ছাত্র সংগঠন, ছাত্র সংসদ ও ছাত্র আন্দোলন

অজয় দাশগুপ্ত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর নির্বাচন ২৮ বছর ধরে বন্ধ। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। বাংলাদেশে এখন প্রায় অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলোর অর্থের জোগান প্রধানত আসে সরকারি কোষাগার থেকে। বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার পর শ’খানেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। কয়েকশ’ কলেজে এখন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদানের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হয়। আরও আছে প্রকৌশল, কৃষি ও চিকিৎসা শিক্ষার জন্য অনেক উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

কোথাও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো ঘোষণা দিয়েই রেখেছে- ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’। অনেকটা ‘ধূমপান ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস’ ঘোষণার মতো। চুপিসারে ধূমপান ও মাদক সেবন করতে হলে যেমন কেউ দেখার নেই, তেমনি ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষিত ক্যাম্পাসে ধর্মান্ধতা ও চরম পন্থার পাশাপাশি অপসংস্কৃতির অবাধ চর্চাতেও কর্তৃপক্ষের বাধা এসেছে বলে জানা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যখন ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত নিত্যদিনের ঘটনা ছিল, তখন ‘রাজনীতিমুক্ত’ ক্যাম্পাসের স্লোগান আকর্ষণীয় হয়। এইচএম এরশাদের শাসনামলে ছাত্র আন্দোলন প্রবল ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি বিনা রক্তপাতে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে ক্ষমতা দখল করেন।

কিন্তু প্রথম থেকেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হন তিনি। তার শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন, যা মজিদ খানের শিক্ষানীতি নামে অভিহিত হয়। এই শিক্ষানীতিকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ‘শিক্ষা সংকোচন ও বাণিজ্যিকীকরণ’-এর প্রয়াস হিসেবে দেখতে থাকে। অর্থাৎ শিক্ষা একটি পণ্য; যে পরিবারের প্রচুর অর্থ আছে শুধু তারাই এ পণ্য কিনতে পারবে। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান শিক্ষা সচিব শরিফ সাহেবের নেতৃত্বে যে শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন, তার রিপোর্ট (শরিফ কমিশন রিপোর্ট নামে পরিচিত) প্রকাশিত হলে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ একযোগে আন্দোলনে নামে।

তারা ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও হরতাল আহ্বান করে। শরিফ কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে দিনের পর দিন ছাত্র ধর্মঘট চলে। আমি নিজে সে সময় বরিশালের গৌরনদী থানায় গৈলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম। সেখানেও এ আন্দোলনের ঢেউ লাগে। থানার প্রায় সব স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট করে। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে শিক্ষানীতি বাতিল করেন। তবে চক্রান্ত থামে না।

তিনি বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন একটি কমিশন গঠন করেন, যার রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ১৯৬৪ সালে ফের রাজপথে নামে। ষাটের দশকে সর্বশেষ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হয় ১৯৬৯ সালে, যখন শিক্ষার দাবি গুরুত্ব পেলেও মূল দাবি হয়ে ওঠে কুখ্যাত আগরতলা মামলা বাতিল এবং আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। তিনি ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করলে আইয়ুব খান তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে অভিহিত করতে থাকেন।

ষাটের দশকের প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের জোট সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে আমরা দেখি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা। মতিয়া চৌধুরী ১৯৬২ সালের আন্দোলনে ঢাকার ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালের আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন, তখন তিনি ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক। সে সময়ে ডাকসুর সহসভাপতি রাশেদ খান মেনন। ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময় ডাকসুর সহসভাপতি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় বাংলাদেশের যে পতাকা উত্তোলন করেন, বাংলাদেশ সরকার সেই পতাকাকেই জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এ এক অনন্য সম্মান।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ষাট ও আশির দশকের আন্দোলনে মূল ভূমিকা ছিল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের। আরও লক্ষ্য করা গেছে, ছাত্র সংগঠনগুলো যখনই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, আন্দোলন গতি পেয়েছে। একক কোনো সংগঠন চেষ্টা করেও আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৯ সালে আমরা এটা দেখেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ডাকসু, রাকসু, চাকসু, বুয়েট, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়।

কিন্তু এ সংগঠন এককভাবে কোনো বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ‘ভিয়েতনাম সংহতি দিবস’-এর মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদের নামে সংগঠনের দু’জন কর্মী নিহত এবং বুয়েটের ভিপি আবুল কাসেমসহ কয়েকজন বুলেটবিদ্ধ হলেও তারা এ ইস্যু নিয়ে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এ সময়ে ডাকসুর ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। মেধাবী এই ছাত্রনেতা ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমার সংগঠনে যদি একটা সেলিম থাকত!’ কিন্তু তার কিংবা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ডাকে দলে দলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে নেমে আসেনি।

আশির দশকে এইচএম এরশাদের জমানার চিত্রও অভিন্ন। ডাকসু এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যে সংগঠনই জয়ী হোক না কেন, নির্বাচিত ছাত্র সংসদে মাহমুদুর রহমান মান্না কিংবা আকতারুজ্জামান, খোন্দকার মোহাম্মদ ফারুক (সেরা মেধাবীদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত বুয়েটে পরপর তিনবার নির্বাচিত ভিপি) বা সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের মতো যত জনপ্রিয় মুখই থাকুক না কেন; তাদের কারণে নয়- আন্দোলন তখনই দানা বেঁধেছে যখন সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে (১৯৯০) বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এককভাবে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু তাদের কারণে নয়, বরং এ সময়ে এইচএম এরশাদের শাসনের অবসানের লক্ষ্য নিয়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে নিয়ামক ছিল দুটি বিষয়- রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮ দল, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দল এবং রাশেদ খান মেনন-হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন ৫ দলীয় জোটের যুগপৎ আন্দোলন এবং ২২টি ছাত্র সংগঠনের জোটের ১০ দফার আন্দোলন। ওই সময়ে পেশাজীবীদের জোট প্রকৃচি এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জোট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটও ছিল সক্রিয়। এইচএম এরশাদের শাসন অবসানের পেছনে তাই বলা যায়, এক ধরনের জাতীয় সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের এ ইতিহাস অজানা নয়। ছাত্র আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে যারা রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের কাছেও এটা স্পষ্ট। ছাত্র সংসদ ও ছাত্র সংগঠন দুটি ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠনের ওপর রাজনৈতিক দলের প্রভাব বরাবরই ছিল। এক সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির ছিল ছাত্র ফেডারেশন। ১৯৫২ সালে তারা ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম লীগের ছিল মুসলিম ছাত্রলীগ। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালেই নতুন ছাত্রলীগ গড়ে তোলেন, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা।

এখন তো সব রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক, মহিলা প্রভৃতি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দলে এ ধরনের সংগঠন আরও বেশি। কিন্তু লক্ষণীয়, ছাত্র সংসদ নির্বাচন যেমন নেই, তেমনি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সিবিএ বা কালেকটিভ বার্গেনিং এজেন্টের নির্বাচনও নেই। আমাদের ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী। সরকারি-বেসরকারি খাতে রয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যাংক। সেখানে কোনো নির্বাচন নেই। তৈরি পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে। কারখানার সংখ্যা ৪-৫ হাজার। কোনো কোনো কারখানায় ৮-১০ হাজার শ্রমিক কাজ করে। কিন্তু পাকিস্তান বা এমনকি বাংলাদেশ আমলেও যেসব বামপন্থি রাজনৈতিক দল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখত, তারা বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে শ্রমিক সংখ্যা কম বলে মনস্তাপে ভুগেছে। অথচ এখন শ্রমিক আছে; নেই তাদের ট্রেড ইউনিয়ন, নেই প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলন।

তাই বলে কি শ্রমিক আন্দোলনের প্রয়োজন নেই? ছাত্র আন্দোলনের প্রয়োজন নেই? ট্রেড ইউনিয়নের সিবিএ নির্বাচনের প্রয়োজন নেই? ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন নেই? অবশ্যই তা আছে এবং কীভাবে এ ধরনের নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতে পারে, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার সময় এসেছে।

রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কয়েক বছর পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ক্যাম্পাসে এসেছেন; ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন। তিনি এবং উপস্থিত একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতা বৈঠকে ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের ‘সহাবস্থান’-এর পরিবেশ সৃষ্টির দাবি করেছেন। তবে ছাত্রদল থেকে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা নিশ্চয় পূর্বসূরিদের কাছ থেকে জেনেছেন- ক্যাম্পাসকে ‘প্রতিপক্ষমুক্ত’ করার ধারা সূচনা করেছে তাদেরই সংগঠন। এ কাজে পুলিশ-গোয়েন্দাদেরও সহায়তা ছিল। পরে ছাত্রলীগও এ দাওয়াই কাজে লাগিয়েছে, যার জের এখনও চলছে।

