অন্যতমার অন্য গল্প

নাসরীন জাহান: যেন একটি সূর্যসাগর সন্নিকটে, এমন বোধে চমকে চমকে যায়। 

যতবার দেখেছে তাকে, দূরবর্তী ভাবেও তার প্রচ্ছায়ার মুখোমুখি হয়েছে, শান্তনুর এমন বোধই হয়েছে। 

সে নিজে দেখতে এক্কেবারে সাদামাটা। কিন্তু আত্মায় সৃষ্টিকর্তা গেঁথে দিয়েছেন 

গুচ্ছ গুচ্ছ সমৃদ্ধ অনুভব। সে মেয়েটিকে নিয়ে কত যে কবিতা লিখেছে।

সবই আত্মার পিপাসা আর্দ্রিত হাহাকারে পূর্ণ। 

সত্যিই কি আপনি কবি শান্তনু? 

যেন ঝিঁঝিঁ ধরা কিছুক্ষণ অসাড়… এমনই কাটে। 

ছিঃ ছিঃ এমন একটি মেয়ের সামনে সে হাঁ করা বোদাই হয়ে থাকবে? নিজেকে 

অদৃশ্য থাপ্পড় দিয়ে খাড়া করায়- হ্যাঁ, আমিই, আপনি আমার নাম জানেন? 

জানি মানে, অসম্ভব পছন্দ করি আপনার লেখা। 

সেই থেকে যে একটি স্বপ্নের পথচলা শুরু হতে পারে একি বিভ্রমেও ভেবেছিল শান্তনু? 

মুশকিল ছিল একটাই, তাদের সম্পর্ক নিয়ে অমিলের তাজ্জবটা এত প্রকাশ্য নগ্নতায় নিয়ে আসত, ঈর্ষাতুর বা লজ্জায় ধুলোয় মিশে একশা হতো শান্তনু। 

অসীম হুতাশনে তার মনে হতো, কেন আমি দেখতে সুন্দর হলাম না? এর চাইতে বেশি প্রগাঢ়তায় পড়ত এই ভাবনায়, আসলেই কি মেয়েটি তাকে আত্মার 

গভীরতা থেকে ভালোবাসে? শুধু কবিতার প্রেমই কি কবির নাগাল পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে? 

শান্তনুর গায়ে গায়ে ঝরে আত্মার বিলাপ। 

একদিন হূৎপিণ্ডটাকে খাঁচা ছাড়া করে মেয়েটি তার হাত স্পর্শ করে, চলুন কোনো নির্জনে ঘুরে আসি, আপনি কবিতা শোনাবেন আর আমি…। 

তোতলা গিলে শান্তনু বলে, এখানেই কোথাও? 

না বড্ড ভিড় এদিকে। আর ঈর্ষাতুরদের মন্তব্য শুনেও আপনার কিছু যায় আসে না। আমার যায় আসে। 

মেয়েটি বলছে ঈর্ষাতুর। তার মানে এই একটি অসম সম্পর্ক, যেখানে মেয়েটি অত্যধিক সুন্দর, সে তুলনায় শান্তনু যাচ্ছেতাই, এ সম্পর্ক যে অসম, এজন্যই ঈর্ষা করছে সবাই এ ব্যাপারে মেয়েটির হুঁশ টনটনে? কীভাবে দেখবে সে একে? কলজেটা বুক থেকে সরে যায়। 

না, না নিজের এই নিস্তেজ অবস্থাকে পাত্তা দেওয়া যাবে না। পৃথিবীতে অনেক ঘটেছে এমন, শুধু শিল্পের প্রেমে পড়ে কত সুন্দরী শিল্পস্রষ্টার কুৎসিত অবয়বকেও নাগালে আসতে দেয়নি। সে তো আর কুৎসিত নয়। 

এ ছাড়া সে তো মেয়েটির কাছে আর দশটা ছেলের মতো ছোক ছোক করে এগোয় নি। এই যে মেয়েটি তাকে প্রগাঢ় অন্তরঙ্গতায় স্পর্শ পর্যন্ত করল, সে কি এমনি এমনি? 

কত যে নাম হয়েছে বাজারে মেয়েটির, অনন্যা, অপ্সরা, অন্যতমা। 

ছেলেটি অন্যতমাই বেছে নেয়। 

মেয়েটির রূপ- তার কী কী সুন্দর এসব আলাদা লিখতে বসলে সহস্রাব্দী পার হয়ে যাবে। 

কী স্নিগ্ধ বাতাস, শান্তনু উচ্চারণ করে, কী পবিত্র চারপাশ, যেন অতি নিভৃতে গুনগুনিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। কী সুন্দর বলেন আপনি! তির্যক চোখে তাকায় মেয়েটি, ওর এই ভঙ্গিতেই যে-কোনো ছেলে লম্বা হোঁচট খাবে। 

শান্তনু যে স্থির আছে, সে কি কম? 

এত সুন্দর নিয়ে বাঁচেন কী করে? 

মেয়েটি বলছে একথা? শান্তনুকে? 

