অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে রাজস্ব আয় হারাচ্ছে সরকার

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধায় সরকারি কোন বালুমহাল না থাকায় নদ-নদী ও ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেই সকল কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে যেমন নদ-নদীগুলোতে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে তেমনি ফসলি জমি ভেঙ্গে পড়ছে বালু উত্তোলনের গর্তে। এতে করে একদিকে যেমন মানুষ নদীতে সহায়-সম্বল হারিয়ে আশ্রয়হীন হচ্ছে অপরদিকে তেমনি দিন দিন ফসলি জমির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বালুমহাল না থাকায় সরকারও প্রতি বছর কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে বালু উত্তোলন করার গর্তে ডুবে তিনজন শিশুর প্রানহানীর ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, ভবন, রাস্তা, সেঁতু ও কালভার্ট নির্মাণ, নিচু জমি ও গর্ত ভরাট করাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কাজে বালু প্রয়োজন পড়ে। বর্তমানে জেলায় সরকারি কোন বালুমহাল না থাকায় ফসলি জমি, পুকুর, ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা, যমুনা, করতোয়া, বাঙ্গালী, ঘাঘট, আলাই ও মানস নদীসহ যত্রতত্র বিভিন্নস্থান থেকে বালু উত্তোলন করেই এসব উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে। সব কাজ ঠিকমতো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সরকারিভাবে বালুমহাল না থাকায় সরকার শুধু রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের তালতলা বাজার এলাকায় ভাঙ্গন কবলিত ঘাঘট নদী থেকে বালু উত্তোলন করেছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। মার্চ মাসে ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের এক সদস্য উত্তর উড়িয়া গ্রামের আজাদ মিয়া, সোফাজ্জল হোসেন ও নুরজামাল মিয়ার বাড়ী সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে স্যালো ইঞ্জিনচালিত মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করেছেন। ফলে এখন নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সে স্থানটি ব্যাপক নদীভাঙ্গনের কবলে পড়েছে।

জুলাই মাসের প্রথম দিকে সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের মথরপাড়া গ্রামে ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। আশেপাশের জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা থাকায় বারবার নিষেধ করা সত্বেও বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়নি। গত বছরের নভেম্বর মাসে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়নের কাজীপাড়া ও হরিনাথপুর বিশপুকুর এবং মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের চরবালুয়া গ্রামে কাটাখালি নদীর ভাঙ্গন কবলিত এলাকা থেকে পাঁচটি শ্যালোইঞ্জিনচালিত মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই বালু উত্তোলনের ধারাবাহিকতা চলছেই। আর এসব কাজের সাথে যুক্ত রয়েছেন প্রভাবশালী দলের নেতা, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, ঠিকাদারসহ জনপ্রতিনিধি ও তাদের আত্নীয়রা।

এদিকে বালু উত্তোলন করার গর্তে ডুবে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় তিনজন শিশুর প্রানহানীর ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কঞ্চিবাড়ী গ্রামে খেলতে গিয়ে ফসলি জমিতে বালু উত্তোলন করার গর্তে ডুবে আক্কাস মিয়া (৬) নামের এক শিশু মারা যায়। সে ওই গ্রামের আসাদুল ইসলামের ছেলে।

২০১৭ সালের ২৯ মে সাঘাটা উপজেলার পদুমশহর ইউনিয়নের টেপা পদুমশহর নয়াবন্দর এলাকায় আলাই নদীতে গোসল করতে গিয়ে নদীতে বালু উত্তোলন করার গর্তে ডুবে নুর বানু (১৩) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ সময় শাহনাজ আক্তার (১০) ও শান্ত মিয়া (৭) নামের দুই শিশু ওই বালু উত্তোলন করার গর্তে ডুবে গেলে আশেপাশের লোকজন এসে তাদের দুইজনকে উদ্ধার করে।

একই বছরের ৪ জুলাই সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের মিরপুর (সাবেক তাজপুর) গ্রামে হাঁস খুঁজতে গিয়ে ফসলি জমিতে বালু উত্তোলন করা গর্তের পানিতে ডুবে সিহাব মিয়ার (৯) মৃত্যু হয়। সে ওই গ্রামের ইসলাম মিয়ার ছেলে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় বালু উত্তোলন কোন মতেই কমছে না বলে মনে করেন মানুষ।

এ বিষয়ে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের খামার বোয়ালী গ্রামের বালু ব্যবসায়ি মিন্টু মিয়া বলেন, আমরাও চাই জেলায় বালুমহাল ঘোষণা করা হোক। নির্দিষ্ট বালুমহাল ছাড়া জেলার যে কোন স্থান থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও বালু উত্তোলন করেই কিন্তু সরকারি-বেসরকারি সকল কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। শুধু বালুমহাল না থাকায় সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বালুমহাল চালু করা যায় কিনা এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল মুঠোফোনে দেশ দর্পণকে বলেন, গাইবান্ধায় বালুমহাল চালু করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। আইনগত কিছু বিষয় আছে, সেটা মেনে বালুমহাল চালু করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া যারা নিয়ম বহিঃর্ভুতভাবে বালু উত্তোলন করছে আমরা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে সেটা বন্ধ করছি।

প্রিন্স, ঢাকা