উপাচার্য বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন সাত মাস পর, মার্চ মাসে। অর্থাৎ অন্তত ৬ মাস সময় মিলবে। আমি সব ছাত্র সংগঠনের নেতাদের কীভাবে ডাকসু এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ) ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব, তার একটি ফর্মুলা ভেবে দেখার অনুরোধ করব।

প্রথম কথাই হচ্ছে, ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র সংসদের কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ পৃথক করতে হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অংশ করতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা, প্রথম ক্লাস, মিডটার্ম পরীক্ষা, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা- এ জন্য যেমন নির্ধারিত তারিখ থাকে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারিখ নির্দিষ্ট করতে হবে।

দ্বিতীয়ত এবং বিশেষভাবে বিচেনায় নিতে হবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি যে বিপুল সংখ্যক ‘সাধারণ ছাত্রছাত্রী’ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে, তাদের প্রতিনিধিত্বের কথা। এই সাধারণ শিক্ষার্থীরাও যে সক্রিয় হলে কত বড় শক্তি, সেটা কিন্তু আমরা ‘কোটা সংস্কার’ ও ‘নিরাপদ সড়ক’-এর দাবিতে আন্দোলনের সময় দেখেছি। নেতৃত্ব দিতে ‘বয়স্ক’ হওয়ার দরকার পড়ে না। অতীতে যেভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে ‘ছাত্র সংগঠনের প্যানেল’ প্রাধান্য পেত

। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ২২ বছর বয়সেই ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। গঠনতন্ত্রে যে কারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার স্বীকৃত। কোথাও কোথাও সংগঠনের বাইরে ব্যক্তি জনপ্রিয়তায় কেউ কেউ নির্বাচিতও হয়েছেন। কিন্তু ভোট প্রদানে প্রাধান্য পেয়েছে ‘প্যানেল’। এখনও তা থাকতে পারে। একক সংগঠনের পাশাপাশি জোটের প্যানেলও থাকতে পারে। তবে ছাত্র সংসদ গঠনে প্রদান জোর দিতে হবে সংগঠন যারা করে এবং যারা আদৌ করে না, তাদের সবার প্রতিনিধিত্বের ওপর।

ডাকসু নির্বাচনের ফরম্যাট নিয়ে আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে :

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যতটি বিভাগ রয়েছে তার অধীনস্ত প্রতিটি শ্রেণিতে একজন শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। যে শ্রেণিতে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রী রয়েছে সেখানে ছাত্রীদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত একজন নির্বাচিত হবে। শ্রেণি প্রতিনিধি পদটি ছাত্র ও ছাত্রী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। নূ্যনতম এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রী থাকার কারণে যদি ছাত্রী প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে, সে ক্ষেত্রে সব ছাত্র ও ছাত্রীর ভোটাধিকার থাকবে। অর্থাৎ ছাত্রী প্রতিনিধি নির্বাচনে শ্রেণির সব ছাত্রছাত্রী ভোট দেবে।

২. সকল বিভাগ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সাধারণ পরিষদ গঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষা-বহির্ভূত যে কোনো বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান, রোহিঙ্গা সমস্যা, চাকরির বয়সসীমা ও কোটা, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের সমস্যা, নিরাপদ সড়ক, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন- কত কিছুই তো আসতে পারে এজেন্ডায়।

৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর কর্মকর্তা ও সদস্য পদে নির্বাচনের জন্য শুধু এ পরিষদের সদস্যরাই প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন। অর্থাৎ ডাকসুর ভিপি-জিএস বা অন্য পদে প্রার্থী হতে হলে প্রথমে তাকে শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে। নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকেই শুধু ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার ইস্যুটির এভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

৪. শ্রেণি প্রতিনিধি এবং ডাকসুর কর্মকর্তা ও সদস্য পদে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা ছাত্র সংগঠনের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে। কোনো ছাত্র সংগঠন কিংবা একাধিক সংগঠনের জোট শ্রেণি প্রতিনিধির প্রতিটি পদেই মনোনয়ন দিতে পারবে। ডাকসুর পদগুলোর নির্বাচনেও একই ধরনের সুযোগ থাকবে।

৫. ডাকসুর কর্মকর্তা ও সদস্য পদের নির্বাচনে ভোট প্রদান করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী।

৬. শ্রেণি প্রতিনিধি ও ডাকসুর জন্য ভোট গ্রহণ দু’ভাবে হতে পারে- এক. শ্রেণিগুলোতে ভোট গ্রহণের জন্য ব্যালট পেপার প্রদান এবং সেখানেই ভোট গ্রহণ; দুই. অনলাইনে ভোট গ্রহণ। দুই ধরনের নির্বাচনের ক্ষেত্রেই অনলাইন ভোটিং চালু করা যেতে পারে।

৭. হল সংসদগুলোতে নির্বাচনের জন্য আবাসিক ও অনাবাসিক প্রতিটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ৫-৬টি পদ রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ বর্তমানে যে পাঁচটি শিক্ষাবর্ষ রয়েছে, প্রতিটিতে ৩ জন হিসাবে ১৫-১৮ জন প্রতিনিধি নিয়ে হল সংসদ গঠিত হবে। এদের মধ্য থেকে পরে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে নির্বাচন হবে। সংশ্নিষ্ট হলের সব শিক্ষার্থী এ নির্বাচনে ভোট প্রদান করবে।

৮. অন্যান্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা যাতে তাদের প্রতিনিধি প্রতি বছর নির্বাচন করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা চাই। প্রতিনিধি নির্বাচন শুধু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নয়, তাদের নেতৃত্বের গুণাবলির প্রকাশ ও বিকাশ সাধনের অপরিহার্য শর্ত। শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিতভাবে অভিমত প্রকাশের জন্য এটাই সর্বোত্তম পন্থা বলে আমি মনে করি।

প্রস্তাবিত নির্বাচন পদ্ধতিতে সব ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য প্রতিটি শ্রেণিকে টার্গেট করে কাজ করতে হবে। সব শ্রেণির প্রতিনিধি পদ এবং ডাকসুতে সংগঠনগতভাবে নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে। জোট গঠনেও কোনো সমস্যা নেই। যারা ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক শিক্ষার্থীদের শামিল করাতে চান, তাদের জন্য এ ধরনের নির্বাচন পদ্ধতিই সর্বোত্তম। কারণ শ্রেণি প্রতিনিধি পদে ভোট পেতে তাদের কাজ করতে হবে প্রতিটি শ্রেণিতে সব ছাত্রছাত্রীর মধ্যে।

প্রস্তাবিত নির্বাচন পদ্ধতিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছাড়াও কৃতী ছাত্রছাত্রী, খেলোয়াড়, শিল্পী-লেখক, বিতার্কিক এবং অন্য কোনো না কোনোভাবে বিশেষ অবদান রাখা শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হবে। জনপ্রিয় শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের সদস্য করার কাজকে গুরুত্ব দেবে।

প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে এমন ছাত্র সংগঠন সব শ্রেণি প্রতিনিধি পদে প্রার্থী দিতে পারবে। ডাকসু এবং বিভাগীয় সংসদগুলোতেও তারা সংগঠনগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। অপেক্ষাকৃত কম ছাত্রছাত্রীর সমর্থন রয়েছে, এমন ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্যও এ পদ্ধতি সুফল এনে দিতে পারে। তারা হয়তো ডাকসু নির্বাচনে এককভাবে জয়ী হতে পারবে না। কিন্তু তারা কিছু শ্রেণিকে টার্গেট করে কাজ করতে পারে কিংবা জোট গঠন করতে পারে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, সেরা ছাত্র বা ছাত্রী কিংবা খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ছাত্রছাত্রীদের ডাকসু বা হল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করায় ছাত্র সংগঠনগুলো আগ্রহ দেখিয়েছে। এ ধরনের প্রার্থীর প্রতি শিক্ষার্থীদেরও বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ থাকে। প্রস্তাবিত নির্বাচন পদ্ধতির কারণে ছাত্র সংগঠনগুলো এদের মধ্য থেকে প্রার্থী করায় উৎসাহী হতে পারে। আর এটা করতে পারলে তাদের কাজের ধারাতেও বৈচিত্র্য আসবে এবং সংগঠন প্রকৃত অর্থেই গণমুখী চরিত্র পাবে। ছাত্র সংগঠন শুধু সক্রিয় রাজনীতি সচেতন কিছু ছাত্রছাত্রীর জন্য নয়; তা হয়ে উঠবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য ও চৌকস ছাত্রছাত্রীদের মিলন ক্ষেত্র। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নতুন পদ্ধতি চালুর জন্য ছাত্র সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকরাও এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা দেবেন- এটাই কাম্য।

ajoydg@gmail.com

সাংবাদিক