সড়কে হত্যা প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড

নিউজ ডেস্ক: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও উত্তেজনার মধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বেপরোয়া গাড়িতে কারও মৃত্যু হলে চালকের পাঁচ বছর জেল হবে। কেউ গুরুতর আহত হলে একই সাজা ভোগ করতে হবে। তবে পুলিশের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় চালক উদ্দেশ্যমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। এই আইনের খসড়ায় জামিনের কোনো সুযোগ নেই। ফিটনেসবিহীন ও বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোসহ সড়কে অন্যান্য নিয়ম ভঙ্গের সাজাও বেড়েছে নতুন আইনে।

এসব বিধান রেখে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভায় ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এর খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়াটি সংসদে পাস হলে আইন কার্যকর হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির একটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে চালককে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।

বিদ্যমান আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড। গত বছরের ২৭ মার্চ সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ঝুলে ছিল। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেড় বছর পর এটি গতি পায়। গতকাল মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। চালককে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, হতাহতদের ক্ষতিপূরণ বাড়ানো, বীমা সুবিধা চালুর সুপারিশ থাকলেও মৃত্যুর ঘটনায় দুই বছর সাজা বাড়ানো হলেও একে যথেষ্ট মনে করছেন না কেউ কেউ।

অন্যদিকে সাজা বাড়ানোর প্রতিবাদ’ করে গতকাল তেজগাঁওয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন পরিবহন শ্রমিকরা। নাখোশ পরিবহন নেতারা বলেছেন, পরিবেশ স্বাভাবিক হলে সরকারের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরবেন।

আইন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, আগের আইনে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর সাজা ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড। নতুন আইনে ৩০৪ (খ) ধারায় সাজা দুই বছর বাড়বে। এ ধারায় জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। তবে তদন্তে যদি তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয় উদ্দেশ্যমূলক হত্যা তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারণ করবেন বিচার ৩০২ না ৩০৪ (খ) ধারায় হবে। উচ্চ আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে সড়কে মৃত্যুর সাজা অন্তত সাত বছর রাখার কথা বলা হয়েছিল। পাঁচ বছর সাজার বিধান রাখা হলেও আইনমন্ত্রী বলেছেন, উচ্চ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করা হয়েছে।

আনিসুল হক বলেন, এ আইনটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি পুরোপুরি পূরণ করা হলো। বিদ্যমান আইন অনেক পুরনো। সেই সময়ের চেয়ে এখন দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ও সড়ক ব্যবস্থারও অনেক আধুনিকায়ন এবং উন্নতি হয়েছে।

দেশের পরিবহন খাত চলছে ১৯৩৯ সালের ‘বেঙ্গল মোটর ভেহিক্যাল অ্যাক্টে’। ১৯৮৩ সালে ‘মোটরযান অধ্যাদেশের’ মাধ্যমে আইনটি পরিমার্জন করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় চালক দায়ী হলে ১৪ বছর কারাবাসের বিধান ছিল অধ্যাদেশে। পরিবহন সংগঠনগুলোর আন্দোলনে তা দুই দফায় কমিয়ে তিন বছর করা হয়। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৩০৪ (খ) ধারায় সড়কে মৃত্যুর বিচার করা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড।

সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় এই ধারায় সাজা দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে কয়েকজন মন্ত্রী সাত বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব করেন। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে মন্ত্রীরা বলেন, মোটরযান অধ্যাদেশে সাত বছর সাজার বিধান ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক পরিবহন ও আইন মন্ত্রণালয় অনেক পর্যালোচনা করে পাঁচ বছর শাস্তি নির্ধারণ করেছে। পাঁচ বছর রাখাই যুক্তিসঙ্গত।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, উপস্থিত থাকলেও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা কিছুই বলেননি। শাজাহান খান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। মালিক সংগঠন সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা। সড়ক পরিবহন আইনের নীতিগত অনুমোদনের পর গত বছরের এপ্রিলে পৃথক অনুষ্ঠানে তারা বলেছিলেন, এ আইন পাস হতে দেবেন না। প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছাড়বেন।

খসড়ায় সাজা দুই বছর বাড়লেও একে যথেষ্ট মনে করেন না নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেছেন, মালিক-শ্রমিকের স্বার্থই রক্ষা করা হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, যাত্রী স্বার্থ রক্ষিত হয়নি আইনে।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল সড়কে মৃত্যুর সাজা অন্তত সাত বছর হতে হবে। কিন্তু আইনের খসড়ায় এ নির্দেশনা প্রতিপালন করা হয়নি। তবে নতুন আইনে অনেক ভালো দিক রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, তদন্তে নির্ধারিত হবে ৩০২ না ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা হবে। তদন্ত সঠিকভাবে হবে কি-না তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সড়ক পরিবহন আইনে খুশি নন মালিক-শ্রমিক নেতারাও। তারা বলছেন, সাজা অনেক বেশি কঠোর হয়ে গেছে। এত কঠিন সাজা মাথায় নিয়ে পরিবহন খাত চলতে পারবে না। সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, তারা আইনটিকে স্বাগত জানাচ্ছেন না। পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে মতামত জানাবেন।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু বলেন, চালকের পাঁচ বছরের সাজা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ৩০২ ধারায় মামলা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। কারণ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কোন ধারায় মামলা হবে। এতে চালক, শ্রমিকদের হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। আইনের খসড়ায় যেসব বিষয় নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তা সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে।

পরিবহন খাতের আইন যুগোপযোগী করতে ২০১০ সালে উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত আট বছরে চারবার খসড়া করা হয়। কিন্তু আগের তিনটিই সংশোধন করা হয় পরিবহন খাতের নেতাদের চাপে। প্রথম খসড়ায় সড়কে মৃত্যুর বিচার ৩০২ ধারায় করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে পিছিয়ে আসে সরকার।

সড়ক পরিবহন আইনের চূড়ান্ত খসড়ায় অন্যান্য অপরাধের সাজা বিদ্যমান আইনের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ যাত্রী পেতে বাসে বাসে রেষারেষি। তা বন্ধে সড়কে গতির প্রতিযোগিতা করলে দুই বছরের জেল ও দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সড়ক পরিবহনের আইনের খসড়ায় দুর্ঘটনায় ক্ষতির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তি বা তার পরিবারকে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে মালিককে।

খসড়ায় চালককে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিয়োগপত্র না দিলে মালিকের তিন মাসের জেলের বিধান রয়েছে। চালককে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। হেলপারকে হতে হবে পঞ্চম শ্রেণি পাস। দু’জনেরই লাইসেন্স থাকতে হবে। ফিটনেসবিহীন, ভুয়া কিংবা বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে ছয় বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে জরিমানা চার হাজার টাকা।

সড়কে মৃত্যুসহ ৫০ হাজার টাকার বেশি জরিমানা রয়েছে এমন অপরাধে অভিযুক্তকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ। আইনের খসড়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইন ভাঙলে পয়েন্ট কাটা যাবে। কারও সব পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে।