চলচ্চিত্রের সেই ফেরিওয়ালা

নিউজ ডেস্ক: তারেক মাসুদ… একজন সার্থক চলচ্চিত্রকার। চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই যিনি ক্ষান্ত হননি। দর্শক যখন নানা কারণে সিনেমা হলবিমুখ তখন তিনি তার সৃষ্টি দর্শকের দোড়গোরায় পৌঁছে দিতে চলচ্চিত্রের ঝাঁপি কাঁধে বয়ে নিয়ে ছুটেছেন দেশের প্রথম থেকে শেষ প্রান্তে। চলচ্চিত্রের ফ্রেমে বেঁধে দেওয়া জীবনবোধকে নিজ দায়িত্ব আর পরিশ্রমে তুলে ধরেছেন দর্শকের সামনে। আর এ কাজটি সফল করতে বনে গিয়েছিলেন রীতিমতো চলচ্চিত্রের ফেরিওয়ালা। এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে এই প্রথম।

এই উদ্যোগে যখন তিনি রীতিমতো সফলতার দ্বারে পৌঁছে গিয়েছেন, বাংলা চলচ্চিত্র যখন নতুন এক আঙ্গিক খুঁজে পেতে শুরু করল তখনই নিষ্ঠুর নিয়তি তাকে এই ধরাধাম থেকে পরপারে সরিয়ে দিল। ‘কাগজের ফুল’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে লোকেশন দেখে ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তিনি ২০১১ সালের এদিনে।

তার অভাবনীয় সৃষ্টিকর্মের জন্য দেশের মানুষ আজও তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তারেক মাসুদকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। এটি ছিল জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড-এর পরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল। মুক্তির গান ‘ফিল্ম সাউথ এশিয়া’ (১৯৯৭) থেকে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। এরপর ভিডিও চলচ্চিত্র ‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯) নির্মাণ করেন। মুক্তির কথায় মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ভাষ্য ফুটে উঠে। তারেক মাসুদ ছিলেন বাংলাদেশের একজন স্বাতন্ত্রিক চলচ্চিত্রকার। তিনি ছিলেন স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রের জাত কারিগর। তার নির্মাণ ও ভাবনায় ভিন্নতর এক শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ (২০০২) নির্মাণের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।

এ ছবিটি ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেস্কি আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারের আওতায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশে নির্মিত সবচেয়ে বেশি আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। তার উল্লেখযোগ্য অন্য চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্তর্যাত্রা (২০০৬)-তে অভিবাসী বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চেষ্টা, ‘নরসুন্দর’-এ (২০০৯) মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের বিনির্মাণ, সর্বশেষ তার ‘রানওয়ে’ ছবিটি বর্তমান সময়ের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যা দেখলে মনে হবে তারেক মাসুদ একজন ভবিষ্যত্দ্রষ্টা।

জঙ্গিবাদ যেভাবে বাংলাদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, ঠিক এ বিষয়টি নিয়েই অনেক আগে তিনি তৈরি করেছিলেন চলচ্চিত্রটি। তারেক মাসুদের উল্লেখযোগ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলো হচ্ছে- ‘সোনার বেড়ি’, ‘একুশে’ ও ‘নরসুন্দর’। এ ছবিগুলো গতানুগতিকতা ধারাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিং স্পট নির্বাচন করে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্রের এই অবিসংবাদিত ফেরিওয়ালা।

২০১২ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’প্রাপ্ত নির্মাতা তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সব ধরনের অন্ধতা আর যুক্তিহীনতার বিরোধিতা। যে স্বল্পসংখ্যক ছবি তিনি নির্মাণ করেছেন, তা আমাদের দেশের চিন্তাশীল চলচ্চিত্রের ধারাকে বক্তব্য প্রকাশ এবং ভাবনা আর নির্মাণশৈলীর গভীরতার কারণে সমৃদ্ধ করেছে সাহসিকতার সঙ্গে।

প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী নবীন চলচ্চিত্রকারদের জন্য তারেক মাসুদের কাজ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। তার শূন্যতা কখনই পূরণ হবে না। যে ধরনের চলচ্চিত্র তারেক মাসুদ তৈরি করেছেন, সেই প্রগতিশীল মন ও মননের চিন্তাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র দিয়ে নিঃসন্দেহে আগামীর বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।