আমি নতুন মা

পূর্ণতা আঞ্জুম: প্রথম মা হওয়া। তুলতুলে শিশু কোলে নেওয়া। একজন নারীর মাতৃত্ব। অনেক প্রত্যাশার এক প্রতীক্ষা। যারা নতুন মা নন তাদের জন্য এটা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু প্রথম সন্তান যার হয়েছে সেই নারী তার সন্তানের লালন-পালন নিয়ে হয়ে যান অনেকটা দিশেহারা- কীভাবে সন্তানের দেখাশোনা করবেন; কতটা ভালো রাখা যায় তার সন্তানকে। একজন নারী মা হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সেই চ্যালেঞ্জকে সহজ করতে পারেন খুব সহজেই।

প্রসব-পরবর্তী মায়ের সচেতনতা: স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের গাইনি ও অবস বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফারহাত হোসেন জানান, প্রসব-পরবর্তী সময়ে বারবার প্যাড পরিবর্তন করে পরিস্কার থাকা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দুর্গন্ধযুক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি-না সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ জীবাণু-সংক্রমণের লক্ষণ বিষয়ে সচেতন থাকা, বারবার প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা এবং যাদের প্রসব স্থানে সেলাই দেওয়া হয়েছে, তাদের মাঝে মধ্যে কুসুম গরম পানিতে হিপ বাথ নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নজর রাখতে হবে। শিশুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঠিকভাবে স্তন্যপান শুরু করানো এবং স্তনের সঠিক যত্ন নেওয়া, স্তন পরিস্কার রাখা ইত্যাদি শিখে নেওয়া উচিত। পায়ে পানি থাকলে অধিকাংশ সময় পা উঁচু করে ঘুমালেই তা চলে যায়। স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে দেড় মাস এবং সিজারের ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস ভারী কিছু ওঠানো বা ভারী কাজ নিষেধ। 

প্রসবের পর সঠিক জন্মবিরতি সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হবে মায়েদের। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল, তাদের সঠিক সময়ে আবারও চেকআপ করিয়ে নিতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিচ্ছন্ন জ্ঞান এ সময়টিতে সুস্থ থাকার জন্য খুবই জরুরি।

নতুন মায়ের খাবার-দাবার: শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় একজন মায়ের গর্ভকালীন সময়ের চেয়েও বেশি ক্যালরির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই বাড়তি ক্যালরি আসবে মূলত প্রোটিন বা আমিষ থেকে; শর্করা বা ফ্যাট থেকে নয়। এমনটাই জানালেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন্নাহার আলো। তিনি আরও বলেন, প্রতিবার স্তন্যপান করানোর আগে-পরে প্রচুর পরিমাণে পানি ও জলীয় পদার্থ খাওয়া উচিত। সারাদিনের এই তরলে পানি ছাড়াও দুধ, স্যুপ, ফলের রস, ঝোলের তরকারি ইত্যাদি থাকতে পারে। কোষ্ঠ পরিস্কার রাখা ও ভিটামিনের অভাব পূরণের জন্য প্রচুর শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে। ক্যালসিয়াম বেশি আছে ছোট ও গুঁড়া মাছ, শুঁটকি, ডাল ও দুধে। আয়রন আছে কাঁচকলা, কচু, কচুর শাক, বিট, পুদিনাপাতা, ধনেপাতা ইত্যাদিতে। টক ফলে আছে ভিটামিন ‘সি’, যা আয়রন রক্তে মিশতে সাহায্য করে। ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত শর্করা খেলে ওজনই বাড়বে শুধু, কিন্তু পুষ্টিমান রক্ষা হবে না। তাই পুষ্টিকর খাবার খান; অতিরিক্ত খাবার নয়।

