মাওলানা সা’দ নতুন তাবলীগের নামে মওদুদীর মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন !

ময়মনসিংহ ব্যুরো : বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলীগের এই মহান কাজে বর্তমানে সকল বিরোধ ও বিশৃঙ্খলার একমাত্র উৎস হলেন ইন্ডিয়া, দিল্লিনিজামুদ্দিন মারকাজ মসজিদের মাওলানা সা’দ কান্দলভি। তাঁর বিভিন্ন বিতর্কিত ও ভ্রান্ত বয়ান, আচার আচরণই এ সকল সমস্যাদির উৎপত্তি ঘটিয়েছে। তাবলীগ জামাতের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রতিনিধিত্বশীল বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় ৪ হাজার উলামায়ে কেরাম, ইমাম ও খতীবগণ মাওলানা সা’দ পন্থীদের ছড়ানো বিভ্রান্তের অবসানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় কমিশনার মাহমুদ হাসান, ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি, জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস ও পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আবিদ হোসেনের কাছে পৃথক পৃথকভাবে বুধবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। এছাড়াও রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদেরর এই স্মারকলিপির অনুলিপি কপি প্রদান করা হয়েছে।


সকাল থেকে সারা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ওলামাগন শহরের কাচারী মসজিদে প্রায় ৪ হাজার উলামায়ে কেরাম, ইমাম ও খতীবগণ একত্রিত হন। ওলামা মাশায়েকদের নেতৃস্থানীয়দের মাঝে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আব্দুর রহমান হাফেজ্জী, মাওলানা আব্দুল হক, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, মাওলানা ফজলুল হক, মাওলানা আবুল কালাম, মাওলানা শাওকাত আলী, মাওলানা মুফতি আব্দুল ওয়াদুদ, মাওলানা মুনজুরুল হক, মাওলানা মুফতি মহিবুল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মাদ, মাওলানা আমীনুল হক, মাওলানা মুস্তাফীযুর রহমান, মাওলানা রফিকুল আলম হামিদী, মাওলানা মুফতি যাকির হুসাইন, মাওলানা তাফাজ্জঅ হুসাইন, মাওলানা শামসুল হক, মাওলানা ফুফতি রইসুল ইসলাম, মাওলানা আমিনুল হক, মাওলানা হাসান, মাওলানা আব্দুল্লাহ মুকাররম, মাওলানা আব্দুল আওয়াল, মাওলানা মুফুত আব্দুশ শাকুর, মাওলানা মুফতি মাহবুবুরসহ প্রমূথ

ময়মনসিংহের ওলামাগণ লিখিত স্মারকলিপিতে বলেছেন, মাওলানা সা’দ কান্দলভি বড়দের এবং এ কাজে অতি পুরাতন বুজুর্গ ও তাঁর উস্তাদগণকে উপেক্ষা করে এবং বিনা পরামর্শে একক আমীর হওয়ার দাবী করেছেন । অথচ তাঁর এভাবে আমীর (নেতা) দাবী করাটা কোনক্রমেই শরীয়ত সম্মত নয়। বিভিন্ন বয়ানাতে ও কার্যকলাপে তাবলীগের মূলনীতি লঙ্ঘন, মূলকাজের ধারা পরিবর্তন করণ। বিভিন্ন বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের গলদ, মনগড়া ভুল ব্যাখ্যা প্রদান। কোন কোন বয়ানে পবিত্র নবীদের শানে বেয়াদবীমূলক আচরণ প্রকাশ। বেশ কিছু মাসলা-মাসায়েলের ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য ফতোয়ার বিপরীতে মূলনীতিহীন মত কায়েম করে জনসাধারণের সামনে জোড়ালোভাবে প্রকাশ। তাবলীগ জামাতের গুরুত্ব বোঝাতে এমনভাবে বয়ান করন যাতে দ্বীনের বিভিন্ন সহীহ শাখাসমূহ কঠোরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত এবং হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে, ইত্যাদি।

যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীখ্যাত ইসলামী চিন্তাকেন্দ্র ইন্ডিয়ার দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় ফাতওয়া বিভাগ মাওলানা সা’দ সাহেবের বিভ্রান্ত চিন্তাধারাগুলো আলোচনা-পর্যালোচনা করে তার বিরুদ্ধে একটি ফাতওয়া জারি করে এবং তার বিভ্রান্তকরণ চিন্তা থেকে রুজু বা ফিরে আসার আহ্বান জানায় ফাতওয়া বোর্ড। কিন্তু তিনি এখনো তার বিভ্রান্তিকর চিন্তা প্রচারে লিপ্ত রয়েছেন। বাংলাদেশের মূলধারার সকল আলেম উলামা, মসজিদের ইমাম-খতীব এবং ইসলামী স্কলারদের অবস্থান দারুল উলূম দেওবন্দের ফাতওয়ার পক্ষে।

ওলামাগণ লিখিত স্মারকলিপিতে বলেছেন, তাছাড়া মাওলানা সা’দ কান্দলভি মনগড়া কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে শরিয়ত পরিপন্থি ভ্রান্ত কথাবার্তা, একাজের পূর্ব বুজুর্গগণের কাজের ধারাকে পরিবর্তন করা, নিজেকে আমীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উগ্রবাদী দল গঠন করা ইত্যাদি কারণে দারুল উলুম দেওবন্দ এবং সারা বিশ্বের সকল ওলামায়ে কেরাম প্রতিবাদ করে আসছেন। দারুল উলুম দেওবন্দসহ সারা পৃথিবীর ওলামায়ে কেরাম মনে করেন, লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে তার এই ভ্রান্ত কথাবার্তা মুহুর্তের মধ্যে সারা দুনিয়াতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

ওলামায়ে কেরামরা মাওলানা সা’দ কান্দলভিকে অনেক বুঝানোর এবং এর থেকে বিরত থাকার জন্য দীর্ঘ ১৫ (পনের) বৎসর যাবৎ বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন উপায়ে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই নিস্ফল হয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দের ওলামায়ে কেরাম তাঁদের ফাতওয়াতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মাওলানা সা’দ সাহেব মনে হয় তাবলীগের নামে নতুন কোন জামাত গঠন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন যেমন জামাতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী সাহেব প্রথম দিকে সুন্দর সুন্দর কথা বলার কারণে ওলামায়ে কেরাম সমর্থন করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে তার কুরআন হাদিসের মনগড়া অপব্যাখ্যার কারণে ওলামায়ে কেরাম সরে এসেছেন ও আজ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে আসছেন এবং তার দলকে একটি পথভ্রষ্ট দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ওলামাগণ লিখিত স্মারকলিপিতে বলেছেন, তাবলীগী জামাত মূলত আত্মশুদ্ধি মূলক ও সংস্কারমূলক, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি সহীহ দ্বীনি কার্যক্রম যা হক পন্থি আলেম ওলামায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু, মাওলানা সা’দ পন্থী বা এতাআতপন্থী নামে পরিচিত এই বিচ্ছিন্ন গ্রুপটির সাথে মূলধারার আলেম উলামাদের সমর্থন নেই। নেই কোনো অংশগ্রহণ। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপটি, পৃথক মাওলানা সা’দ পন্থী বা এতাআতপন্থী নামে মারকায স্থাপন, আলেমদের নামে মিথ্যা অপপ্রচার করে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। সম্মিলিত উলামায়ে কেরামের শান্তিপূর্ণ এই অবস্থানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপটির নানামুখী অপতৎপরতা সমাজে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ময়মনসিংহের তাবলীগের শান্তিপূর্ণ এই কার্যক্রমকে হুমকীর সম্মুখীন করেছে।

ওলামাগণ লিখিত স্মারকলিপিতে বলেছেন, ফেৎনার সৃষ্টি তখনই হয়, যখন দ্বীন শরীয়তের উপর ব্যক্তি বিশেষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, হক সুষ্পষ্ট হওয়ার পরও না-হকের উপর পরিচালিত ব্যক্তিকে অনুসরণ করা হয়। তাই, না-হকের সাথে ইসলামের কোনো আপোষ হতে পারে না, না-হকের সাথে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কখনোই সম্ভব নয়। মাওলানা সা’দ পন্থী বা এতাআত পন্থী নামে পরিচিত এই বিচ্ছিন্ন গ্রুপটি না-হক পথে পরিচালিত, যার ব্যাপারে ময়মনসিংহের সকল উলামায়ে কেরাম তথা বাংলাদেশের মূলধারার সকল আলেম-ওলামা একমত। শোনা যাচ্ছে, এই বিচ্ছিন্ন গ্রুপটি ময়মনসিংহ তাবলীগ মারকাজে অনুপ্রবেশ করে শান্তিপূর্ণ মারকাজের পরিবেশকে স্থায়ীভাবে অস্থিতিশীল ও উগ্রতার পরিবেশ তৈরির অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। যা কোনোক্রমেই বাস্তবায়িত করার সুযোগ দেওয়া সমীচিন হবে না।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বিবেচনা করে এবং অরাজনৈতিক দ্বীনি দাওয়াতের ঐতিহ্যবাহী এই ধারাকে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনার স্বার্থে দ্বীনের ধারক বাহক ওলামায়ে কেরাম সমর্থিত তাবলীগী দ্বীনি কার্যক্রমকে সহায়তা প্রদান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মাওলানা সা’দ বা এতাআতপন্থী গ্রুপের নানা অপতৎপরতা ও কার্যক্রম বন্ধের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান ওলামাগণ ।

তাবলীগ জামাতের বিশ্বব্যাপী দাওয়াতী কার্যক্রম প্রায় শতাব্দীকাল থেকে চলে আসছে। বড় বড় বুজুর্গদের জান ও মালের কোরবাণীর বদৌলতে দাওয়াত ও তাবলীগের এই মেহনত সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং যার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ঈমান, আমল ও চারিত্রিক গুণাবলীর এক বিশাল পরিবর্তন ও উন্নতি সাধিত হয়ে একজন মুসলমান সারা বিশ্বের জন্য শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত হচ্ছিল। আজ সেই মেহনত বিভিন্ন সমস্যায় জর্জড়িত হয়ে মেহনতের সহিত সম্পৃক্ত ব্যক্তি বর্গের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও পরস্পর বিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

অনেকে মনে করে এগুলো নিছক দলাদলি বা দখল বেদখলের ঝগড়া বা বিবাদ। প্রকৃত কারণ অনেকের কাছে অস্পষ্ট ও অজ্ঞাত। নানা ধরনের বিভ্রান্তির অবসানের লক্ষে সকলের অবগতির জন্য প্রকৃত সুস্পষ্টভাবে বিষয়গুলো আলেমসাজ তুলে ধরেছেন।