা কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া আমাদের তেমন দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না। কিন্তু যখনই দেখা হতো ঠিক প্রিয়জনের মতো আমরা একে অপরের খোঁজখবর নিতাম। পরে বেশ কিছু ছবিতে আমরা একসঙ্গে অভিনয় করেছি। তখন পূর্ণিমাকে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি, কাজের বিষয়ে আমাদের মতপার্থক্য খুব একটা নেই। যে কারণে বন্ধুত্ব হতেও সময় লাগেনি।” 

ফেরদৌসের কথার রেশ ধরে পূর্ণিমা বলেন, “প্রথম ছবির পর যখন আমরা ভিন্ন জুটি গড়ে একের পর এক ছবি করছি, তখনও যে কেউ কাউকে ভুলে যায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যেত দেখা হলেই। সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে ‘জীবন চাবি’, ‘বিপ্লবী জনতা’, ‘সন্ত্রান যখন শত্রু’, ‘দুর্ধর্ষ সম্রাট, ‘বলো না ভালোবাসি’,’ রাক্ষুসী’, ‘শুভ বিবাহ’ ছবিগুলোয় জুটি বেঁধে অভিনয় করতে গিয়ে। তখনই স্পষ্ট হয়েছে, এতদিন একসঙ্গে কাজ না করলেও আমরা একে অপরের খোঁজখবর ঠিকই রেখেছি।”

বন্ধুত্বের গল্প তো শোনা হলো। এখন ফেরদৌস ও পূর্ণিমা কার চোখে কে কেমন জেনে নেওয়া যাক। ফেরদৌস বলেন, ‘পূর্ণিমা অভিনেত্রী হিসেবে এক কথায় অসাধারণ। যে কোনো চরিত্র সাবলীলভাবে পর্দায় তুলে ধরে সে। অভিনয়ও এক ধরনের চর্চা বা সাধনার মতো। চরিত্রের যাপিত জীবন থেকে শুরু করে চারপাশে তার অবস্থান, স্থান-কাল সবকিছুর সঙ্গে সে কেমন আচরণ করে, কীভাবে গহিনের কথা প্রকাশ বা গোপন রাখে- এ সবই জানতে হয়। এক জীবনে আমরা সব শ্রেণির মানুষকে কাছাকাছি দেখার সুযোগ পাই না। কিন্তু সেসব চরিত্রে যখন অভিনয় করতে হয়, তখন নানাভাবে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তাই যে কোনো চরিত্রে সাবলীল অভিনয় দিয়ে তুলে ধরা কঠিন একটি কাজ। অথচ এই কাজটি অনায়াসে করতে পারে পূর্ণিমা। আমি নিজেও জানি না, এই কঠিন কাজ পূর্ণিমা কীভাবে রপ্ত করেছে! অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা আর ভালোবাসা না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। শুধু অভিনয় নয়; মডেলিং ও উপস্থাপনা দিয়েও লাখো দর্শকের মন জয় করেছে পূর্ণিমা। আমরা একসঙ্গে বেশ কিছু অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি। এটা করতে গিয়ে আবিস্কার করেছি, পূর্ণিমার মধ্যে এক ধরনের শিশুসুলভ ব্যাপার আছে। একদিকে অন্যকে অনুকরণ করে যেমন আসর জমিয়ে দিতে পারে, তেমনি আবার নিজের সঙ্গে নিজেই অভিমান করে কখনও কখনও ঘরে বসে থাকে। কোনো কাজ করতে চায় না। এটুকু ছেলেমানুষি ছাড়া ব্যক্তি পূর্ণিমা যথেষ্ট উদার। যে কোনো সমস্যায় তাকে পাশে পাওয়া যায়। চলচ্চিত্র অঙ্গনের যে কোনো সমস্যায় সে এগিয়ে আসে। পেশাদারি অহংকারও নেই তার। তাই এমন একজন মানুষকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া সত্যিই আনন্দের।’ 

ফেরদৌসের চোখে পূর্ণিমা কেমন তা তো জানা হলো। এখন পূর্ণিমা কী বলেন, সেটা জানার বাকি। পূর্ণিমা যখন কথা শুরু করলেন, দেখা গেল তার ও ফেরদৌসের কথার মধ্যে যথেষ্ট মিল। পূর্ণিমাও স্বীকার করেন, ‘ব্যক্তি ফেরদৌস অনেক শিল্পীর চেয়ে বেশি বন্ধুত্বপরায়ণ। যে কোনো সমস্যায় তাকে পাশে পাওয়া যাবে- এটা নিশ্চিত। অভিনেতা হিসেবেও সব ধরনের দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো প্রতিভা আছে তার। নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে ফেরদৌস তা প্রমাণও করেছে। আমার এটা ভেবে ভালো লাগে যে, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ফেরদৌসের মতো আমার একজন বন্ধু আছে। প্রথম ছবির পর মাঝে বড় একটা বিরতি থাকলেও বোঝাপড়া একই রকম ছিল। আমাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিন টিকে থাকবে বলে মনে করি।’ 

যেখানে পেশাদারি প্রতিযোগিতা তারকাদের মধ্যে এক ধরনের মনের দূরত্ব তৈরি করছে, ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন ফেরদৌস ও পূর্ণিমা। তাই তো নতুন করে দর্শকের মনোযোগ কাড়তেও সময় লাগেনি তাদের। সেই সুবাদে আবারও জুটি হয়ে বড় পর্দায় উপস্থিত হচ্ছেন এ দুই তারকা। এরই মধ্যে অনেকে জেনে গেছেন শেলি মান্না প্রযোজিত ‘জ্যাম’ ছবিতে এবং ওবায়দুল কাদেরের উপন্যাস নিয়ে নির্মিতব্য ‘গাঙচিল’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তারা। এ নিয়ে পূর্ণিমা বলেন, “অনেক দিন অপেক্ষায় ছিলাম বড় পর্দায় ফেরার। চাইলে হয়তো যে কোনো সময় অভিনয় করতে পারতাম। কিন্তু গড়পড়তা ছবিতে অভিনয় করতে চাইনি। যে কারণে এতদিন চলচ্চিত্র থেকে কিছুটা দূরে ছিলাম। ‘জ্যাম’ ছবির মাধ্যমে বিরতি ভাঙার পাশাপাশি ফেরদৌসকে সহশিল্পী হিসেবে পাচ্ছি- এটাও আনন্দের। ভালো লাগার আরেকটি বিষয় হলো, ছবিটি নির্মাণ করছে চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কৃতাঞ্জলি। মান্না ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিতব্য ছবি দিয়ে ফেরা হচ্ছে বলেও এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করছে।” 

ফেরদৌস কথায়, ‘অনেক দিন পর একসঙ্গে দুটি ছবিতে আমি আর পূর্ণিমা অভিনয় করছি। এর চেয়ে বড় কথা হলো নাঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল পরিচালিত দুটি ছবির গল্পই ভিন্ন আঙ্গিকের। যেখানে দর্শক চেনাজানা মানুষের ছায়া খুঁজে পাবেন আমাদের চরিত্রগুলোর মাঝে। যখন কোনো ভালো কাজ করা হয় এবং সেখানে প্রিয় শিল্পী উপস্থিত থাকে, তখন ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। কারণ সবকিছুর পর একটাই প্রত্যাশা থাকে- দর্শকের ভালোবাসা কুড়ানো। এবার দুই বন্ধু জুটি হিসেবে আবারও দর্শকের কাছাকাছি যেতে পারব- এই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই নতুন করে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করছি।’ দর্শকও ফেরদৌস-পূর্ণিমা জুটিকে নিরাশ করবেন না- আমাদেরও সেটাই প্রত্যাশা।