সামনের হ্রদের জল যেন নিজ বর্ণ হারিয়ে অত্যাশ্চর্য কিছু একটা হয়ে উঠল। 

কিছুক্ষণ মাতাল, ঝিম ধরা মানুষের মতো কাটে, বলে, আপনিও আমাকে টিটকিরি দিচ্ছেন? 

মেয়েটার হাঁ করা মুখে হাত। তার মানে আপনাকে কেউ টিটকিরি দেয়? নইলে এভাবে আমাকে বলতেন না। সবাই হিংসে করে বুঝলেন? এত ভালো কবিতা লেখেন, এত ভালো আবৃত্তি আপনার, চেহারায় আলগা দেখানোর বাহুল্য নেই। কত সুন্দর কথা বলেন আপনি! 

এবার নিশ্চিত মারা যাবে সে। 

ভেতরের চরাচরে আনন্দের বদলে মুহুর্মুহু আর্তনাদ ওঠে, এই সুন্দরকে আমি ধরে রাখতে পারব তো? 

কম্পমান রাত্রি, নিবিড় জোসনা অনন্ত নির্ঘুমে ঢেকে যায় শান্তনুর। নিজেকে সারাক্ষণ জ্বর জ্বর বোধ হয় তার। 

ওই নির্জন নিঃসীমে গিয়ে মেয়েটি ভ্রুপল্লব নাড়িয়ে প্রগাঢ় অনুভূতিতে জানিয়েছিল, আমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে? দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল শান্তনুর, এটা যদি প্রস্তাব না হয় তো- 

সে এরপরও এগিয়ে যায় নি শুনলে বন্ধুরা তাকে বলদ বলবে। কিন্তু কিচ্ছুই সেদিন না করেই যে শান্তনু বুনো বাতাসের পিঠে চেপেছে এটা কী করে বুঝবে কেউ? 

মেয়েটি অনেক ভেঙে পড়ে বলেছিল, সবাই আমার রূপ দেখে আমার প্রেমে পড়ে, আমার ভেতরটা কেউ দেখে না, আপনাকেই একমাত্র দেখি আমার রূপের ওপর হামলে পড়েন না, মানে আমাকে দেখে আমার রূপ বন্দনা নিয়ে ঘণ্টা কেন একটি মিনিটও কাটান না, কবির চোখ তো, আপনার কবিতায় আমার বহিরঙ্গের ব্যাপারটা আসে না, তা নয়। এখানে বহিরঙ্গের রূপ এসব তো আসবেই। তো যা বলছিলাম, এর সঙ্গে ভেতরের নিভৃতে কষ্ট পাওয়া মেয়েটিরও প্রতিচ্ছবি কী নিপুণতার সঙ্গেই না আঁকেন। 

ঘেমে পুরো ভিজে ওঠে প্রায় শান্তনু। সে তো সারাক্ষণ মেয়েটির রূপের মধ্যেই বুঁদ হয়ে থাকে। তবে কবিতা একটি ভিন্ন বিষয়। সেখানে কবিতাটাকে ভিন্নরূপ দিতে সে মেয়েটির যে অবয়ব এঁকেছে, তা মিলে গেছে মেয়েটির জীবনের সঙ্গে? 

হায় ঈশ্বর! 

এইভাবে দিনগুলো রাত্রিগুলো যখন যাচ্ছিল, যখন অমাবস্যার জল জোছনার পানিতে ভিজে পাখির কুহুর মতো মিষ্টি সুরে গাইছিল আর নিবিড় জোছনায় ভেসে শান্তনুর মনে হচ্ছিল পৃথিবী আমার, তখন মেয়েটি যেন মোবাইল ফোনে নয় মহাপ্রলয়ের সীমাহীন চূড়োয় লাল স্কার্ফ উড়িয়ে বলেছিল, চলে যাচ্ছি, এদ্দিনে হাসব্যান্ড আমার ভিসা করতে পেরেছে। আমি যোগাযোগ রাখব, আপনি রাখবেন তো? 

পাণ্ডুলিপি খুলে ধরে শান্তনু। একটি গ্রন্থ হওয়ার মতো পূর্ণতা পেয়েছে সেটি। দীর্ঘশ্বাসের প্রলম্বনে ভরা এই পাণ্ডুলিপিতে একটি কবিতা আছে এমন, ছেলেটিকে ফেলে অন্যতমার চলে যাওয়ার পালক যেখানে ফড়ফড় ওড়ে শুধু। শুনে সবাই বলবে, লেখকেরা আগে থেকেই জানে…। ফের চোখে ভাসে অনন্তের লাল স্কার্ফ। 

সমস্ত অবদমন ভেঙে যায়। 

জয়ের কিনারে এসে দাঁড়ায়। হু হু কান্নায় যা সে মেয়েটির চলে যাওয়ার আগেই লিখেছিল দুজনের বিচ্ছেদ কহন, তা পড়ে যে ভাবে, এ তো আমি বিশ্বাস থেকে লিখিনি। কবিতার সৌন্দর্যের জন্যই লিখেছি। মেয়েটির যে তীব্র আকুলতা ছিল তার প্রতি, বাস্তবে যে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, মেয়েটি তাকে ছেড়ে চলে যাবে। 

শান্তনু সমস্ত পাণ্ডুলিপি ভাসিয়ে দেয়।