আওয়ামী লীগের জন্য, একটি কঠিন সতর্কবার্তা-২

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীঃ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করতে পারি,১৯৭৫ সালেও তা করেছিলাম। সেবারেও লন্ডন থেকে (তখন আমি সদ্য লন্ডনে এসেছি, ঢাকায় মাস খানেকের জন্য গিয়েছিলাম) বাংলাদেশে এসে বাতাসে বারুদের গন্ধ পেয়েছিলাম।
আমার এই আশঙ্কার কথাটা বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলামও। কিন্তু তখন যেসব পারিষদ তার চারপাশ ঘিরে রেখেছিল, যেমন তাহের উদ্দিন ঠাকুর, তাকে জানিয়েছিলেন, ‘গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডন থেকে এসে গুজব ছড়াচ্ছেন’।

ঢাকায় একটি সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কার কথা ভারতের তৎকালীন হাইকমিশনার সমর সেনকেও জানিয়েছিলাম। তিনি ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর লেখা তার ‘মিডনাইটস ম্যাসাকার’ নামে বইতে লিখেছেন, ‘গাফ্ফার চৌধুরী নামে ঢাকার এক সাংবাদিক আমাকে মুজিব-সরকারবিরোধী এক চক্রান্তের কথা জানিয়েছিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দিল্লির সাউথ ব্লক থেকে তা ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পৌঁছানো হয়নি, সে কথা পরে জানতে পারি।’

অতীতের কথা থাক। যা হওয়ার তো হয়ে গেছে। এবার ঢাকায় গিয়ে বাতাসে বারুদের গন্ধ পাইনি। কিন্তু যা পেয়েছি তা আরও ভয়ংকর। ফেসবুকের মাধ্যমে নির্বিচার মিথ্যা ও গুজব প্রচার এবং আওয়ামী নেতা, মন্ত্রী ও এমপিদের অধিকাংশের মধ্যে উদাসীনতা এবং আগামী নির্বাচনে জেতা সম্পর্কে এক ধরনের আত্মপ্রসাদই বিরাজ করছে।

তাদের ধারণা, বিএনপি-জামায়াতের এখন কোমর ভেঙে গেছে। তারা যত চেষ্টাই করুক, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তাই তারা বাইরের শক্তির কাছে কেবল আবেদন-নিবেদন করে বেড়াচ্ছেন।

শত্রুর দুর্বলতাকে যে ছোট করে দেখতে নেই এবং তার ক্ষমতাকে উপেক্ষা করতে নেই এই সত্যটা আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর মন্ত্রী ও এমপি ভুলে গেছেন এবং তারা নিজেদের যথেচ্ছ লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা শেখ হাসিনার সব অর্জনকে ব্যর্থ করে দিচ্ছেন। ফলে শত্রুপক্ষের দ্বারা গুজব ছড়ানো সহজ হচ্ছে। তারা তিলকে তাল করতে পারছেন। হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় তারা প্রচার করতে পেরেছেন- ঢাকায় কয়েক হাজার হেফাজতি ও মাদ্রাসাছাত্রকে হত্যা করে লাশ ভারতে পাচার করা হয়েছে।

এবার ছাত্র আন্দোলনের সময় হাসিনা-সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতি সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ও সহানুভূতির পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও দেশের বাইরে শক্তিশালী প্রচার ব্যবস্থার দ্বারা বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো হয়েছে। বিদেশি প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকায় তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফলাও করে প্রচার চলছে। দেশের এক অভিনয়শিল্পীকে দিয়েও বলানো হয়েছে, ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রী ধর্ষণ, চোখ উপড়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে।

দু’দিন পরই অবশ্য জানা যায় এগুলো জঘন্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। কিন্তু ততদিনে বাংলাদেশের এবং তার বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তির যতটা ক্ষতি হওয়া দরকার তা হয়ে গেছে। বিশ্বের ২৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, তাদের মধ্যে ১১ জনই নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব, তারা বাংলাদেশে শহিদুল আলম নামের এক আলোকচিত্রশিল্পীকে গ্রেফতার, তার ওপর পুলিশের শারীরিক অত্যাচার-নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন এবং এমন কথাও বলেছেন, বাংলাদেশে মতামত প্রকাশের ন্যূনতম স্বাধীনতাও নেই।

শহিদুল আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে একথা সত্য। কিন্তু তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এই অতিরঞ্জিত খবরটা নোবেলজয়ীদের কানে রাতারাতি পৌঁছালো কে? শহিদুল আলমকে ‘বিশ্বখ্যাত ব্যক্তি’ বলে ফাঁপানো-ফুলানো হয়েছে। তিনি তা নন। তিনি একজন কৃতী আলোকচিত্রশিল্পী মাত্র।

অবশ্য তাতেও তার ওপর অত্যাচার কারও কাম্য নয়। কিন্তু যে অত্যাচার হয়নি, তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে ‘নির্মম সত্য’ হিসেবে বাজারে ছড়াল কে? এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার বিশপ টিটু, যিনি শহিদুল আলমের নামও জানতেন না (আমার ধারণা), ভারতের শাবানা আজমি কেমন করে রাতারাতি শহিদুল আলমকে চিনে ফেললেন এবং তাকে অত্যাচারের খবর তাদের কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রতিবাদ জানিয়ে ফেললেন? এটা তো বিশ্বের অনেক গণনির্যাতনের ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখিনি।

আমার সন্দেহপ্রবণ মন, শহিদুল আলমের ওপর কথিত নির্যাতনের প্রতিবাদকারী নোবেলজয়ীদের নামের তালিকার দিকে তাকাতেই দেখি, তাতে বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও রয়েছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছে, ডালমে কুছ কালা হ্যায়।

মেঘ ছাড়া বৃষ্টি হয় না, ড. ইউনূস ছাড়া এতজন নোবেলজয়ী কী করে হঠাৎ শহিদুল আলমকে চিনে ফেললেন এবং তার মুক্তির দাবিতে রাতারাতি বিবৃতিতে সই দিয়ে ফেললেন, তা এক রহস্যের কথা। পেছন থেকে তাদের ব্রিফ করলেন কে?

বাংলাদেশ সরকারের উচিত, বিদেশে বাংলাদেশবিরোধী যে শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা অভিযান চলছে, তার কুশীলবদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া এবং তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। হাসিনা-সরকারের কোনো কাউন্টার-প্রোপাগান্ডা সেল আছে কিনা আমি জানি না।

থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই। কেবল প্রচার-প্রোপাগান্ডা দ্বারা শহিদুল আলমকে রাতারাতি বিশ্ব বিখ্যাত করে তোলা হয়েছে, কিন্তু তার আসল পরিচয় সরকারের জানা থাকা সত্ত্বেও তা আগে প্রকাশ করা হয়নি বা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তারা নেননি। এখন তাকে গ্রেফতারের পর নির্যাতনের খবর বিশ্বময় ছড়িয়ে যাওয়ার পর এসব তথ্য বিশ্বাস করবে কে?

শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনের সময় তিনি মিথ্যা খবর ছড়িয়েছেন। তা শুধু সরকারবিরোধী প্রচারণা নয়, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণাও! এই বক্তব্য রেখেছেন তিনি আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে।

এখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ পাচ্ছে- তিনি বহুদিন ধরে একই কাজে লিপ্ত। এই অভিযোগগুলো হল প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি কোনো অনুমোদন ছাড়াই পাঠশালা নামে প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক, ডিপ্লোমার শর্ট কোর্স-লং কোর্স সার্টিফিকেট দিয়ে কোটি কোটি টাকা নিচ্ছেন।

কিছুদিন আগে বর্তমান সরকারের আমলেই তিনি অনুমোদন নিয়েছেন পাঠশালার। এই পাঠশালার নামে অনুদান নিয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে তা স্থানান্তর করেছেন।

শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক প্রমাণ করার জন্য নকল ছবি তৈরি করেছেন। বন্ধু ডেভিড বার্গম্যানের (ড. কামাল হোসেনের জামাতা) সহায়তায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ করেছেন। এ জন্য তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে তিনি নাস্তিকদের আন্দোলন বলে প্রচারণার কাজে যুক্ত ছিলেন। চীনের সঙ্গে হাসিনা-সরকারের বিবাদ বাধানোর জন্য ২০০৯ সালে একবার, এর পরে আরেকবার চীনবিরোধী চিত্র ও পোস্টার প্রদর্শনী করেন। চীনা দূতাবাসের প্রবল আপত্তির কারণে বাংলাদেশ সরকার প্রদর্শনী বন্ধ করে। মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় সাড়ে তিন হাজার আলেম ও মাদ্রাসাছাত্র হত্যার মিথ্যা খবর রটানোর কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এই গুণধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার নিষ্ক্রিয় ছিল কেন? আজ যখন শিশুসাপ বড় হয়ে বড় রকমের ছোবল দিয়েছে তখন তাদের ঘুম ভেঙেছে।

সরকারের বিরুদ্ধে এই যে অব্যাহত প্রচারণা, তার মোকাবেলা না করার ব্যাপারে সতর্কতার অভাবেই একটি সাধারণ নির্বাচনের আগে এই সরকারকে একটি গণবিরোধী স্বৈরাচারী সরকার প্রমাণ করার জন্য প্রতিপক্ষ সুযোগ পেয়েছে এবং ’৭৫-এর আগে প্রচারণার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু-সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের জন্য যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, বর্তমানে হাসিনা-সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে একই ধরনের প্রচারণা দ্বারা একই পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে।

আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক নন। তারা বিএনপিকেই একমাত্র প্রতিপক্ষ মনে করে অনবরত খালেদা জিয়া ও বিএনপির সমালোচনা করে চলেছেন। কিন্তু লক্ষ করছেন না বিএনপির চেয়েও শক্তিশালী এটি ছদ্মবেশী শত্রুপক্ষ তাদের আছে।

এই শত্রুপক্ষ হল একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ, যার অন্যতম নেতা হলেন ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস প্রমুখ। আন্দোলন দ্বারা হাসিনা-সরকারকে কুপোকাৎ করা যাবে না জেনে তারা প্রচারণা দ্বারা শক্তিশালী বিশ্বজনমত গঠন করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান।

এই প্রচারণা তারা চালাচ্ছেন বিপুল অর্থ ব্যয়ে। তাদের সহযোগী বিএনপি-জামায়াতও। আন্তর্জাতিক মদদ এবং অর্থ সাহায্য রয়েছে এর পেছনে। লর্ড কার্লাইলের মতো কয়েকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ও রাজনীতিক তাদের লবিস্ট।

কিছু পশ্চিমা পাবলিক রিলেশন্স সংস্থা আছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে তাদের ভাড়া করলে তারা তাদের মক্কেলের লবিস্ট হয়ে প্রচারণা চালান। টাইমস, গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার মতো কাগজগুলোতে পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিদ্যমান।

গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে হাসিনা-সরকারের সঙ্গে বিরোধের সময় ড. ইউনূস এই সংস্থাটিকে তার লবিস্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-আদালতের বিরুদ্ধে বিশ্বময় প্রচারণার কাজে জামায়াত ও বিএনপি এই পিআর কোম্পানিকে ব্যবহার করে। তারেক রহমানও এই পিআর কোম্পানির মক্কেল।

খবর নিলে হয়তো জানা যাবে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দুনিয়ায় মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত খবর প্রচারের কাজে, এমনকি ১১ জন নোবেল লরিয়েটের বিবৃতির খসড়া তৈরি এবং তাতে তাদের সই সংগ্রহের কাজেও এই আন্তর্জাতিক পিআর কোম্পানির ভূমিকা রয়েছে।

আমার ধারণা, ধারণাটি সঠিক কিনা জানি না, কোম্পানিটির এই ভূমিকার পেছনেও রয়েছে আমাদের নোবেলজয়ীর হাত। সেই হাতের পেছনে তার বন্ধু হিলারি ক্লিনটনেরও মদদ আছে কিনা আমি জানি না।

লেখা দীর্ঘ করতে চাই না, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সত্যিই স্বস্তিদায়ক নয়। আমি আওয়ামী লীগকে বিদেশে বসে সতর্ক করতে পারি, সক্রিয় করতে পারি না। শেখ হাসিনার এখন অনেক উপদেষ্টা। এই লেখাটি তারা তাচ্ছিল্যসহকারে পড়লেও কিছুটা লাভ হতে পারে।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর। লন্ডন ২৬ আগস্ট, রবিবার, ২০১৮ ইং