প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শহীদ বুদ্ধিজীবী আরজ আলীর স্মৃতি সংরক্ষণে আকুল আবেদন

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকানিউজ২৪ডটকম: নেত্রকোণা অঞ্চলের কিংবদন্তিতুল্য শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আরজ আলীর শাহাদাত্‌ বার্ষিকীতে তাঁর আত্মার মাগফেরাতের জন্য এবং শহীদের স্মৃতিগুলো সংরক্ষণের জন্য যথাক্রমে সকলের দোয়া ও সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। সকলের জ্ঞাতার্থে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত আত্মদানের সংক্ষিপ্ত কাহিনী এখানে উপস্থাপন করলাম।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শত শহীদ বুদ্ধিজীবী। মুক্তির সংগ্রামে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত মফস্বল পর্যন্ত সেসব বুদ্ধিজীবীগণ দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য কীভাবে আত্মোত্‌সর্গ করেছেন, কীভাবে জনগণ শ্রদ্ধাভরে শহীদদের আত্মত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করে শোকে মুহ্যমান হয়েছেন এবং কীভাবে শহীদ স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন- তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও মূর্ত প্রতীক শহীদ অধ্যাপক আরজ আলীর আত্মদানের কাহিনী এবং তাঁকে নিয়ে রচিত গান “ কই গেলা ভাই আরজ আলী ? তোমার জন্য কান্দিতেছে শত শত বাঙালি” গানটি । আমার জানামতে সারা বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবী, যার নাম-ভিত্তিক রচিত হয়েছে জনপ্রিয় শোক সংগীত।

শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আরজ আলী ১লা ফেব্রুয়ারী ১৯৪৫ সনে বিরিশিরি ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী নবী হোসেন ও মাতার নাম হাজী শাহরজান বানু । ১৯৬৭ সনে কৃতিত্বের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এম এ ডিগ্রী অর্জন করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালীন সময়ে ডাকসুর ইকবাল হল শাখায় একটি সম্পাদকীয় পদেও তিনি নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পরপরই তিনি ইশ্বরগঞ্জ কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের আমন্ত্রণে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বেশ ক’জন বন্ধুসহ ঐ কলেজে প্রভাষক হিসিবে যোগদান করেন। ইশ্বরগঞ্জের বিশিষ্ট লোকদের ভাষ্যমতে জানা যায় যে, তিনি শিক্ষক হিসেবে ঐ এলাকায় এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, কারো বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে তাঁর জন্যে এর অংশবিশেষ পাঠানো হতো। ১৯৭০ সনের জানুয়ারী মাসে তিনি তাঁর স্বীয় ও প্রিয় কলেজ বর্তমান নেত্রকোণা সরকারী মহাবিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এ প্রতিষ্ঠান ছিলো তাঁর স্বপ্নের কর্মস্থল। এখানে তিনি সহকর্মী হিসেবে ফিরে পান তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলী ও সতীর্থ বন্ধুদের এবং ছাত্র হিসেবে পান নিজ এলাকাবাসী ছেলেমেয়েদের। উনার শিক্ষক, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে জানা যায় যে, শিক্ষক ও ব্যাক্তি হিসেবে অল্প সময়েই কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনি।

অধ্যাপক আরজ আলী খুবই ভালবাসতেন দেশকে আর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে, খুব সহজেই তাদেরকে আপন করে নিতেন। স্বপ্ন দেখতেন শোষণ-বঞ্চনা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি দেশের, চিন্তা করতেন সাধারণ মানুষের সার্বিক মঙ্গল ও উন্নয়নের। প্রতিবাদী এ ব্যাক্তিটি ঘৃণা করতেন অন্যায়, অসত্য, দূর্নীতি ও গণবিরোধী নীতিকে। যার জন্যে তত্‌কালীন পাকিস্তান সরকারের তল্পীবাহক দূর্নীতিবাজ স্থানীয় এজেন্টদের সঙ্গে উনার প্রচুর বিরোধ ছিলো। শহীদ অধাপক আরজ আলীর স্নেহধন্য প্রয়াত সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব জালাল উদ্দীন তালুকদার ও প্রয়াত শিক্ষাবিদ বাবু দীলিপ মজুমদারের ভাষ্যমতে জানা যায় যে, সুসং মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতেও উনার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন উক্ত কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল ও প্রথম প্রস্তাবক। যার জন্যে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সঙ্গে উনার বিরোধ ছিল চরমে। এ কারণেই তত্‌কালীন সুসং মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, দুর্গাপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং স্থানীয় সুধী মন্ডলী তাঁর অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, ১৯৭৩ সনে সুসং মহাবিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটি ‘শহীদ অধ্যাপক আরজ আলী সড়ক’ নামে নামকরণ করেন।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে ভারতে গমণের সিদ্ধান্ত নেন এবং সীমান্ত শহর বাঘমারা পরিদর্শন করে আসেন। পরে শরণার্থীদের দূর্দশার বিবরণশোনা উনার এক মামার জোর পরামর্শে দেশে থেকে অধ্যাপনায় ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। দেশের ভতেরে থাকলেও উনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত হননি। সে সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর এ শহীদ সে সময়ে উনার সদ্যজাত ভাতিজা ও প্রতিবেশী ভাতিজীর নাম রাখেন যথাক্রমে ‘মুজিব’ ও ‘রাষ্ট্রন্নেসা’ । পরবর্তীতে তাঁর বাড়ীতে অবস্থানরত আব্দুল জব্বার, আপন ভাগ্নে ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছাত্র মতীন্দ্রকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করানোর জন্যে একদিন সঙ্গে করে বাঘমারায় নিয়ে যান। এছাড়া নেত্রকোণা কলেজের অনেক ছাত্রের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের অনুপ্রেরণার উতস্‌ ছিলেন তিনি।

৬ই ডিসেম্বর, রোজ শনিবার, ১৯৯৭ সনে সুসং ডিগ্রী কলেজ মাঠে আয়োজিত “শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আরজ আলী স্মৃতি ক্রিকেট টূর্ণামেন্ট”-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির ভাষণে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাঘমারা ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব রফিক উদ্দীন ফরাজী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আমীর আলী বি এ বলেন, “ অনেকেই আমাদের কাছে শহীদ অধ্যাপক আরজ আলীর রেফারেন্স উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভূক্ত করতেন। ভেতরে থেকে উনি এভাবে কাজ করছেন জেনে আমাদেরও খুব ভালো লাগতো” । উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রয়াত সাবেক সাংসদ জনাব জালাল উদ্দীন তালুকদার বলেন, শহীদ অধ্যাপক আরজ আলী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক সংগঠক ও আমাদের পথ প্রদর্শক” । উনার প্রত্যক্ষ ছাত্র ও বর্তমানে নেত্রকোণা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার জনাব নূরুল আমীনের ভাষ্য থেকেও জানা যায় যে, উনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন আঞ্চলিক সংগঠক। উনি এক সাক্ষাত্‌কারে বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধে এমনি এমনি যাইনি, আরজ আলী স্যার ছিলেন আমাদের উদ্বুদ্ধকারী ও উত্‌সাহদাতা”।

নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জনাব আব্দুল মতিনের এক সাক্ষাত্‌কারে বলেন, “ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অধক্ষ্য তসদ্দুক আহাম্মেদ কয়েকজন অধ্যাপককে বিভিন্ন সময়ে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান, এবং এই বলে সতর্ক করে দেন যে, আপনাদের কয়েকজন অত্র কলেজের শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন, এবং এই সংবাদ পাকিস্তান আর্মীদের হাতে আছে, আপনারা ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করলে যে কোন ধরণের বিপদ আসতে পারে, অতএব আপনার একাজ থেকে বিরত ও সতর্ক থাকুন; সম্ভবতঃ সেই অধ্যাপকদের মধ্যে অধ্যাপক আরজ আলীও ছিলেন”। নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ের প্রয়াতঃ অধ্যাপক জনাব গোমেজ আলীর ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, “ মূলতঃ বঙ্গবন্ধুর৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই অধ্যাপক আরজ আলী তত্‌কালীন পশ্চিম পাকিস্তানী শিল্পপতিদের উত্‌পাদিত পণ্য বর্জন করা শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে আমার এক কণ্যা সন্তান জন্মগ্রহন করলে- আমার বন্ধু আরজ আলী বাচ্চাটিকে কিছু উপহার দেয়ার জন্য আমাকে নিয়ে বাজারে বের হন। কিন্তু, তিনি কাপড় কিনতে গিয়ে যেসব দোকানে যাচ্ছিলেন, সেসব দোকানের সবগুলোতেই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের মালিকানায় উত্‌পাদিত কাপড়, কিন্তু তিনি তা কোন অবস্থাতেই কিনলেন না। উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে তিনি কিনলেন বাঙালীদের মালিকানায় উত্‌পাদিত লালসালু কাপড়। পরে এটি দিয়ে ফ্রক বানিয়ে আমার মেয়েকে উপহার দিয়েছিলেন। যা আজো আমরা তাঁর স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করছি”।

শহীদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায় যে, অধ্যাপক আরজ আলী মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে কলেজ বন্ধ হলে অথবা ছুটি নিয়ে প্রায়শঃ নিজ বাড়ীতে আসতেন বন্ধু-বান্ধব ও ছাত্র-যুবাদের নিয়ে। এবং তাদের অনেকেই দু’একদিন থেকে অতঃপর ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন পথে ভারতে পাড়ি জমাতেন। তাঁদের মধ্যে ছদ্মবেশ ধারণকারী এক যুবক পার্শ্ববর্তী আত্‌কাপাড়া গ্রামে রাজাকাদের হাতে ধরা পড়লে, মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সনের আগষ্ট মাসের শুরুতে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী ও এদের এদেশীয় রাজাকারেরা উনার বাড়ীঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। এবং পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা ঘোষণা করে যে, অধ্যাপক আরজ আলী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই কাঁচা মরিচের মতো খেয়ে ফেলা হবে অর্থাত্‌ হত্যা করা হবে। অবশেষে ১২ই আগস্ট মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা ও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দানের অভিযোগে বর্তমান নেত্রকোণা সরকারী কলেজের টিচার্স মেস থেকে উনাকে গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানের প্রতি বশ্যতা স্বীকারের প্রানান্ত চেষ্টায় উনার উপর চালানো হয় বর্বরোচিত দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন। দু’দিন পরে বিরিশিরি সেনাক্যাম্পে স্থানান্তরিত করে কর্ণেল সুলতান শর্ত আরোপ করেন, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে পাকিস্তানের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করলে উনাকে মুক্তি দেয়া হবে এবং এ এলাকার নেতৃত্ব দেয়া হবে। কিন্তু মৃতুঞ্জয়ী অধ্যাপক আরজ আলী তীব্র ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ১৬ই আগষ্ট ভোর বেলা সোমেশ্বরী নদীর তীরে নিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেকের মুখে শোনা যায় মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি উচ্চারণ করেছিলেন “জয়বাংলা” এবং বলেছিলেন, “হে আল্লাহ্‌, তুমি স্বাধীন করো সোনার বাংলা”।

মহান স্বধীনতা অর্জিত হবার পরে তাঁর প্রতি মানুষের আকুতি, শ্রদ্ধা ও শোক দেখে নেত্রকোনার বিশিষ্ট বাউল চাঁন মিয়া রচনা করেন তাঁর স্বাধীনতা বিষয়ক অমর গান ‘ কই গেলা ভাই আরজ আলী ? তোমার জন্য কান্দিতেছে শত শত বাঙালি’ গানটি । পরে বাউলসম্রাট ইদ্রিস মিয়া এবং প্রখ্যাত বাউল নবী হোসেনসহ আরো অনেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে এ গানটি গেয়ে বেড়াতেন। যা আজো মহান মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ অধ্যাপক আরজ আলীর অমর স্মৃতি বহন করে যাচ্ছে। নীচে তা সংযুক্ত হলো-
১৯৭২ সনে শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আরজ আলী স্মরণে নেত্রকোণার প্রখ্যাত বাউল জনাব চাঁন মিয়া কর্তৃক রচিত ও পরবর্তীতে বাউল জনাব ইদ্রিস মিয়া ও নবী হোসেন কর্তৃক গীত ও প্রচারিত গান- 
“ কই গেলা ভাই আরজ আলী ? তোমার জন্য কান্দিতেছে শত বাঙালি ”
================================================
কই গেলা ভাই আরজ আলী ?
তোমার জন্য কান্দিতেছে শত শত বাঙালি ।
আল্লাহতালার রহমে, জন্ম নিলা নওয়াপাড়া গ্রামে ;
পাশ করিলে বি এ, এম এ, ফুটলো দেশে গোলাপকলি ।।
এই ফুলের মকরন্ধে, মোহিত করেছে গন্ধে ;
মনেরই আনন্দে গেয়ে ফিরে ভ্রমর অলি ।।
করলেন তিনি প্রফেসারী , দেশ-বিদেশে নামজারী ;
পাগল হইয়া পুরুষ-নারী দিতো কত পুষ্পাঞ্জলি ।।
আরেক কথা মনে উঠে , কইতে কলিজা ফাটে ;
পাকিস্তানের পাল্লায় উঠে- 
শয়তান মর-দূত কিতাব আলী ,
শয়তান মর-দূত হামিদ আলী ,
শয়তান মর-দূত আমছর আলী ।।
যুক্তি করে এই কয়জনা, দেশে যোগ্য লোক রাখবোনা ;
এই সাহেবকে মারলো নিয়া করিয়ে রাইফেলের গুলি ।।
মৃত্যুকালে সাহেব বলে , ওগো আল্লাহ , তুমি স্বাধীন করিও সোনারবাংলা ;
জঁপতে জঁপতে ইল্লাল্লাহ , স্বর্গপুরে গেলেন চলি ।।
তাঁর মৃত্যুর খবর শুনি , কাঁদে মা গর্ভধারিনী ;
কাঁদে তাঁর ভ্রাতা-ভগ্নী , আর যত বংশাবলী ।।
নবী হোসেনের মনের ব্যথা , ভুলতে নারি উনার কথা ;
হাসরের দিন বিধাতা , দেখাইও তাঁর রূপাঞ্জলি ।।

মহান স্বাধীনতা অর্জিত হবার পরে ১৯৭২ সনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত গেজেটে উনি তালিকাভূক্ত । বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থ “স্মৃতি ৭১” – দ্বিতীয় খন্ডে উনার আত্মত্যাগের কাহিনী বর্ণিত । বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কর্তৃক ১৯৯৪ সনে প্রকাশিত হয় তাঁর ছবি সম্বলিত স্মারক ডাকটিকেট । ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস- বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক, ২০০১ সনের ১৬ই ফেব্রুয়ারী তাঁর আত্মত্যাগের কাহিনীর উপর ভিত্তিকরে সুসং মহাবিদ্যালয় মাঠে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘বিজয়গাথা আরজ আলী, সব বাউলের একতারাতে’ । তাঁর স্মৃতিতে রচিত গান “ কই গেলা ভাই আরজ আলী, তোমার জন্য কাঁদিতেছে শত শত বাঙালি ” গানটি এখনো স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছে ।

১৯৭২ সনে তাঁর কর্মস্থল নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ে তাঁর স্মরণে আয়োজিত প্রথম শোকসভায় কলেজে তাঁর নামকরণে লাইব্রেরী স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও, তা সুদীর্ঘ ৪৬ বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়ায়, শহীদের ভ্রাতুষ্পুত্র অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের আবেদনের পরপ্রেক্ষিতে বর্তমান সদাশয় কলেজ প্রশাসন ও সন্মানিত শিক্ষক মন্ডলীর মহানুভবতায় ২০১৭ সনের স্বাধীনতা দিবসের মহালগ্নে অবশেষে কলেজের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী এবং দর্শন বিভাগের সেমিনার কক্ষটির নামকরণ ‘শহীদ বুদ্ধজীবী অধ্যাপক আরজ আলী’ নামে করা হয়। ১৯৭২ সনে শহীদ স্মরণে কলেজ প্রাঙ্গনে শাপলা ফুলাকৃতির ছোট্ট একটি স্মৃতিস্থম্ভ নির্মিত হলেও- তা বর্তমানে নাম ফলকবিহীন এবং এতোটা অযত্নে রক্ষিত যে, কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মন্ডলী তা জানেনই না। অপরদিকে দুর্গাপুরের সুসং মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সনে মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, দুর্গাপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় সুধীসমাজ কলেজের সামনের রাস্তাটি তাঁর নামে নামকরণ করেন ।

১৯৭৫ সনে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কে বা কারা নামফলকটি সরিয়ে ফেললে অদ্যাবধি তা আর প্রতিস্থাপিত হয়নি । এদিকে সুসং মহাবিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটির নামফলক প্রতিস্থাপন করার জন্য এবং স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও তাঁর নামে কোন স্থাপনার নামকরণ না হওয়ায় , ৭ সেপ্টেম্বর , ২০১৪ সনে এলাকাবাসী , স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দের স্বাক্ষরিত এক স্মারকলিপি স্থানীয় সাংসদ জনাব ছবি বিশ্বাস(শহীদ অধ্যাপক আরজ আলীর ছাত্র) কে প্রদান করা হয় । জনাব ছবি বিশ্বাস গুরুত্বসহকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ব্যাক্ত করেন । কিন্তু অদ্যাবধি তা বাস্তবায়িত হয়নি ।

অতঃপর মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর সুপারিশক্রমে দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসন ও দুর্গাপুর পৌরসভা যথাক্রমে তাঁদের মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রতিবেদন পেশ করলে, জেলা প্রশাসক নেত্রকোণা, তা বাস্তবায়নে একমত পোষণ করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর অনুমোদন ও নির্দেশনা প্রার্থনা করেন প্রায় দেড় বছর পূর্বে। কিন্তু, হতাশাজনকভাবে তাও বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। অথচ, শহীদ স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁদের নামে স্থাপনা প্রতিষ্ঠার জন্যে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। এমতাবস্থায়, শহীদের নামে দুর্গাপুরের সড়কটি এবং সরকারী নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয়ে শহীদের নামের স্মৃতিস্তম্ভটি নামফলকসহ অতিসত্বর পুনঃস্থাপন ও উন্নয়নের জন্য- শহীদ পরিবার ও এলাকাবাসী উনার শাহাদাত্ বার্ষিকীতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, মাননীয় ক্রীড়া ও যুব উপমন্ত্রী জনাব আরিফ খান জয়, মাননীয় সাংসদ জনাব ছবি বিশ্বাস , জেলা প্রশাসন-নেত্রকোণা, সরকারী নেত্রকোণা মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন ।