নিয়ন্ত্রণে থাকুক অ্যাজমা

ডা. নিহার রঞ্জন সরকার: অ্যালার্জি ও অ্যাজমা যেন এক মায়ের দুই সন্তান। অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী অ্যালার্জনগুলো হলো— ফুলের রেণু, ঘরের ও পুরনো ফাইলের ধুলা, কোনো কোনো ফলমূল-শাকসবজি-খাদ্যদ্রব্য, দূষিত বাতাস ও ধোঁয়া, বিভিম্ন ধরনের ময়লা, কাঁচা রঙের গন্ধ, ঘরের চুনকাম। অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী আরেকটি অ্যালার্জেন হচ্ছে ছত্রাক। এ অ্যালার্জেনগুলো অ্যালার্জিক বিক্রিয়া করে হাঁপানি রোগের সৃষ্টি করে। হাঁপানি রোগীদের অবশ্যই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

মাইট নামক এক ধরনের অর্থোপড জাতীয় জীব ঘরের অনেক দিনের জমে থাকা ধুলাবালিতে থাকে। অ্যালার্জিজনিত হাঁপানির একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ধুলা। বাসাবাড়িতে বিভিম্ন জায়গায় জমে থাকা ধুলাবালি, অফিসের খাতাপত্র বা ফাইলে জমে থাকা ধুলা এবং রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত যে ধুলা উড়ছে তা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রধান উদ্রেককারী। ধুলাবালি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অন্য সব অ্যালার্জেনের চেয়ে ধুলা খুব সহজে নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। ফলে খুব দ্রুত সর্দি-কাশি হয় এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়।

ঘরে বা অফিসে জমে থাকা ধুলা রাস্তার ধুলার চেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। রাস্তার ধুলাতে থাকে অজৈব পদার্থ, যাতে হাঁপানি, অ্যাজমা, সর্দি, কাশি, হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের তেমন কষ্ট হয় না। তবে রাজপথে যে যানবাহন চলাচল করে তাতে যে ধুলাবালি, ধোঁয়া থাকে তা হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের উদ্রেককারী অন্যতম পদার্থ। পুরনো জমে থাকা ধুলা বা ময়লা হাঁপানির জন্য ক্ষতিকর, কারণ এতে মাইট, ফুলের রেণু, তুলার আঁশ, পোষা প্রাণীর লোম, ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন প্রকার ছত্রাক মিশে থাকে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইটের কারণেই প্রধানত ধুলাবালি অ্যাজমা রোগীদের জন্য বিপজ্জনক। শহরে দূষিত বায়ুর কারণে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ ছাড়া ঋতু পরিবর্তনের ওপরও হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। আমাদের দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বাতাসে মাইটের পরিমাণ বেশি। যাদের ধুলার কারণে শ্বাসকষ্ট অ্যালার্জির সৃষ্টি হয়, তাদের কতগুলো বিষয়ের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে— এমন পরিবেশে চলা যাবে না, যেখানে ধুলার পরিমাণ বেশি। ঘর পরিষ্কার এবং বিছানাপত্র ঝাড়ু দেওয়ার সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

বিভিন্ন খাদ্যের কারণে হতে পারে অ্যালার্জি। গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, বোয়াল মাছ, চিংড়ি মাছ, পাকা কলা, আনারস, বেগুন, নারিকেল, হাঁসের ডিম। গরুর দুধ শিশুদের অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। ঠাণ্ডা পানীয় বা খাবার কোনো কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে। তাই যেসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও খাদ্যদ্রব্য অ্যাজমা বা হাঁপানি সৃষ্টি করতে পারে, তা পরিহার করা শ্রেয়। অ্যাজমা সৃষ্টির এ কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আপনি পারবেন আপনার অ্যাজমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এ ব্যাপারে সচেতন হোন। শুধু আপনার সচেতনতাই পারে অ্যাজমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

আমাদের দেশেও এখন হাঁপানির অনেক যুগোপযোগী পদ্ধতি এবং ওষুধ রয়েছে। তাই এ রোগ হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকে ভুল ধারণা করে থাকে যে, হাঁপানি একবার হলে তা আর কোনোদিন ভালো হবে না। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে হাঁপানি রোগটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই এ ব্যাপারে রোগী এবং চিকিৎসকসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে সজাগ এবং সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল