কী করবেন এরশাদ

নিউজ ডেস্ক: গত বছর অনেকগুলো দল নিয়ে জোট করে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, বিএনপি ভোটে এলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবেন, অন্যথায় লড়বেন এককভাবে।

ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান বদলের কারণে রাজনীতিতে সমালোচিত এরশাদ শেষ পর্যন্ত কী করবেন তা নিয়ে তার দলের নেতারাও নিশ্চিত নন। গতবার নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিয়েও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন এরশাদ। নানা নাটকীয়তার পর রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপার একাংশ বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩৪ আসন পেয়ে বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরশাদ হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। যুগপৎ সরকার ও বিরোধী দলে থাকা জাপা এবার কী করবে? এ প্রশ্নের জবাবে এরশাদের সহোদর ও দলের  কো-চেয়ারম্যান  জিএম কাদের সমকালকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত বিএনপি ভোটে না এলে জাপার নেতৃত্বাধীন ৬০ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) এককভাবে নির্বাচন করবে। বিএনপি এলে বড় কোনো দলের সঙ্গে জোট হবে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা প্রবল। তবে অন্য ‘বড় দলের’ সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেননি জিএম কাদের।

২০০৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগের জোটে থাকলেও, গত নির্বাচনের আগেও কাজী জাফর আহমেদের মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এরশাদ। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় সেই আলোচনা ভেস্তে যায়। দলটির সূত্র জানায়, দলটিতে এখন আওয়ামী লীগপন্থিদের একচেটিয়া প্রভাব। কাজী জাফরের ঘনিষ্ঠরা বিএনপির জোটে। জাপা চেয়ারম্যানের এক উপদেষ্টার মূল্যায়ন হলো- বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে জাপা সেদিকেই যাবে। দলটির যৌথ সভাতেও সিদ্ধান্ত হয়েছে, ক্ষমতার সঙ্গেই থাকবে জাপা। এই উপদেষ্টা কিছুদিন আগেও এরশাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট হলে জাপার দাবি ৮০ আসন। তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগেই জানিয়েছেন, ১৪ দল ও মহাজোটের সব শরিকের জন্য সর্বোচ্চ ৭০টি আসন ছাড় দিতে পারেন তারা। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জোট হলেও জাপা ৪০টির বেশি আসন পাবে না। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে এরশাদ নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তত ছয়জন মন্ত্রী ও আগামী নির্বাচনে আগের চেয়ে বেশি আসনের দাবি জানান। তবে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি পায়নি জাপা।

জাপাও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে আওয়ামী লীগের জাপাকে লাগবেই- এমনটা দাবি করে এরশাদ বাড়তি আসন চাইছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর তার সভাপতিত্বে জাপার সংসদীয় দল ও প্রেসিডিয়ামের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ভোটের আগেই আগামী সরকারে জাপার শরিকানা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে জিএম কাদের বলেছেন, মন্ত্রিত্বের চেয়ে বেশিসংখ্যক জনপ্রতিনিধি পাওয়া দলের জন্য লাভজনক। যেসব আসনে জাপাকে ছাড় দেবে না আওয়ামী লীগ, সেখানে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি পদ ছেড়ে দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি থাকলে দল চাঙ্গা থাকে।

এরশাদের দলের দাবিনামা দীর্ঘ হলেও গত কয়েক বছরে ভোটের মাঠে দলটির অবস্থান খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো তাই বলছে। জাপা তার দুর্গ রংপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে জয় পেলেও অন্য সিটিগুলোতে জামানত বাঁচাতে পারেনি। ৪৯০ উপজেলার মাত্র দুটিতে জিতেছে। ২৩৫ পৌরসভার একটিতে মেয়র পদে জয়ী হয়েছে লাঙল প্রতীক। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে বিএনপিবিহীন উপনির্বাচনে নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারলেও, সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লাঙল মোট ভোটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ পেয়েছে।

তাই সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ তাদের কতটি আসন ছাড়বে তা নিয়ে চিন্তিত জাপা নেতারা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪৯ আসনে প্রার্থী ছিল জাপার। তার মধ্যে ১৮টিতে আওয়ামী লীগেরও প্রার্থী ছিল। এই ১৮ আসনের ১৩টিতেই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল জাপা প্রার্থীদের। নৌকার প্রার্থী ছিল না এমন ২৯ আসনের ২৭টিতেই জিতেছিল লাঙল। বিএনপিবিহীন গত নির্বাচনে জাপাকে ৭০ আসনে ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত ছাড়ে ৪৮টি। কিন্তু এর ২৭টিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী বা ১৪ দলের নেতারা প্রার্থী ছিলেন।

জাপার এমপি পীর ফজলুর রহমান বলেন, আসন ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েও আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রত্যাহার করেনি; অতীতে এমন নজির রয়েছে। আবার আসন ছেড়ে দিয়েও বিদ্রোহী প্রার্থী রেখে দেয়। তাই আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আগেই স্পষ্ট করতে হবে।

জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের দাবি, তাদের দল কার সঙ্গে জোট করবে সে সিদ্ধান্ত একমাত্র দলের চেয়ারম্যানের। তবে জাপা নেতৃত্বাধীন জোটের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

গত বছরের ৭ এপ্রিল সম্মিলিত জাতীয় জোট করে জাপা। দলটির নেতৃত্বাধীন এই জোটে ৬০টি দল থাকলেও জাপাসহ নিবন্ধিত দলের সংখ্যা মাত্র তিনটি। বাকিগুলোর ভোটের মাঠে অবস্থান নেই। অধিকাংশ দলের কমিটি ও কার্যালয় নেই বলে জানিয়েছেন জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য। তিনি জানান, এ দলগুলোর সঙ্গে জোটে কোনো লাভ নেই, তা তারা জানেন। এরশাদও জানেন। তবু তাদের সঙ্গে রাখার কারণ হলো বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাপা এই জোট নিয়ে পৃথকভাবে অংশ নেবে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা আসন ভাগাভাগির দাবিতে সরব হচ্ছে। কিন্তু জাপাতে এ অবস্থা নেই। দলটির দুই নিবন্ধিত শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ফ্রন্ট ছাড়া অন্য কোনো দলের ভোটের মাঠে অবস্থান নেই, নির্বাচনী প্রস্তুতির খবরও নেই।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাহফুজুল হক জানিয়েছেন, তারা ১৩টি আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চট্টগ্রামভিত্তিক দল ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান জানান, তারা ১০টি আসনে প্রার্থী দিতে চাচ্ছেন। এই দুটি দল বিগত নির্বাচনে একটি আসনেও জামানত রক্ষা করতে পারেননি।

খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেন, জাপার সঙ্গে তাদের জোট নির্বাচনকেন্দ্রিক। জাপা যে দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবে, তারাও সেই দলের সঙ্গে থাকবেন। তিনি কিশোরগঞ্জ-৬ আসন থেকে প্রার্থী হতে চান। মাহফুজুল হক চান ঢাকা-৭ আসন। খেলাফত মজলিসের আমির প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান চান সিলেট-৬ আসন।

জাপার জোটে ‘জাতীয় ইসলামী মহাজোট’ নামে একটি মোর্চা রয়েছে। এ মোর্চায় দলের সংখ্যা ৩৫। মোর্চার আহ্বায়ক আবু নাছের ওয়াহেদ ফারুক জানান, তাদেরও নির্বাচনী প্রস্তুতি রয়েছে। তারা কয়টি আসন চান বা কয়টি আসনে তাদের প্রার্থী রয়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আলোচনা করে এটি ঠিক করা হবে।

জাপার জোটের আরেক মোর্চা ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)’। এ মোর্চায় দলের সংখ্যা ২১। তাদের কারও নিবন্ধন নেই। এ মোর্চায় কারও দৃশ্যমান নির্বাচনী তৎপরতা নেই। মোর্চার নেতারা জানান, এরশাদ কী করবেন তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। জাপার নেতারা জানান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হওয়ার আশায় জোটে এসেছে এসব দল।

সূত্র: সমকাল