ভাবনা থাকুক ওজন নিয়ে: গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্ম নেওয়ার পর মেয়েদের ত্বকে কিছু পরিবর্তন আসে, এর মধ্যে অন্যতম হলো স্ট্রেচমার্ক এবং মেলাজমা বা প্রেগন্যান্সি মাস্ক পরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের ছন্দ ফিরে এলে এগুলো অনেকটাই কমে আসে। তবে কিছু ঘরোয়া উপায় সাহায্য করতে পারে।

সন্তান জন্ম নেওয়ার পাঁচ-ছয় মাস পর থেকে চুল পড়তে শুরু করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই মাসে দু’বার নিয়মিত মাথার ত্বক ম্যাসাজ করাতে পারেন। এতে চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন নিয়মিত থাকবে। বেশি চুল পড়তে শুরু করলে চুল কেটে ছোট করে নিলেই বেশি ভালো হয়।

বাচ্চার বয়স দেড় থেকে দুই মাস হলে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শুরু করুন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর খুব শক্ত ব্যায়াম ও খাবার নিয়ন্ত্রণ করে অতি দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা না করাই ভালো। কেননা, তাতে চর্বি ভেঙে শরীরে ও বুকের দুধের সঙ্গে এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হতে থাকে। তাই শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, ধীরে ধীরে ওজন কমানো।

পরিবার পাশেই থাকুক: প্রসবের পর পোস্ট পারটাম ব্লু বা বিষাদে আক্রান্ত হন এমন মেয়ের সংখ্যা খুব কম নয়। হরমোনের আকস্মিক ওঠানামা, শারীরিক পরিবর্তন, নতুন জীবনযাপন প্রণালির সঙ্গে অনভ্যস্ততা, ঘুমের ব্যাঘাত ইত্যাদি এর সঙ্গে জড়িত। এতে মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, মন খারাপ করে থাকেন, অবসাদ ও বিষাদগ্রস্ত থাকেন, যখন তখন কান্না পায়, কখনও খিটখিটে হয়ে পড়েন। হরমোনের ছন্দ ঠিক হয়ে গেলে আপনা আপনি এগুলো ঠিক হয়ে যায়।

এই সময়টাতে পরিবারের প্রতিটি মানুষের নতুন মায়ের পাশে থাকা জরুরি। বিশেষ করে স্বামীর। নতুন মায়ের খাবার-ঘুম এবং শিশুর যত্নআত্তিসহ সবকিছুতে স্বামীর তার স্ত্রীর পাশে থাকা একান্ত জরুরি। কেননা, একজন স্বামীই নারীর প্রকৃত বন্ধু। নারীর নতুন মা হওয়ার এই সময়টাতে স্বামীর প্রতিটা মুহূর্তে তার পাশে থাকা জরুরি। খাবার-দাবার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে মানসিক সঙ্গ, তাকে খুশি রাখা স্ব্বামীর কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সে সঙ্গে পরিবারের সবারই এ বিষয়টিতে নজর দেওয়া জরুরি। যদি তা না হয় এবং আরও কিছু খারাপ লক্ষণ দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

আনন্দময় জীবন: সময়ের ক্যালেন্ডার ঘুরে এমন পরিবর্তন আসেই মায়ের জীবনে। শুধু মা হওয়ার কারণে একজন তরুণী তার জীবনের সবটা বিসর্জন দিয়ে একেবারে ঘরোয়া হয়ে যান। সেই আক্ষেপ তার সারাজীবনই থাকে। আপনি মা হয়েছেন। এটা আপনার একটা পরিচয়। অনেক পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক পরিচয় এটা। তাই বলে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দেওয়াটা ঠিক নয়। মাতৃত্ব এক অপার আনন্দ। সেই আনন্দের সঙ্গেই ঘুরেফিরে থাকুক প্রতিটা ক্ষণ। কিন্তু সমাজের আর দশটা ঘটনার মতো মা হওয়ার এই সময়টাকে ইতিবাচকভাবেই নেওয়া উচিত। উপভোগ করা উচিত মাতৃত্বের পুরোটা সময়।