দেওয়া হলো না ছবিগুলো

নিউজ ডেস্ক: দেওয়া হলো না ছবিগুলো। না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। আর কিছুই চাওয়ার রইল না তার। গোলাম সারওয়ার ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। একই সঙ্গে তার সম্পাদিত ‘দৈনিক সমকাল’ পত্রিকার একজন সাবেক সহকর্মী হিসেবে বলতে চাই তার মৃত্যুতে ‘সমকাল’ এর ক্ষতি অপূরণীয়।

গত ২৫ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্মদিন উপলক্ষে সমকাল সম্পাদক গোলাম সরওয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে স্বভাবসিদ্ধভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ? অর্থমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন। আমি তাদের ক্যামেরা বন্দি করার পর বলেছিলেন, ‘ছবিগুলো আমাকে দিও।’ আমি ছবিগুলো প্রিন্ট করেও নানা কারণে আর দেওয়া হয়নি। আর কোনদিন দেওয়া হবে না। তিনি চলে গেছেন সব চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে।

হ্যাঁ, আমার সাবেক সম্পাদক, শিক্ষক গোলাম সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮২ সাল থেকে। এরপর দীর্ঘদিন আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। আমার মাস্টার্স ডিগ্রী পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এর কিছুদিন পরই মির্জাপুর থেকে আমার বড়ভাই খন্দকার আল-মহসীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘পাক্ষিক বংশাই’ এর প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাই। মির্জাপুরের তৎকালীন সহকারী কমিশনার ফরহাদ রহমানের পূর্বপরিচিতি হিসেবে মঞ্জু ভাই প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে যেতে রাজি হয়েছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে পুরো অনুষ্ঠানের একটি সংবাদ লেখার দায়িত্ব পরে আমার ওপর। কারণ ওই সময় আমি ‘দৈনিক খবর’ এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম। মঞ্জু ভাইয়ের সঙ্গে ফরহাদ ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ছিলেন। মঞ্জু ভাই আমাকে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে ঢাকা চলো আমার অফিসে বসে সংবাদটা লিখে দিয়ে এসো তাহলে কালকের পত্রিকায় সংবাদটা ছাপা হবে।

মঞ্জু ভাইয়ের গাড়িতেই ইত্তেফাক অফিসে পৌঁছি যখন তখন রাত ৯টা বেজে গেছে। মঞ্জু ভাই বললেন, ‘তুমি সংবাদটা লিখে আমাদের সারওয়ার সাহেবকে আমার কথা বলে দিও। আমি উনাকে বলে দিচ্ছি। আর তুমি যদি ইত্তেফাকে কাজ করতে আগ্রহী হও সেটাও ওনাকে বলো।’

ইত্তেফাকের নিউজ রুমের এক কোনে বসে আমি সংবাদটি খুব দ্রুত লিখে সারওয়ার ভাইয়ের টেবিলের সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আছি। তিনি তখন সম্ভবত সেদিনের লিড নিউজটি দেখছিলেন। প্রায় আধা ঘন্টা পর পানি খাওয়ার জন্য গ্লাসটি তুলতে গিয়ে আমাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, কি চাই ? আমি মঞ্জু ভাইয়ের কথা বললাম তিনি একটি সংবাদ আপনাকে দেওয়ার কথা বলেছেন। সেটা নিয়ে এসেছি। আচ্ছা দাও বলে আমার হাত থেকে লেখাটা নিয়ে টেবিলে রাখলেন। বললাম আমি কি চলে যাবো ? মুখটা তুলে বাঁকা চোখে তাকালেন তারপর লেখাটা পড়তে শুরু করলেন।

হঠাৎ প্রচন্ড রেগে সবগুলো কাগজ আমার মুখে ছুঁড়ে দিলেন। কি লিখেছ এগুলো ? ভাল করে লেখ ? তুমি সংবাদ লিখছ না প্রবন্ধ ? এটা বলেই আবার এডিটে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমি আধা ঘন্টার মধ্যে ২৫০ শব্দের একটি নিউজ হাতে লিখে তার হাতে দিলাম। এবার তার ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো হাসি দেখলাম। বললেন, এইতো হয়েছে। তা হলে শুধু শুধু বকাটা খেলে কেন। এ কথাগুলো আজো আমার কানে বাজে।

