সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই প্রয়োজন মায়ের দুধ

মুহাম্মদ ফয়সুল আলম: কন্যা, জায়া, জননী হলো নারীর তিনটি রূপ। তিনটি পর্যায়। ‘মা’ শব্দটি জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকেরই আবেগের একটি জায়গা, তাতে কোনো দ্বিমত নেই। ‘মা’-ই স্নেহ, ভালোবাসা, মমতার আধার। এই মায়ের মাতৃত্বরূপ সৌন্দর্যের পূর্ণতায় পরিপূর্ণ। কথায় আছে ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’।

সন্তানের প্রতি মায়ের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মা শুধু গর্ভধারণই করেন না, আমৃত্যু সন্তানের পাশে থাকে তার অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধন। এ বন্ধনের মূলমন্ত্র হলো ‘মায়ের দুধ’। সন্তান ভ‚মিষ্ট হওয়ার পরপরই মায়ের স্তন থেকে নিঃসৃত পুষ্টিকর তরল খাদ্যই শিশুর আদর্শ খাদ্য। এর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য ধর্মে মাকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়েছে।

চয়নিকা চৌধুরী চাকুরিজীবী। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। কিছুদিন হলো মা হয়েছেন, কন্যা সন্তান হয়েছে। নাম সাইমা। সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসার কমতি নেই। কিন্তু সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। মনে করেন এটা একটা বাড়তি ঝামেলা। সারাদিন থাকতে হয় অফিসে। বাসায় এসে মেয়েকে বুকের দুধ দেওয়াকে বাড়তি কাজ মনে করেন। তার সন্তানকে কৌটার দুধ খাওয়াতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি।

তিন বছর বয়সি আদুরি সারাবছরই ডায়রিয়া, বদহজম, জ্বরসহ নানারকম রোগে ভোগে কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে মৃতপ্রায় যেন। বাল্যবিবাহের শিকার চরম অভাবী সংসারে আদুরির কিশোরী মা পুষ্টিহীনতায় নিজেই শরীরের স্বাভাবিকতা হারিয়েছে। সেখানে একবছরের ব্যবধানে পরপর জন্ম দিয়েছেন অপুষ্ট দুটি শিশু। চারবছর বয়সি বড়ো ছেলেটি জন্মের পর কয়েকমাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধপানের সুযোগ পেলেও আদুরির ভাগ্যে জোটেনি। রোগে-শোকে অসুস্থ আমেনার পুষ্টিহীনতার কারণে জন্মের পর আদুরি বুকের দুধ পায়নি। ওকে তাই ৪/৫ মাস পর্যন্ত একটানা খাওয়াতে হয়েছে ভাতের মাড়, গরুর দুধ ইত্যাদি। একনাগাড়ে ৬ মাস পর্যন্ত বুকের দুধ দুরের কথা, উপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় খাবারও সে পায়নি।

উপরের দুটি গল্প থেকে বোঝা যায় সাইমা ও আদুরির জন্য মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মায়ের দুধের বিকল্প নেই। উন্নত জাতির জন্য চাই সুস্থ মা। একমাত্র সুস্থ মায়েরাই পারেন উপহার দিতে সুস্থ সন্তান। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের কর্ণধার। মাতৃদুগ্ধ সন্তানের দৈহিক সুস্থতা, পুষ্টি ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিবছর পৃথিবীর ১৭০টি দেশে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোকে উৎসাহ দিতে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে এই কর্মসূচি। বুকের দুধ খাওয়ানোর ওপর জোর দিতে ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিও এইচ ও) এবং ইউনিসেফের যৌথ ঘোষণাকে সফল করতেই এই কর্মসূচি। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে মায়ের দুধের প্রতি প্রাধান্য বা গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে এর বিকল্প পণ্যের প্রচার বন্ধে রেডিও-টেলিভিশন, সংবাদপত্র ইত্যাদি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়।

মায়ের দুধ হচ্ছে শিশুর উৎকৃষ্ট খাবার। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ মায়ের দ্রুত আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। তাই মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘দি ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং একশন’- এর উদ্যোগ এবং ইউনিসেফের সমর্থনে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ১-৭ আগস্ট পালিত হয়ে আসছে ‘মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’। দিবসটি উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Breastfeeding : Foundation of life’, “মায়ের দুধ পান: সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ”। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জাতীয়ভাবে এই সপ্তাহ পালিত হয়। নবজাতক ও শিশুদের শারীরিক সংকট থেকে মুক্ত করে তাদের বাঁচিয়ে তোলা এবং তাদের স্বাস্থ্য ও শরীরের উন্নতির জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতেই এই কর্মসূচি।

দু’ বছর পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রথা চলে এলেও কোনো কোনো মা তার শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে অনীহা প্রদর্শন এবং আপত্তি করে থাকেন। তাদের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার অজুহাতে। আবার কেউ কেউ আধুনিকতা হিসেবেও বুকের দুধের বদলে বাজারের প্যাকেটজাত শিশুখাদ্য খাওয়াতে আগ্রহী। এর ফলে শিশুদের মর্মান্তিক ক্ষতি হচ্ছে। শারীরিক সংকটে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়ে। এরমধ্যে আরো বেশি সমস্যায় পড়ে নবজাতক। এমনকি ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়ায় তাদের মৃত্যুও হতে পারে। শারীরিক সংকটে মায়ের দুধই খাওয়ানো উচিত। এ সময়ে মায়ের দুধের বিকল্প কিছু খাওয়ানো উচিত নয়।

উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশের মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে সচেতন বেশি। ডব্লিওএইচও (WHO)’র বিভিন্ন দেশের সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশ এ ব্যাপারে সচেতন। সরকারিভাবে সপ্তাহটি পালন করার ফলে মায়ের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে অনেক তথ্য জনগণ জানতে পারেন। এতে মায়ের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা আগের চেয়ে বাড়ছে। অন্তত ৯০০০টি গবেষণাপত্রের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্তন্যদানকারী মা প্রসবপরবর্তী বিষন্নতায় কম ভোগেন। স্তন্যদানকালে অক্সিটোসিন নামক একটি হরমোনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যায় যেটি মানসিক রিল্যাক্সেশন (প্রশান্তি) আনে। স্তন্যদানকারী মায়ের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা ৫০ শতাংশ যেখানে অন্য মায়েদের মধ্যে এর মাত্রা ৮ শতাংশ মাত্র। অন্যদিকে স্তন্যদানকারী মায়ের স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সার হওয়ার আশংকাও কম।

মায়ের দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ, চর্বি, লবণ, খনিজ পদার্থ, এনজাইম আয়রণ থাকে। প্রচুর পানি থাকে। তাই গ্রীষ্মকালেও শিশুকে পানিয় বা অতিরিক্ত ভিটামিন খাওয়াতে হয় না। ফলে শিশুদের রক্তশূণ্যতা হয় না। মায়ের দুধে কোনো প্রকার রোগজীবাণু থাকে না, তাই এই দুধ খেয়ে শিশু অসুস্থ হয় না। বরং ডায়রিয়া হলে ডাক্তাররা মায়ের বুকের দুধ বেশি করে বার বার খাওয়াতে বলেন। মায়ের দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপকরণ প্রচুর পরিমাণে থাকে। মায়ের দুধ খেলে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার জন্য একরকম এন্টিবডি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুমৃত্যুরোধে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। জন্মের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা গেলে নবজাতকের মৃত্যুর হার শতকরা ৩১ ভাগ কমে যায়। বুকের দুধ বোতলে করে ফ্রিজে ২৪ ঘণ্টা এবং ফ্রিজের বাইরে ৬ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা যায়। এতে দুধের গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হয় না।

বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) এর কর্মসূচির পুষ্টিবিদরা মনে করেন, শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে নিজেদের সচেতনতা বাড়ানোর অপরিহার্য। এটি সম্পূর্ণ মায়ের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। জন্ম থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর পেট কখনোই মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু নিতে প্রস্তুত থাকে না, এমনকি এক ফোঁটা পানিও না। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে মায়ের দুধের ভ‚মিকা অনেক বেশি। জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাসে মা সন্তানকে অন্য কোনো খাবার না দিয়ে যদি শুধু বুকের দুধ দেন তাতে তাঁর অন্য কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।

গত পাঁচ দশকে ইউএসএআইডি (USAID) সারা বিশ্বে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুকে মায়ের দুধ ও সম্পূরক খাদ্য খাওয়ানো নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে যা কৃষি, পরিবার পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্যোগ সহায়তা এবং অন্যান্য বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রকল্পেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশেও এ কার্যক্রম চলছে। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছি। প্রতি জেলায় একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে।

বর্তমানে পুরুষের পাশপাশি নারীরাও বিভিন্ন কর্মসংস্থানে নিজেদের নিয়োজিত করছেন। বর্তমানে গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের শতকরা ৮৫ ভাগই নারী। একজন কর্মীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্যে সর্বোপরি, দেশের উন্নয়ন প্রবৃদ্ধিতে নারী কর্মীদের গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে প্রসবপরবর্তী প্রতিটি ধাপে আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা জরুরি। সেজন্য সরকার ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান করাসহ পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রেও মায়ের শিশুকে দুধ খাওয়ানোর অনুক‚ল পরিবেশ রাখার বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

শিশুর নিরাপদ জন্মগ্রহণ ও বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০০৯, ২০১০, ২০১১ ও ২০১৪ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রতিটি অফিস, আদালত, শপিংমল, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতালে মাতৃদুগ্ধ পানের সু-ব্যবস্থা, পূর্বে তৈরিকৃত ব্রেস্টফিডিং কর্নারগুলো সচল করা এবং নতুন কর্নার স্থাপনের ব্যবস্থা করাসহ মাতৃ ও শিশু পুষ্টি উন্নয়নে যুগান্তকারী বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলি মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে পারে। ধর্মীয় নেতা, স্কুল কলেজের শিক্ষক মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে শিশুদের সচেতন করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আরো অধিক সচেতন হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সর্বোপরি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারে।

পিআইডি প্রবন্ধ