এখন সংলাপের কোনো কারণই নেই: মেনন

নিউজ ডেস্ক: আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের আর কোনো সম্ভাবনাই দেখছেন না বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেছেন, সংলাপের সম্ভাবনা কিংবা সুযোগ অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। সংলাপ তো সেদিনই শেষ হয়ে গেছে, যেদিন খালেদা জিয়ার বাড়ির গেট থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অপমানজনকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনে আলোচনার প্রস্তাব বিশ্রী ভাষায় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এখন তো সংলাপের কোনো কারণই দেখি না। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাশেদ খান মেনন এ কথা বলেন। দেশের আগামী দিনের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্নেষণ করে তিনি আরও বলেন, নানাভাবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলবে। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চেষ্টা হবে। সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন ও শিক্ষার্থী আন্দোলনকে ইস্যু করে যেভাবে রাজনৈতিক খেলার চেষ্টা হয়েছে, সেভাবেই আবারও কেউ খেলতে পারে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব রটিয়ে কেউ আন্দোলনে নামতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। তবে এ ধরনের কোনো আন্দোলন জনগণ গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশি-বিদেশি মহল আবারও চক্রান্তে মেতেছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশি নানা মহল তো রয়েছেই, বিদেশি রাষ্ট্র বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি তুলে হয়তো বা এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। অতীতেও করেছে, আবারও করবে। তবে আমাদের দেশের নির্বাচন দেশের সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ই হবে। সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলেও মনে করি।

আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকার’ গঠনসহ নানা দাবি তুলে ধরা হচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না এলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচন হবে বলে বিভিন্ন মহলের শঙ্কা প্রসঙ্গে মেনন বলেন, মুখে যত কথাই বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে। এক্ষেত্রে ‘নির্বাচনে জয়ী হয়েই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনব’- এমন স্লোগান দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। আর আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণেই হবে। সেক্ষেত্রে গত নির্বাচনের মতো অনেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখা দেবে না।

দাবি আদায়ে বিএনপির কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৯ বছরের ইতিহাস বলে বিএনপি নিজেরা কোনো আন্দোলন সফল করতে তো পারেইনি, বরং অন্যদের বিভিন্ন আন্দোলনের ঘাড়ে চেপে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। একবারই তারা নিজেরা আন্দোলনের চেষ্টা করেছিল। সেটি হচ্ছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সরকার পতন আন্দোলনের কথা বলে খালেদা জিয়ার অবরোধের ডাক। সে সময়ও আন্দোলনের নামে আগুনসন্ত্রাস ও মানুষ খুনই হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিরোধের মুখে সেই আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আগামীতেও বিএনপি যতই আন্দোলনের কথা বলুক না কেন, জনগণের সমর্থনপুষ্ট ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণে সে ধরনের আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারবে না।

আগামী অক্টোবর কিংবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বর্তমান মন্ত্রিসভা সংক্ষিপ্ত করে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল। ওই সরকারে ১৪ দল শরিকদের অংশগ্রহণ থাকবে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, সেটি তো প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তবে তার ধারণা, গতবারের মতোই এ সরকার গঠিত হবে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম এবং যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আরেকটি আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে রাশেদ খান মেননের দাবি, ড. কামাল হোসেন নিয়মিতই জাতীয় ঐক্যের কথা বলে থাকেন। এর আগে ১১ দলে তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। পরে ১৪ দল গঠনের শুরুতেও কিছু দিন এর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই এক-এগারোর সরকারকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দিয়ে সরে গেছেন। এক-এগারোর সরকারকে আইনি ও অন্যান্য সহায়তাও দিয়েছেন। পরে বি. চৌধুরীসহ অন্যদের নিয়ে বারবারই জাতীয় ঐক্য নিয়ে মাঠে নামলেও কোনোবারই তাদের এই ঐক্য কোনো ফল দেয়নি, কোনো পরিণতি পায়নি। এবারও হয়তো বা পেছনের অনেক শক্তির কথামতোই জাতীয় ঐক্যের কথা বলে মাঠে নেমেছেন তারা। তবে এবারও তাদের এই উদ্যোগ কোনো ফল দেবে বলে মনে হয় না।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সরকারবিরোধী প্রধান বিরোধী দল বিএনপিরও যুক্ত হওয়ার কথা চলছে। এ প্রসঙ্গে এই নেতা বলেন, মনে হয় না বিএনপি এতে যুক্ত হতে পারবে। পত্রিকায় দেখলাম খালেদা জিয়া বলেছেন, ২০ দলীয় জোটের ঐক্য বজায় রেখেই বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া চালাতে হবে। এখন তাদের জোটের ঐক্য মানে হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য। ড. কামাল হোসেন আর যাই হোক, জামায়াতের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করবেন বলে মনে হয় না। ফলে জামায়াত ছাড়া বিএনপির পক্ষে এই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত যুক্ত হওয়া সম্ভবও হবে বলে মনে হয় না।

১৪ দলের বাইরে থাকা বামপন্থি আটটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সম্প্রতি বাম গণতান্ত্রিক জোট নামের আলাদা জোট গঠিত হয়েছে। এই জোট নিয়ে প্রখ্যাত বামপন্থি নেতা মেননের মূল্যায়ন, এই জোটে যেসব দলের সমন্বয় ঘটেছে, আদর্শের দিক থেকে তারা এতটাই পরস্পরবিরোধী যে, সমন্বিত কর্মসূচিতে আসতে পারবে না। সাংগঠনিকভাবেও আগামী দিনের রাজনীতি ও নির্বাচনে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না।

আট বাম দলের জোটের পক্ষ থেকে ১৪ দলের মধ্যকার বামপন্থি দলগুলোকে ‘আদর্শচ্যুত’ বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মেনন বলেন, তাদের এ ধরনের কথায় গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।

আগামী নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে কোনো টানাপড়েন দেখা দেবে না বলেও মনে করেন ক্ষমতাসীন এই জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। তিনি বলেন, আদর্শিক জোট ১৪ দল গঠনের সময়ই বলা হয়েছিল, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের বাংলাদেশ বিনির্মাণে একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন করবেন তারা। গত দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এখনও এই নীতিতেই অটল ও অবিচল রয়েছেন তারা।

মহাজোটের আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে তিনি বলেন, মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তো আগে থেকেই বলে আসছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে না এলে এককভাবে এবং বিএনপি এলে মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করবেন তিনি। সেক্ষেত্রে মহাজোটের কাছে এরশাদের দাবি, ৭০টি আসনে সমঝোতা। এটিও আওয়ামী লীগের তরফে সময়মতো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করে নেওয়া হবে বলেই তার ধারণা।

গত দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও জয়ী হওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, আমি মনে করি এবং মোটামুটি নিশ্চিত, আগামী নির্বাচনেও জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ১৪ দলই আবারও সরকারে যাবে। 

সূত্র: সমকাল