শিক্ষকতা পেশার পাশপাশি সাংবাদিকতাও চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা পেশাটাই স্থায়ী পেশা হয়ে যায়। শফিক রেহমানের সম্পাদনায় ‘যায় যায় দিন প্রতিদিন’, মিজানুর রহমান মিজান সম্পাদিত ‘দৈনিক খবর’ ২০০১ সালে মতিউর রহমান চৌধুরী সম্পাদিত ‘দৈনিক মানবজমিন’। এভাবে এরপর ২৩ বছর কেটে যায়।

‘দৈনিক সমকাল’ এর অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের হাত ধওে ‘দৈনিক সমকাল’ পত্রিকায় কাজ শুরু করি। এখানে টানা ৯ বছর সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে আমার জীবনের অন্যতম স্বপ্ন পূরণ হয়। তার কাছে থেকে দেখেছি সাংবাদিক এবং সম্পাদক হিসেবে তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। প্রয়োজন ছাড়া সরওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা খুব একটা হয়নি। তবে মাঝে মধ্যে যে ডাক পড়তো না তা নয়। যখনই ডাক পড়তো তখনই সেই ১৯৮২ সালের স্মৃতি মনে পড়ে যেতো আর গলাটা শুকিয়ে আসতো। তবে কোনদিন গালমন্দ শুনতে হয়নি। পেয়েছি উপদেশ, রিপোর্টিং আরো ভাল করা যায় তার দিক নির্দেশনা।

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে পড়ার কারণে অফিস যাওয়া আর প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহ করা নিয়মিত হচ্ছিল না। ভাবছিলাম চাকরিটা বুঝি হাত ছাড়া হচ্ছে। এর মধ্যে একদিন গভীর রাতে ফোন এলো। নাম্বারটা দেখেই গলা শুকিয়ে গেল, সারওয়ার ভাই! কাঁপা গলায় উত্তর দিলাম। জিঞ্জেস করলেন কোন সমস্যায় পড় নাইতো ? গলাটা এমন মনে হচ্ছে কেন? রাতে খেয়েছ? একটানা প্রশ্ন। শাহবাগের সব ঘটনা শুনলেন। তার পর বললেন, সাবধানে থেকো। আমিতো আকাশ থেকে পরলাম।

এরপর হঠাৎ একবন্ধুর পরামর্শে শারীরিক সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললেন আপনার হার্টে দুইটা ব্লক , একটা ৯৯ শতাংশ অপরটা ৯৮ শতাংশ। দ্রুত অপারেশন করতে হবে। ভর্তি হলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশেই শাহবাগ শ্লোগানে শ্লোগানে মূখরিত হচ্ছে আর আমি হাসপাতালে। আমাকে দেখতে অর্থমন্ত্রীসহ অনেকেই এলেন। অপারেশনের পর একদিন সরওয়ার ভাই হাজির। আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি উঠে বসতে গেলে তিনি আমাকে জোর করে শুইয়ে দিলেন। বললেন, ‘শরীরের প্রতি নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে হয়।’ আজ জিঞ্জেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, সরওয়ার ভাই আপনি কি নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে পেরেছিলেন? পারলে আজ আপনাকে হারাতে হতো না।

গোলাম সারওয়ার ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশালের বানারীপাড়ার এক সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল দারুণ আগ্রহ। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। কিছুদিন দৈনিক পয়গাম, পরে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক সংবাদে বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে নিজ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন গোলাম সারওয়ার। ১৯৭৩ সালে তিনি ইত্তেফাকে যুক্ত হয়ে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ওই পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে দুই দশক বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশ হয় দৈনিক যুগান্তর। ২০০৫ সালে গোলাম সারওয়ারের সম্পাদনায় প্রকাশ হয় ‘ দৈনিক সমকাল’।

২০১৩ সালে সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি। গোলাম সারওয়ার সেন্সর বোর্ডের আপিল বিভাগের সদস্য এবং দেশের প্রতিনিধিত্বশীল সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর সভাপতির পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

গোলাম সারওয়ারকে ‘সাংবাদিকদের শিক্ষক’ হিসেবে অনেকেই অভিহিত করেন। তার হাতে গড়া অনেক সাংবাদিক এখন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। লেখালেখির জগতেও তার রয়েছে যথেষ্ট সুনাম। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থে’র মধ্যে রয়েছে ছড়াগ্রন্থ’ ‘রঙিন বেলুন’, প্রবন্ধ সংকলন ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’, ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’ ইত্যাদি। এছাড়াও দেশে বিভিন্ন ক্রান্তিকালে শক্ত হাতে কলম ধরেছেন। প্রতিবাদ করেছেন অন্যায়ের। তার মৃত্যুতে আমরা একজন অভিভাবকে হারালাম। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।