আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো জোটেই যাব না: সেলিম

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো জোটেই যাবে না বামপন্থিরা। নির্বাচনে গেলে আমরা ৩০০ আসনেই লড়বো। তখন ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এই ত্রিমুখী ধারার দুটিই দুঃশাসনের। আরেকটি ধারা বামপন্থিদের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্ল্যাটফর্ম। 

বর্তমান রাজনীতি ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আরও বলেন, বামপন্থিরাই এক নম্বর বিরোধী দল। দুই নম্বর বিরোধী দল হলো বিএনপি। কেননা বিএনপি গদির বিরোধিতা করে। 

সরকারের দুঃশাসনের বিরোধিতা করে না। 

বর্তমান অবস্থায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের বর্ষীয়ান এই নেতা। তার দাবি, জনসমর্থন না থাকার পরও আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় যাওয়ার সব আয়োজন এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে। এ অবস্থায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি। 

‘পরিস্থিতি বুঝে বামপন্থিরা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা বয়কটও করতে পারে’- এমন মন্তব্য করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি উপাদান। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের গণবিরোধী চরিত্র তুলে ধরা যায়। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্য গণজাগরণের নতুন অধ্যায় রচনা করতে হবে। এটা একটা কঠিন সংগ্রাম। কঠিন লড়াই। সেই সংগ্রামকে অগ্রসর করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কিংবা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেবে বামপন্থিরা। 

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রত্যাশা, দেশ বাঁচাতে হলে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিরোধী দল থাকতে হবে। তার আক্ষেপ, যে স্বপ্ন নিয়ে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তা থেকে দেশ অনেক দূরে সরে গেছে। একদিকে গণতন্ত্রহীনতা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে চরম রুগ্‌ণতা এবং নৈরাজ্যে নিপতিত করে রেখেছে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও দেশ এখন সাম্রাজ্যবাদসহ বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে বলে হিসাব দেখানো হচ্ছে। উন্নয়নের মডেল বলে দাবি করা হচ্ছে। অথচ বৈষ্যমের হারও বাড়ছে। কতিপয় লুটেরা ব্যক্তি উন্নয়নের সুফল প্রায় সবটাই নিয়ে নিচ্ছে। বিদেশি এবং দেশি করপোরেট শক্তি এবং তাদের ক্যাডার বাহিনীর কাছে দেশ আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করেছে। 

সেলিম বলেন, লুটপাটের অর্থনীতি লুটপাটের রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা হয়ে উঠেছে লুটপাটের সুযোগ করে নেওয়ার উৎকৃষ্ট সোপান। প্রধানত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দশকের পর দশক ধরে চলছে তো চলছেই। তাদের মধ্যে খুনোখুনি, হানাহানি এবং গদি দখলের জন্য গলাকাটা দ্বন্দ্ব দেশকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে। শুধু দুই দলের ভেতরেই নয়, উভয় দলের অভ্যন্তরেও যে হানাহানি ও খুনোখুনির ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে চলছে, এর পেছনের কারণও লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমালোচনা করে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগত অবস্থান থেকে সরে গেছে। আর জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধারায় রয়েছে বিএনপি। এক বিচারে বলতে হবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমমনা দল। ওরা লুটপাট ও সাম্রাজ্যবাদের আনুগত্যের পথ অনুসরণ করছে। রাতারাতি ধনী হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতা পেতে পাগল হয়ে পড়েছে। এরা রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। এদের কাছে ক্ষমতাই প্রধান। নীতি এবং আদর্শ তুচ্ছ বিষয়। 

ক্ষেতমজুর সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ, দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি এক অনিশ্চিত এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কী হয়, কী না হয়- এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও গুজবের শেষ নেই। দেশে এখন একমাত্র নিশ্চিত ব্যাপার হলো, ‘অব্যাহত অনিশ্চয়তা’।

পর্দার পেছনে থেকে যারা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা সচেতন ও সুপরিকল্পিতভাবে দেশকে ‘নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের ভেতরে’ আটকে রেখেছে। এই পরিস্থিতি প্রতিফলিত হচ্ছে দেশের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। সামরিক শাসনামলে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। এরশাদবিরোধী অভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি ছিল, আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। কিন্তু এরশাদের পতনের পরেও অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি। 

মুজাহিদুল ইসলাম বলেছেন, অনেকে নিজেদের বিকল্প বলে জাহির করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিকল্প আর ‘নব সংস্করণ’ এক জিনিস নয়। আওয়ামী লীগ ভিশন ২০২১ এবং বিএনপি ভিশন ২০৩০ ইত্যাদি তুলে ধরছে। কিন্তু তারা ভিশন ১৯৭১-কে শুধু যে ভুলে বসে আছে তা নয়, বরং এর বিপরীত ধারায় তাদের ভিশনের রূপরেখা রচনা করছে।

এ ক্ষেত্রে ‘ভিশন মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে দেশকে বর্তমান অবস্থার বিকল্প ধারায় পরিচালনা করাই সংকট থেকে মুক্তির পথ হতে পারে। সেটাই জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় পুনর্জাগরণের নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। এই জন্য দ্বিদলীয় মেরুকরণভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর বেড়াজাল ভেঙে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে বলে মনে করছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। 

সূত্র: সমকাল