অবহেলায় নিশ্চিহ্ন জনপদ

নিউজ ডেস্ক: গাওদিয়া নামে পদ্মাতীরবর্তী একটা গ্রামের কথা আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে। গ্রামটি ছিল মানিকের মা নীরদা সুন্দরীর বাবার বাড়ি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসটি লিখেছিলেন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বিক্রমপুর অঞ্চলের গাওদিয়া গ্রামটি এখন শুধু উপন্যাসেরই বিষয়, বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। এটাই পদ্মার রীতি- এপাড় ভাঙে তো ওপাড় গড়ে। তবু এই পদ্মাতীরেই আছে হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা জনপদ।

এবারের ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে তেমনি এক ঐতিহাসিক স্থান কেদারপুর এবং সংলগ্ন এলাকা। সেই কেদার রায়ের নামে নামকরণ হয়েছিল কেদারপুরের, যিনি ছিলেন বাংলার বারোভুঁইয়ার অন্যতম চাঁদ রায় ও কেদার রায় ভ্রাতৃদ্বয়ের একজন। মানসিংহের সঙ্গে বারবার যুদ্ধ করেছেন কেদার রায় এবং শেষ পর্যন্ত মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেননি। গত কয়েক মাসের ভাঙনে কেদার রায়ের স্মৃতিবিজড়িত কেদারপুর ইউনিয়নের বেশির ভাগ অংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে কেদার রায়ের বেড় (পরিখা) বলে পরিচিত ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন থেকে নদীভাঙনের দূরত্ব খুব বেশি নেই আর। ভেঙেছে নড়িয়া পৌরসভার ২ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় সবটা। কিছুদিন আগে যে রাস্তায় বাস চলাচল করত সেই মুলফৎগঞ্জ-নড়িয়া সড়ক এখন নদীতে বিলীন। ২শ’ বছর ধরে গড়ে ওঠা মুলফৎগঞ্জ বাজারেরও বেশির ভাগ চলে গেছে পদ্মায়। 

সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৮১ পরিবার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি থেকে জমিজমা- সব তলিয়ে গেছে নদীতে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাটা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণ প্রায়। তারা বলছেন, পদ্মা ভাঙে, তবে জানান না দিয়ে ভাঙে না। কয়েক বছর ধরেই ভাঙছে। প্রথমে গেছে ফসলের জমি। তখনই সতর্ক হলে এমন সর্বনাশা ভাঙনের শিকার হতে হতো না। এবার যাচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও হাটবাজার। মানচিত্রের যেখানটায় ছিল নড়িয়া নামে একটি উপজেলা, সেখানে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে প্রবাহিত হবে প্রমত্তা পদ্মা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দায়িত্বপ্রাপ্তদের ঔদাসীন্য ও অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে একটি জনপদ।

এই যখন অবস্থা, তখন গতকাল শুক্রবার দুপুরের পরে মুলফৎগঞ্জ বাজারের ভাঙন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলে চলছে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা। তাতে যে খুব একটা কাজ হচ্ছে না তা বোঝা গেল তীরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। স্বীকার করলেন সরকারি কর্মকর্তারাও। ভাঙনকবলিত পদ্মার তীর থেকেই মোবাইল ফোনে কথা হয় শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ শফিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, ভাঙন রোধে জরুরিভিত্তিতে সাত কেটি ২০ লাখ টাকার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। গত ১১ জুলাই থেকে সেই বরাদ্দ অনুযায়ী বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। প্রতি বস্তায় আড়াইশ’ কেজি বালু দিয়ে বস্তা ভর্তি করে তা ফেলা হচ্ছে। তিনি জানান, শুস্ক মৌসুমে ১২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হবে, যে প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

কিন্তু এই বালুর বস্তা ফেলাতেই দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সরকারি দলের নেতা এবং নড়িয়া পৌরসভার মেয়র শহীদুল ইসলাম বাবু রাঢ়ী। তার দাবি, ২৫০ কেজি ওজনের বালুর বস্তা ভাঙনকবলিত তীরে ফেলার কথা। কিন্তু তিনি লোকজন নিয়ে ওজন দিয়ে দেখেছেন কোনো কোনো বস্তায় ১৫০ কেজি বালুও নেই। জিও ব্যাগে পাকশী বালু থাকার কথা থাকলেও বিট বালু (বালুতে মাটির পরিমাণ বেশি) ফেলা হচ্ছে, যেটা সহজে গলে যাওয়ায় ভাঙন প্রতিরোধে কোনো কাজেই আসবে না। পৌরসভার দুটি ওয়ার্ড বিলীন হয়ে গেলেও তা রক্ষার কাজে পৌরসভার কাউকে যুক্ত করা হয়নি বলে মেয়র অনুযোগ করলেন। মেয়রের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, এ অভিযোগ ঠিক নয়। জিও ব্যাগ ফেলার কাজে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সাংসদের প্রতিনিধি, নড়িয়া উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদারক কমিটি রয়েছে। 

নড়িয়া উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বালুর বস্তার ওজন নিয়ে মেয়রের আনা অভিযোগ মনগড়া বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ব্যস্ততার জন্য বালু ফেলার সময় তিনি সবসময় উপস্থিত থাকতে না পারলেও কমিটির কেউ না কেউ উপস্থিত থাকেন এবং যখনই কোনো বালুর ট্রলার আসে তখন তারা দৈবচয়ন রীতিতে কয়েকটি বস্তা ওজন করে দেখেন। ওজন এবং গুণে কোনো তারতম্য পাওয়া যায়নি। তবে বালুর বস্তা ভাঙনরোধে শুরুতে ভূমিকা রাখলেও এখন আর খুব একটা কাজে আসছে না। তারা বিআইডব্লিউটির লোকজন এনে পানির গভীরতা মেপে দেখেছেন। পদ্মার ভাঙনকবলিত এই এলাকায় গভীরতা প্রায় ২০০ থেকে ২২০ মিটার পর্যন্ত এবং স্রোতও তীব্র। 

নড়িয়ায় পদ্মাতীরের প্রচণ্ড ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো বাবুল ব্যাপারি বালু ফেলাকে বিদ্রুপ করে বলেন, ‘এ তো বড়র পীরিতি বালুর বাঁধ।’ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের, সেখানে এই বালুর বস্তা ফেলাকে তারা তামাশা হিসেবেই মনে করছেন। তারা বলছেন, বহু বছর ধরেই ভাঙছে। তা রোধ করতে গিয়ে বছর বছর জিও ব্যাগ ফেলার নামে লুটপাট হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সময়োপযোগী সিদ্ধান্তও আসেনি এই অঞ্চলের ভাঙন রোধে। পানি উন্নয়ন বোর্ড আর জনপ্রতিনিধিরা আগে থেকে সজাগ হলে এখন ঐতিহাসিক এই জনপদ হারাতে বসত না।

সাধারণ মানুষের কথার সত্যতা মেলে পুরনো ফাইল ঘেঁটে আর বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রের খবরেও। ২০০৭ সালের ২৮ মার্চ দৈনিক সংবাদে ‘সুরেশ্বর পাইলট প্রকল্পের নামে লুটপাট’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, এই অঞ্চলের ভাঙন রোধে ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার মূল প্রকল্প পাশ কাটিয়ে অন্য খাতে তা ব্যয় করা হয়েছে। নদীর বাঁধ নির্মাণ না করে একটি রেস্ট হাউস ও একটি বিভাগীয় অফিস নির্মাণ হয়েছিল তখন। ওই প্রকল্পের আওতায় ছিল পদ্মা নদীর দক্ষিণ পাড়ে বাঁধ নির্মাণ, বাঁধের ফাঁকে ফাঁকে খাল খনন ও পদ্মার শাখা নদীর নাব্য রক্ষা। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলেও ১৯৬৯ সালে ওই প্রকল্পটি প্রথম নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন তা ফাইলচাপা ছিল। স্থানীয় লোকজনও নানা তথ্য দিয়ে বলছেন, দীর্ঘ দিনের অবহেলাতেই তারা ডুবতে বসেছেন। 

ডুবন্ত মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁইটি খুঁজে পাচ্ছে না। এমনই দু’জন মুলফৎগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী ইন্দ্রজিৎ দাস ও লোকমান খান বলেন, পদ্মা সেতুর জন্য নদীশাসনের পর নড়িয়া রক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া উচিত ছিল। ইন্দ্রজিৎ তার বসতভিটে হারিয়েছেন। লোকমানের বসত এবং বাজারের দোকান দুটিই এখন পদ্মার পেটে। লোকমানের সরল ব্যাখ্যা- পদ্মা সেতুর জন্য নদীশাসনের ফলে পদ্মা অনিয়ন্ত্রিত এলাকায় এসে রুদ্ররোষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাই তারা এমন ভাঙনের শিকার হয়েছেন, এখন নেই মাথাগোঁজার মতো আশ্রয়ও।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমাদের ৩৯টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রয়েছে। কেউ যদি প্রয়োজন মনে করেন সেগুলোতে আশ্রয় নিতে পারবেন।’ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করা হবে কি-না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘সরকারের কৃষি খাস জমি রয়েছে, গুচ্ছগ্রামের প্রকল্পও রয়েছে, এসব জায়গায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা চলছে।’ 

সূত্র: সমকাল