তিন দশকে চামড়ার দাম সবচেয়ে কম


বিশেষ প্রতিবেদক : কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামে ধস নেমেছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কম টাকায় চামড়া কেনা-বেচা হচ্ছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন দামে কেনা হচ্ছে পশুর চামড়া। ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর আগে কখনও এত কম দামে চামড়া কিনতে পারেননি তারা। ট্যানারি মালিকরাও বলছেন, গত তিন দশকে চামড়ার দাম এত কমেনি।
ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ  বলেন, ‘চামড়ার দাম এত কম এর আগে কখনও হয়নি। বিগত তিন দশক পর এখন চামড়ার দাম সর্বনিম্ন।’ এ অবস্থার জন্য তিনি রফতানি পরিস্থিতিতে দায়ী করেন।
সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘একদিকে এখান থেকে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে চীনের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে চামড়ার আর্ন্তজাতিক বাজারও ভালো নয়।’
জানা গেছে, ঢাকায় কোরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া লবণ দেওয়ার পরে ৯০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের। তবে রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, এবার ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা গড়ে ৫০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চামড়া কেনা-বেচা হয়েছে গড়ে ৪০০ টাকায়।
রাজধানীর ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের ১২ থেকে ২৫ বর্গফুটের প্রতিটি চামড়া ৭০০ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে কিনতে পরামর্শ দিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। আর ঢাকার বাইরে ১২ থেকে ২৫ বর্গফুটের চামড়া ৩০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের এক হাজার ২০০ টাকায় যে চামড়া কিনতে হয়েছে, এবারের ঈদে তার চেয়ে বড় ও ভালো মানের চামড়া পাওয়া গেছে ৭০০ টাকায়।
দেড় লাখ টাকায় কেনা কোরবানির গরুর চামড়া বেচা হয়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। আর এক লাখ টাকা দিয়ে কেনা গরুর চামড়া ৫০০ টাকাতেও বেচতে দেখা গেছে।
রাজধানীর মানিক নগর এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রোক বলেন, ‘গড়ে সাড়ে ৫০০ টাকায় আমরা চামড়া কিনছি।’ তিনি ২৫৬টি পশুর চামড়া কিনে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে নিয়ে যান।
পাবনার ভাঙ্গুড়ার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন  বলেন, ‘ঢাকার বাইরেও চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। এখানেও সবচেয়ে ভালো চামড়া ৫০০ টাকারও কম দামে কেনা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘৩০ বছর আগে ১৯৮৯ সালে কোরবানির ঈদে পশুর মালিকরা ৭০০ টাকায় চামড়া বেচেছেন। এবার সেই মানের চামড়া কেনা সম্ভব হয়েছে ৫০০ টাকারও কম দামে।’
২০১৩ সালে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। এ বছর সেই চামড়া সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে দাম ধরা হয়েছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদে সবচেয়ে ভালো চামড়া সংগ্রহ করা গেছে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। তারা বেশির ভাগ চামড়া কিনেছে ৫০০ টাকারও কম দামে।
সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী, ট্যানারি ব্যবসায়ীরা এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় এবং ঢাকার বাইরে এর দাম হবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকায় সংগ্রহ করবেন ব্যবসায়ীরা।
গত বছর প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা ও লবণজাত চামড়ার দাম ঢাকায় ৫০-৫৫ টাকা ধরা হয়। ঢাকার বাইরে সারাদেশে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ৪০-৪৫ টাকা। এছাড়া মহিষের প্রতি বর্গফুট চামড়া ৪০ টাকা, খাসির ২০-২২ টাকা এবং ছাগল ও ভেড়ার ১৫-১৭ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়।
জানা গেছে, পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা লবণসহ সব ধরনের খরচ মেটানোর পর কাঁচা চামড়া আড়তদারদের কাছে পৌঁছান। ট্যানারিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই চামড়া মূলত আড়তদারদের কাছে সংরক্ষিত থাকে। আড়তদার প্রতিপিস ৩৫ টাকা লাভ রেখে ট্যানারিতে চামড়া পৌঁছান। যদিও ট্যানারি পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচও বহন করতে হয় পাইকারি ব্যবসায়ীদের। ট্যানারির মালিকরা সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য বানান। এসব পণ্য বিদেশেও রফতানি করা হয়।
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরে সারাদেশ থেকে কমবেশি ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। এর অর্ধেকের বেশি আসে কোরবানির ঈদের সময়।
প্রসঙ্গত, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কেনেন। কয়েক হাজার পাইকারি ব্যবসায়ী এই চামড়া তাদের কাছ থেকে কিনে আড়ৎদারদের কাছে জমা রাখেন।