অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যা অন্তরায়

এমাজউদ্দীন আহমদ: বাংলাদেশের রাজনীতি দিন দিন প্রতিহিংসামূলক হয়ে উঠছে। যে কোনো বিরোধী দল ক্ষমতাসীন মহলের অন্যায়-অন্যায্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার রাখে। সরকারের ব্যর্থতা শত মঞ্চ থেকে প্রচার করতে পারে। গণতন্ত্রে এসব ব্যাপারে বাধা দেওয়ার অবকাশ নেই। রাজনীতি বিশ্বময় স্বীকৃত হয়েছে আইনানুগ, কল্যাণমূলক এক যৌথ কর্ম হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতার মোহ ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। গণতন্ত্রের জন্য এ সবকিছুই অশনিসংকেত। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থা বেহাল- অনেকেরই এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ আছে বলে মনে করি না। রাজনীতিকে ক্ষমতার পূতিগন্ধময় গহ্বর থেকে উদ্ধার করা প্রয়োজন। রাজনীতি একবার তার সনাতন বিশুদ্ধ রূপ ফিরে পেলে আজকে সমাজ জীবন যে ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে অহর্নিশ ছটফট করছে, তা থেকে অব্যাহতি পাবে। শুচিতা ফিরে আসবে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিভিন্ন জেলায় বাধা দিয়েছে পুলিশ। রাজধানী ঢাকায় এমন কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ শুরু করে হঠাৎ ধরপাকড়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এমনটি গ্রহণযোগ্য নয়- তা নিশ্চয় ক্ষমতাসীন মহলের বিজ্ঞ রাজনীতিকদের অজানা নয়। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য; সর্বোপরি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য এমন পরিস্থিতি প্রতিকূলতাকেই ক্রম পুষ্ট করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দাবি জানানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এমন পথ পরিহার করে কীভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য করা যায়, তা নিশ্চিত করাই এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ, অক্টোবরেই হয়তো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়াটা ভুলের দাগটাই আরও মোটা করতে পারে। যেখানে নির্বাচনের জন্য সমতল ভূমি নিশ্চিত নয়, সেখানে এমনটি করতে গেলে আরও ভাবতে হবে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের পুনঃপদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ। আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুনরায় যে তৎপরতা শুরু করেছে, তা প্রশ্নের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব গণতান্ত্রিক দেশেই নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো কোনো নির্বাচন ঐতিহাসিকও বটে এবং ঐতিহাসিক নির্বাচনের দৃষ্টান্ত তো আমাদের সামনেই আছে। বাঙালি জাতির জীবনে যেসব দৃষ্টান্তযোগ্য নির্বাচন হয়েছে; এ থেকে আমাদের শাসকরা কি কোনো শিক্ষাই নিতে আগ্রহী নন? উল্লেখ্য, উপমহাদেশে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্যবহ যে, ওই নির্বাচনগুলোর পেছনে বড় বড় ইস্যু কাজ করেছে। দেশের মানুষ সেই অনুপ্রেরণা ধারণ করেই আন্দোলন করেছে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জয়ী হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ১৯৯১ সালের নির্বাচন। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান বুকে-পিঠে স্পষ্টাক্ষরে লিখে নূর হোসেন গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন দিয়ে আবার প্রমাণ করে গেছেন, এ দেশের মানুষ প্রকৃতই গণতন্ত্রের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল।

এ দেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই গণতন্ত্রের জন্য জীবন বাজি রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। তারা সব সময় চেয়েছে সেই গণতন্ত্র ও রাজনীতি, যা অনুমতির গণতন্ত্র কিংবা রাজনীতি নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোর মূল ভাবনা কী ছিল, এখানে এ ব্যাপারে বিশ্নেষণ করা উদ্দেশ্য নয়। শুধু এটুকুই বলতে চাচ্ছি, দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয়, এ ব্যাপারে যে আহ্বান বারবার জানানো হচ্ছে; বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ এর প্রতিকূল। এই প্রতিকূলতা দূর করার সর্বাগ্রে দায়দায়িত্ব বর্তায় ক্ষমতাসীন মহলের ওপর। সংবিধানের কথা বলে আমাদের দায়িত্বশীলরা দেশকে এমন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারেন না, যাতে পরিবেশ-পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংবিধান তো রাষ্ট্রের জন্যই। রাষ্ট্রের নাগরিক সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই সংবিধান। এসব সত্য সামনে রেখেই প্রয়োজনের নিরিখে সংবিধানের সংশোধনী ইতিমধ্যে বহুবার আনা হয়েছে। সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য এমনটি আবারও যদি করতে হয় কিংবা সমঝোতার মাধ্যমে কণ্টকমুক্ত পথ সন্ধান করা যায়, তাহলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সরকার সেই কাজটি করতে অনাগ্রহী হলে বিদ্যমান বিরোধ নিষ্পত্তির রাস্তা বের হবে কীভাবে? আমাদের একান্ত প্রত্যাশা, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা ও অন্তরায়গুলো সংলাপের মাধ্যমে দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সংলাপের টেবিলে তর্ক হোক এবং এর মধ্য দিয়েই বের হয়ে আসুক সমাধান।

একটা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন, ধরপাকড় উপেক্ষা করেই রাজধানীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবিতে ১০ সেপ্টেম্বর স্বতঃস্ম্ফূর্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। সারাদেশেই এমনটি লক্ষ্য করা গেছে। পত্রপত্রিকার সচিত্র প্রতিবেদন ও টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদেও এই চিত্র ফুটে উঠেছে। নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হলেও দলের প্রতি, দলের নেতৃত্বের প্রতি দলের কর্মী বাহিনীর রাস্তায় উপস্থিতি প্রমাণ করে- মানুষ সরকারের তরফে গৃহীত পদক্ষেপগুলো মেনে নিচ্ছে না। প্রকৃত অর্থে দেশে বিরাজ করছে অন্তহীন সমস্যা। নির্বাচন, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই নানা রকম সমীকরণ হয় এবং এই সমীকরণ গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতি-বহির্ভূত নয়। ঘটে থাকে নানা রকম মেরুকরণও। এই মেরুকরণের সমীকরণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিরই আর একটি রূপ। এই রূপকে ব্যঙ্গ কিংবা উপহাসের ভাষায় ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূত্র হতে পারে না। এ দেশের সচেতন মানুষের রাজনীতিকেন্দ্রিক বহু রকম অভিজ্ঞতাই রয়েছে। সচেতন মানুষ সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই পরিস্থিতি পর্যালোচনাও করে থাকে। একটা কথা অবশ্যই অনস্বীকার্য, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং সামাজিক ও গণমাধ্যমের বিকাশ কিংবা প্রসারের এই যুগে কোনো কিছুই ধামাচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মানুষকে বিভ্রান্ত করাও সহজ নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে যদি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ‘গায়েবি’ মামলার জালে আটকা পড়তে হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নের বিষয় ও এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরুদ্বিগ্ন থাকার অবকাশ থাকে না। নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হয়রানিমূলক মামলা হচ্ছে- এই বার্তা মিলেছে ১৪ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। এর ফলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার অপচ্ছায়া পড়ছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল অনেকেরই দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি-স্বচ্ছতা-নিরপেক্ষতা নির্বাসিত হচ্ছে এবং এ থেকে ভিন্ন রকম ফায়দা লোটার অপচেষ্টা হচ্ছে- এমন সংবাদও পত্রিকার প্রতিবেদন থেকেই জানা গেছে।

পুলিশ একটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা তাদের উচিত নয় যে, তাদের ওপর জনআস্থায় কঠিনভাবে চিড় ধরতে পারে। তাদেরকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে এটুকু নিশ্চিত করতে হবে- তারা কোনো রকম অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী নয়। বিশ্বাসহীনতা কিংবা আস্থাহীনতা আমাদের নানা ক্ষেত্রে খুব সঙ্গত কারণেই রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তা বড় ধরনের অমঙ্গলের কারণ হতে পারে, যদি এসব নেতিবাচকতার নিরসন ঘটানো না যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যটাই প্রথমত হোক মূল লক্ষ্য। তারপর লক্ষ্য বাড়ূক কীভাবে নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত, অবাধ, গ্রহণযোগ্য করা যায় সেদিকে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বহুবিধ অন্তরায় জিইয়ে রেখে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন কীভাবে করা সম্ভব? বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এমন নির্বাচন এ দেশে আর হোক, তা গণতন্ত্রমনা সচেতন কারোরই কাম্য কিংবা প্রত্যাশা হতে পারে না। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতির বিকাশমান ধারার সঙ্গে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির কি কোনো তুলনা চলে?

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের নানা রকম বক্তব্য ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে, যা সংকটের ক্ষেত্র আরও পুষ্ট করেছে। তাদের কারও কারও কিছু কথায় ও কাজে সংশয় জেগেছে। স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনারই যদি বলেন, সর্বাত্মক ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়, তখন তো শুধু হতাশাই নয়; গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সঙ্গতই বহুবিধ প্রশ্ন ওঠে। তারা তাদের হূত জনআস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ ইতিমধ্যে কয়েকবার পেলেও এ ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর অপকর্ম বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় জীবনে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আয়োজন। কিন্তু এই আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত প্রশ্নমুক্ত কতটা কী করতে সক্ষম হয়েছে- এমন প্রশ্নও উঠেছে সঙ্গত কারণেই। ক্ষমতাসীন মহল নির্বাচন সামনে রেখে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে অধিকারের পথ সংকুচিত করার সব রকম চেষ্টাই তো বেগবান। রাজনীতির মাঠ এত অসমতল রেখে সুস্থ ধারার রাজনীতি নিশ্চিত করা কী করে সম্ভব? অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য এ সবকিছুর নিরসন ঘটানো দরকার কালক্ষেপণ না করে।

সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়