ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য

বিশেষ প্রতিবেদক: আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের হাত ধরেই সব ধরনের আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে । যার ঘোষনা আগামী ২২শে সেপ্টেম্বরের জনসভা থেকে আসতে পারে । জনসভায় সম্ভাব্য সকল শরিক দলের নেতৃত্ব উপস্হিত থাকবেন ও বক্তব্য রাখবেন বলে বিশ্বস্হ সূত্রে জানা গেছে ।

এ ব্যাপারে বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আশা করি দ্রুতই বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।’

সূত্র জানায়, দুই বছরের প্রচেষ্টায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বৃহত্তর ঐক্য সফল হওয়ার পথে। দুই বছর আগে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে জেলে আছেন তিনি। গত কয়েক মাসের আলোচনার ফল হিসেবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোট গঠিত হতে যাচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে।

সূত্র আরও জানায়, ড. কামালের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডন থেকে ফেরার পর একান্ত বৈঠক মিলিত হন।বৈঠকে ড. কামালকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর জোটের নেতৃত্বে আনার বিষয়ে বিএনপির সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে এক মত হন । যা চলমান রাজনীতিতে নতুন বার্তা সংযোজন করেছে ।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর থেকে ড. কামালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বিএনপির। গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুলসহ কয়েকজন নেতা ড. কামালের সঙ্গে দেখা করেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর ড. কামাল বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার মামলার রায় পড়ে এ বিষয়ে উপদেশ দেবো।’ এরপর সুপ্রিমকোর্টে খালেদা জিয়ার জামিন হলে ১২ মার্চ গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘হাইকোর্ট থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর হয়েছে । এই ধরনের কেসে নিয়মিত জামিন হওয়া দরকার। যদিও এই কেসের অর্ডার পেতে দু’একদিন বিলম্ব হয়েছে। আইনের শাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করে বিচার বিভাগ। স্বাধীন বিচার বিভাগের গুরুত্ব সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। তাহলে দেশ ও জনগণ উপকৃত হবে।’ ৩ এপ্রিল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে দেখতে যান ড. কামাল।

এ মাসের ১১ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক সমাবেশে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এখানে কোনও দল বা নেতানেত্রীর পক্ষে বলছি না। একটা অসুস্থ মানুষের কথা বলছি। আমি মনে করি আমাদের একটা ঐতিহ্য আছে পাকিস্তান আমল থেকেই বিচারাধীন ব্যাক্তি অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হতো । যারা বিচারাধীন তাদের জন্য সব হাসপাতালেই ব্যবস্থা রয়েছে। আমি বলবো না নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।’

বিগত কোরবানির ঈদের দুয়েকদিন আগে ড. কামালের কাছে ১০ দফা প্রস্তাব দেয় বিএনপি। এই প্রস্তাবের সূত্র ধরেই পরবর্তী আলোচনা সামনে এগিয়ে নেয় বি্এনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

রাজনৈতিক সূত্র বলছে,   লন্ডনে তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যকার বৈঠকে চারটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিষয়গুলো হলো প্রথমত, দল নির্বাচনে যাবে কার নেতৃত্বে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনি আন্দোলন ও সংগ্রামে নেতৃত্বে দেবেন কে। তৃতীয়ত, সরকার গঠন হলে তার নেতৃত্বে কে থাকবেন এবং চতুর্থত, দলের মূল নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে।

সূত্র বলছে, দলের পরিচালনার মূল নেতৃত্ব থাকবে জিয়া পরিবারের হাতে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই দল চলবে। দল নির্বাচনে যাবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বা মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে। নির্বাচনি অন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্বে থাকবেন ড. কামাল হোসেন। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের নেতৃত্বের হাত ধরেই নির্বাচনের পথে যাবে বিএনপি। সবশেষ সরকার গঠন হলে সরকারের প্রধানও হবেন ড. কামাল হোসেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য জানান, গত সোমবার ১৭ সেপ্টেম্বর ও মঙ্গলবার ১৮ সেপ্টেম্বর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কতগুলো দাবি ও লক্ষ্য স্থির করেছে বিএনপি। এই দফা ও লক্ষ্যের মধ্য দিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করবে দলটি।

এদিকে জানা যায়, ড. কামালকে নেতৃত্বে রেখে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি চৌধুরী)-কে পাশ কাটানো হলে বিকল্পধারা বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য থেকে সরে পড়তে পারে । তবে বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক জামায়াত বিশ-দলীয় জোটে থাকলে কোনও অবস্থাতেই এ ঐক্যে যাবে না । এ ব্যাপারে মাহী বি চৌধুরী বলেছেন, ‘জামায়াতকে সঙ্গে রাখলে যতো বড় ঐক্যই হোক না কেনো, বিকল্পধারা সেখানে যাবে না। তবে আমি মনে করি, ড. কামাল হোসেন যে দফা ও লক্ষ্যে একমত হয়ে সই দিয়েছেন তা থেকে সরে যাবেন না। বিশেষ করে গত ১৪ বছর ধরে আমি তাকে চিনি।’

এ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের একজন দায়িত্বশীল নেতা বুধবার বলেন, ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য বিএনপিকে বাদ দিয়ে হবে না। আর যে কারণ দেখিয়ে এই ঐক্যে অনাগ্রহী বিকল্পধারা, তাতে করে তারাই রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলছে, নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে একটি প্রপোজাল (প্রস্তাব) দেবে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে এই মাসেই দলের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হতে পারে।

তবে এই প্রস্তাব বিরোধীদলের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেওয়া হবে কিনা, এ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন যৌথ নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন। বিএনপি হয়তো তাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে সামনে রাখার চিন্তা করছেন, কিন্তু স্যার সবাইকে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান।’

গণফোরামের সাধারন সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু বলেন সুর্নিদিষ্ট দাবীর ভিত্তিতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যুগপদ ধারায় বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে চাই । মহাজোটের বাইরে থাকা অন্যান্য দল ও জোটের সাথেও আমরা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি ।