ইভিএম ব্যবহারে অর্থ সাশ্রয় হবে

নিউজ ডেস্ক: জাতীয় নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে কিছুটা পিছু হটছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুরুতে এক-তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও এখন সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা ভাবছে তারা। এমনকি এ আসনের সবক’টি কেন্দ্রেও নয়, সর্বোচ্চ একশ’ থেকে দেড়শ’ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইসি-সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

যদিও শুরু থেকেই এই মেশিন ব্যবহারে কমিশনের প্রশিক্ষিত জনবল সংকটের বিষয়টিও ঘুরেফিরে সামনে আসছে। তবে ইসির কর্মকর্তাদের দাবি, স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন- এমন যে কোনো ব্যক্তির পক্ষে ইভিএম মেশিন ব্যবহার সম্ভব। তাদের মতে, ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই মেশিন ব্যবহারের ফলে সময় ও অর্থ অনেক সাশ্রয় হবে। তবে নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে ইভিএম ব্যবহারই একমাত্র সমাধান নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই ইসির পক্ষ থেকে ইভিএম ব্যবহারের জন্য ইসি সচিবালয়ের ২০ জন করে কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার সকালে ইসির প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে. এম. নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। বর্তমান ইসি পুরোপুরি প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। ইভিএম আইনি ভিত্তি পেলে রাজনৈতিক মহলসহ অংশীজনের সমর্থন নিয়ে ব্যবহার শুরু করবে কমিশন। সে ক্ষেত্রে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিছু আসন বা কেন্দ্র বাছাই করে ইভিএমে ভোট নেওয়া হবে। এর আগে ইসি দেড় লাখ ইভিএম ক্রয়ের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে এবং ইসি কার্যালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন জানিয়েছিলেন, তিনশ’ আসনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও পরে বলা হয়েছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত ইসি নেয়নি।

বর্তমান কমিশনের অন্যতম সদস্য রফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে ইভিএম ব্যবহারের আইনি ভিত্তি থাকলেও সংসদ নির্বাচনে সেই সুযোগ নেই। জাতীয় নির্বাচনেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হলে আগে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধন করে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছে। তিনি বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবেই- এটা এখনও কমিশন নিশ্চিত নয়। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে নিজেদের সামর্থ্য বিবেচনায় কমিশন ইভিএম ব্যবহারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

ঘরে-বাইরে অব্যাহত বিরোধিতার মুখে গত ৩০ আগস্ট কমিশন সভায় ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের অনুমোদন দেয় ইসি। গতকাল তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। মন্ত্রিসভার আগামী বৈঠকেই সংশোধিত আরপিওর খসড়া উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে সংসদের বিবেচনার জন্য পাঠানোর কথা রয়েছে। ইসি-সংশ্নিষ্টরা অবশ্য দাবি করেছেন, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এখনও অনেক সময়ের প্রয়োজন। কারণ, সংসদে পাস হওয়ার পরেই ইভিএম ব্যবহারে বিধিমালা তৈরি করতে হবে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে যে ধরনের মনোভাব পোষণ করা হয়েছে, সেটাই যুক্তিযুক্ত। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে জনগণ যখন ইসির পদক্ষেপ দেখতে চায়, তখন ইভিএম দিয়ে কী হবে? তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। তারা আবার নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করলে তাতে জনগণ কেন আস্থা রাখবে- বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংলাপে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের আপত্তির কারণে ইভিএম ব্যবহারে কমিশনের উদ্যোগ থমকে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই আরপিও সংশোধন করে ইভিএম যুক্ত করার প্রস্তাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ইসির নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ পদ্ধতি ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে। এমনকি রোববার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এটা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, এটা অনুশীলনের ব্যাপার। আমাদের পরীক্ষামূলক করে দেখতে হবে। আমরা চাইছি, কিছু কিছু জায়গায় শুরু হোক, সীমিত আকারে দেখা যাক প্রযুক্তির কোনো সিস্টেম লস হয় কি-না, সেটা হলে বাতিল হবে। এটা এমন নয়, এটাই শেষ কথা। আমরা সীমিত আকারে শুরু করি প্রযুক্তির ব্যবহার।’

এদিকে সিইসি কে. এম. নুরুল হুদা সোমবার সকালে বলেছেন, যদি সরকার আইন প্রণয়ন করে, যদি সেটা ব্যবহার করার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদের থাকে, তখন আমরা এটা দৈবচয়ন ভিত্তিতে সারাদেশে ব্যবহারের চেষ্টা করব। তিনি বলেন, ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। ইসি যদি মনে করে, ২৫টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করবে, তাহলে কোন ২৫টি আসনে ব্যবহার করা হবে- তা ইসির ইচ্ছামতো দেবে না, যাতে স্বচ্ছতার অভাব না হয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কি হবে না- এ সিদ্ধান্ত আরও পরের বিষয়।

সিইসি বলেন, কমিশন এখনও অনেক পেছনের পর্যায়ে রয়েছে। আইন মাত্র সরকারের কাছে যাচ্ছে। অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। আর্থিক সংস্থানের জন্য বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে, তারপর মন্ত্রিসভা ও সংসদে যাবে। সরকার এবং সংসদ আইন সংশোধন করলেই জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২০১০ সালে বাংলাদেশে ইভিএমের শুরুর পর্যায় থেকে এখন প্রযুক্তিগত দিক থেকে এ যন্ত্রের অনেক উন্নতি হয়েছে দাবি করে নুরুল হুদা বলেন, আগামীতে চার হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩২টি পৌরসভা ও ৪৯১টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।

সিইসি দাবি করেন, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন আয়োজনে আর্থিক সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারবে না। ফলে এ পদ্ধতি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও পাবে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা চলছে, তাকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন তিনি। সিইসি মনে করেন, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে শুরুতে এ রকম বাধা-বিপত্তি বা উৎকণ্ঠা থাকা স্বাভাবিক। প্রশিক্ষণ আর প্রচার ভালো হলেই এর ইতিবাচক প্রভাব গ্রামেগঞ্জে, ভোটার, রাজনৈতিক মহল ও প্রার্থীর কাছে পৌঁছে যাবে। ইভিএম কিনতে ইসির প্রস্তাবিত প্রকল্পের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে কি-না সে প্রশ্ন তোলাও অপরাধের কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন সিইসি।

তিনি বলেন, ইভিএমের প্রাথমিক ব্যয় বেশি হবে যন্ত্রের দামের কারণে। তবে তখন ভোট গ্রহণে হাজার রকমের সামগ্রী প্রয়োজন হবে না। ভোট পরিচালনার জন্য ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় আইন-শৃঙ্খলায়। ইভিএম ব্যবহারে সেখানেও সাশ্রয় হবে। এসব মেশিন একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে।

এর আগে গত ৩০ আগস্ট ব্যালট পেপারের পাশাপাশি ইভিএমে ভোট গ্রহণের বিধান রেখে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে ইসি। পাঁচ সদস্যের কমিশনের একজন মাহবুব তালুকদার ইভিএম বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সভা বর্জন করেন। তিনি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও দেন। যাতে তিনি ইসির দক্ষ জনবলের অভাব ও অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।

সূত্র: সমকাল