বিএনপির এই দুর্দশা কেন?

মো. শহীদুলাহ: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন জেলে। তিনি এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত। দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন) তারেক রহমানও দূর্র্নীতির মামলায় দোষী, স্বেচ্ছায় লন্ডনবাসী। তিনি আর দেশে ফিরতে পারবেন বলে মনে হয় না। সব মিলিয়ে দলটি এখন যারপরনাই মুশকিলে। এই মুশকিল যে কোনদিন আছান হবে তা একমাত্র আলাহই ভালো জানেন। এদিকে, দলটির সাংগঠনিক শক্তিও ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী কার্যক্রম বাক্সবন্দি নয়াপল্টনের কার্যালয়ে। ওখানেই প্রতিদিন প্রেসব্রিফিং করে সরকারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা ও হুশিয়ারি দেওয়া হয়। সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার সামান্য শক্তিও নেই এখন দলটির। দেশের রাজনীতি নিয়ে যারা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আগ্রহী, তাদের মনে প্রশ্ন বিএনপির এই করুণদশা হলো কেন? এই প্রশ্নের জবাব পেতে হলে বিএনপির জন্ম এবং রাজনৈতিক নীতির নির্মোহ যাচাই-বাছাই দরকার। সে রকম তাগিদ থেকেই এই লেখা।

বিএনপির জন্ম : জনগণের কোনো ন্যায্য অধিকার আদায় কিংবা অর্থনৈতিক দাবি দাওয়া থেকে রাজপথে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দলের জন্ম হয়নি। জন্ম হয়েছে সেনা ছাউনির আঁতুড়ঘরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা হত্যা করেছিল তাদের মদদদাতাদের অন্যতম একজন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতায় বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগকে চিরতরে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য ৩ নভেম্বর জেলখানায় বন্দি অবস্থায় খুন করা হয় চার নেতাকে। তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলি ও কামরুজ্জামান। এখানেও জিয়াই খলনায়ক, জড়িত তারই কালো হাত।

এরপর প্রথম ধাপে আওয়ামী লীগের বেইমান নেতা খন্দকার মুশতাকসহ অন্যরা এবং সেনাবাহিনীতে চরম ডানপন্থি চক্রের সমর্থক মেজর জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তখন এদেরকে হটানোর জন্য একটা বড় আঘাত করেন সেনা কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফ। তিনি মেজর জিয়াকে বন্দি করেন। এ সময় সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্য নিয়ে সেনাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন জাসদ নেতা কর্নেল তাহের। কর্নেল তাহের ও জিয়াপন্থি সৈনিকরা খালেদ মোশাররফের হাতে বন্দি মেজর জিয়াকে মুক্ত করেন। কিন্তুু এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব কর্নেল তাহেরের হাতে থাকেনি। চলে যায় জিয়ার পক্ষে। তিনি সেনাপ্রধান হন। যুক্তরাষ্ট্র,পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী চীনপন্থি বামদের সমর্থনে জিয়াই তখন হয়ে পড়েন দেশের মালিক।

সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও এনএসআইকে ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে গড়ে তোলেন জনদল, জাগদল ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট। অশেষে ১৯৭৯ সালে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑবিএনপি। তার এই দলে যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী মশিউর রহমান জাদু মিয়ার ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জাসদের দলছুট অংশ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আরো ব্যক্তিবর্গ ও হতাশ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে। মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের কমড়া-কামড়ি হিসাবে মূল্যায়ন করা চীনপন্থি বামদের বড় অংশই জিয়ার বিএনপিতে যোগ দেয়।

জিয়া তার প্রাণ রক্ষাকারী যুদ্ধাহত সেক্টর কমান্ডার (জিয়া নিজেও সেক্টর কমান্ডার ছিলেন) কর্নেল তাহেরকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দেন। সেনাবাহিনীর বাম ও প্রগতিশীল সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে হত্যা করেন। জেলে পুরেন এবং চাকরি ছাড়া করেন। মুক্তিযুদ্ধে ঘাতকের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হওয়া জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি ও নেজামে ইসলামকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। নিষিদ্ধ করেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এসব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রাষ্ট্রপতি জিয়াও পরে চট্টগ্রামে সেনাবিদ্রোহের নিহত হন ১৯৮১ সালে। তিনি তো মরলেন, কিন্তুু মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, শোষণমুক্তির অঙ্গীকার এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তঋণ তার সামরিক বুটের লাথিতে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে গেলেন।

খালেদার বিএনপি : জিয়া নিহত হওয়ার পর দলটির নেতা হন বেগম জিয়া। তিনি স্বৈরাচারী সেনাশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দেশের অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন, দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেন। তার শেষবারের শাসন আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। ওই হামলায় ২৪ জন নিহত হন। এরও আগে জঙ্গি মুফতি হান্নান কোটালিপাড়ায় বোমা পেতে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালান। হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলা করে হত্যা করা হয় সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএস কিবরিয়াকে। বিচার তো দূরের কথা, এসব ঘটনার পর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্ট করেছিল বিএনপি সরকার। জজ মিয়া কিচ্ছা তো আইন-আদালত ও বিচার জগতে এক মহাবিস্ময়! ওই সময় সরকারের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠে হাওয়া ভবন। জিয়াপুত্র তারেক অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে হস্থক্ষেপ করতে থাকেন। বড় বড় প্রকল্প থেকে নিতে থাকেন বিপুল অঙ্কের বখরা।

জামায়াত ও জঙ্গিবান্ধব তারেকের সঙ্গে বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল ভারতবিরোধী পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের মহব্বত গড়ে ওঠে। ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের জন্য মুফতি হান্নান, বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমানরা ভয়ংকর রূপে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্লোগান দেন ‘আমরা সবাই তালেবান/বাংলা হবে আফগান। দেশে কায়েম হয় মগের মুল্লুক। এই আফগানওয়ালাদের লেলিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ এবং দেশের বামপ্রগতিশীল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। তারা দেশের প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল নেতা এবং মুক্তমনা লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের খুন করার জন্য হিটলিস্ট তৈরি করে। তাদের এই হিটলিস্ট থেকে বাদ পড়েননি সুফিবাদী ও উদার প্রকৃতির আলেম ওলামারও। রাজধানী ঢাকা, রাজশাহীর বাঘমারা এবং নওগাঁয়ে এই মৌলবাদী জঙ্গিরা রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে। গ্রামে গ্রামে মুজাহিদ বাহিনী গঠন করে বাংলা ভাইরা মানুষ হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখেন।

আইন শিক্ষার ভুয়া সনদ দিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার মতো ঘটনাও দেশে ঘটে। আইনের শাসন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকেনি। সর্বশেষ ছিল বঙ্গভবনে ড. ইয়াজ উদ্দিন নাটক। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২০০৬ সালে ১৪ দলীয় মহাজোটের ধারাবাহিক আন্দোলনে পতন হয় খালেদা জিয়ার সরকারের । ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার।

খালেদার ব্যর্থতা : খালেদা জিয়ার সুযোগ ছিল বিএনপিকে গণকল্যাণকামী আধুনিক দল হিসেবে গড়ে তোলার। তিনি তা করেননি। তিনি ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজাকার, আল শামস, আল বদর নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি ফ্রিডম পার্টির নেতাদের আশ্রয় দিলেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে দাঁড়ালেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক-রশিদ চক্রকে আদর-সোহাগ দিলেন। ’৭১-এর ঘাতকদের মন্ত্রী বানালেন। ১৫ ফেব্রæয়ারির সাজানো নির্বাচনে কর্নেল রশিদকে করলেন এমপি। তার স্বামী জিয়াও এই দুই খুনির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

খালেদা জিয়া শাহবাগে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের গণজাগরণের বিরোধিতা করলেন। শাহবাগে জ্বলে ওঠা প্রগতির আলোক শিখা নিভিয়ে দেওয়ার জন্য হেফাজতের মোল্লাদের ঢাকায় আনলেন তিনি। হেফাজতের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও জাতীয় পার্টির উগ্রপন্থিরা মিলে মতিঝিলে মধ্যযুগীয় অসভ্যতার প্রকাশ ঘটাল। দেশবাসী ও বিশ্ব দেখল হিটলারি তান্ডব। জানি না, কার পরামর্শে বিএনপি নেত্রী সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মতো যোগ্যতা হারিয়ে বসলেন। বুঝতে ব্যর্থ হলেন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এশিয়ার নতুন সামরিক শক্তিবিন্যাসকে। হেফাজত ও জঙ্গিদের প্রতি বিএনপি এবং এর বুদ্ধিবণিকদের এই আদর-আপ্যায়ন ও সমর্থন দেখে গণতান্ত্রিক বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে গেল। তাদের মনে প্রশ্ন জাগল বিএনপি কী গণতান্ত্রিক দল, না কি মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিম (মুসলিম ব্রাদার হুড)। তাদের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল বিএনপি গণতন্ত্রের সর্বজনীন মূলভিত্তিগুলো ধারণ করে না। দলটি মৌলবাদের কাজে বাঁধা পড়েছে। ফলে তালেবান-পছন্দ এই দল বাংলাদেশে থাক বা না থাক এতে গণতান্ত্রিক বিশ্বের কিছু যায় আসে না। বরং দলটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি বলে মনে করল প্রাশ্চাত্য। দুর্দশার যামিনী গ্রাস করতে থাকল বিএনপিকে।

ভারত বিরোধিতা : একটা সময় ছিল যখন ভারতের সিংহভাগ অর্থনীতি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। এটাকে সেদেশের সমাজতাত্তি¡করা নেহেরু ধাঁচের সমাজতন্ত্র বলতেন। এদিকে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটা ছিল সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়ার মিত্র। এই অবস্থা ছিল গত শতাব্দীর ’৯০ এর দশক পর্যন্ত। সেই ভারত কিন্তুু নেহেরুর দর্শনে আটকে থাকেনি। বাজার অর্র্থনীতির দিকে প্রথম সতর্ক পা ফেলের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ি। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও। তারপর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাজারমুখী ও পাশ্চাত্য ধাঁচের উদার অর্থনীতির পথে রীতিমতো ওসাইন বোল্টের গতিতে দৌড়ান। দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন আসে দ্রুত। রুশপন্থি ভারত ক্রমশই ঝুঁকতে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। দেশটি ডবিউটিও স্বাক্ষর করে।

দেশের বাজার দেশি পুঁজি বিনিয়োগকারী ও বিদেশি লগ্নীকারদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভারতের এই যে বাজারমুখী সংস্কার ও নীতি পুনর্গঠন  এটা তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশে পরিণত করেছে। মার্কিন গোয়েন্দাসংস্হা সিআইএ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্হা আইএসআইর মাধ্যমে ভারতকে অস্হিতিশীল রাখার জন্য যে ‘কাশ্মীর- সপ্তকন্যা খেলা’ খেলত তা বন্ধ করে দেয়। ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ইসলামি জঙ্গিদের শায়েস্তা করতে নয়াদিল্লিকে সঙ্গে পেতে চায় ওয়াশিংটন। শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং সর্বশেষ সামরিক মৈত্রীচুক্তি সই হয়। এতে চীনের চোখ কপালে ওঠে, চুপসে যায় পাকিস্তান।

এশিয়ায় চীনের দাদাগিরির বিরুদ্ধে ভারত-মার্কিন এখন এক প্রাণ, এক মন। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যে বিদেশনীতির যুগান্তকারী নতুনত্ব এটা বোঝার ক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মান খালেদা জিয়ার না থাকারই কথা। কিন্তুু তার দলে তো অনেক জ্ঞানী ও উচ্চশিক্ষিত নেতারা আছেন। তারাও বিষয়টা ধরতে পারলেন না, এমনটা মানা যায় না। ভারত-মার্কিন এই যে নতুন মেলবন্ধন কিংবা লাইলী-মজনুর জুটিএটা আমলে না নিয়ে বিএনপি নেত্রী তার পাকিস্তানি জোশের ভারত বিরোধিতা বজায় রাখলেন। তার শাসনামলে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হলো, ভারতে ১০ ট্রাক অস্ত্র ঢোকানোর চেষ্টা হলো। খালেদার শিল্পমন্ত্রী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী বায়তুল মোকাররমের এক জনসভায় ঘোষণা করলেন আসামের উলফারা স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাদের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন আছে। কী নির্মম পরিহাস! নিজের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে যিনি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন সেই তিনি সাজলেন আসাম ও কাশ্মীরের স্বাধীনতাযুদ্ধের পৃষ্ঠপোষক, ভন্ডামী আর কাকে বলে! নিজামীদের এই অপরিণামদর্শী কাজের কাফ্ফারা কী বিএনপিকে দিতে হচ্ছে না?

মিয়ানমার, ভারত, নেপল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মধ্যে পণ্য-পুঁজি-শ্রমশক্তি ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান সহজ করার জন্য বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচি রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই কর্মসূচি এসব দেশে বাজার অর্থনীতির বিকাশ এবং মানুষের আয় বৈষম্য কমাবে। দারিদ্র্য হ্রাস করবে। বিশ্বব্যাংকের এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে সাউথ এশিয়ান কানেক্টিভিটি। এই কানেক্টিভিটির যোগাযোগ স্থাপনা যেহেতু ভারত হয়ে বাংলাদেশকে যুক্ত করে, সেই জন্য বিএনপি এর বিরোধিতা করে থাকে। এই ক্ষেত্রে দলটি যেন কমিউস্টি পার্টি! কিন্তুু কেন? বিএনপি কী মওলানা ভাসানীর মতো কমিউনিস্ট বেষ্টিত যে, এই ধরনের বৈশ্বিক পুঁজিবাদ বিকাশের এ ধরনের কর্মকান্ডের বিরোধিতা করতে হবে।

বিএনপি ক্ষমতায়, মাহমুদুর রহমান তখন প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের পরিচালক। বহুজাতিক কোম্পানি টাটা বাংলাদেশে ৪টি বড় শিল্প প্রকল্প করার জন্য জমি চাইল। পাছে চীন নাখোশ হয় এবং তাদের ভারতবিরেধিতা ক্ষুন্ন হয় তাই টাটাকে বিমুখ করা হলো। বিএনপির মতো একটি পুঁজিবাদী দলের এমন আচরণের কথা ভাবাও যায় না। টাটারা ব্যবসায়ী, এক দেশে না হলে অন্য দেশে ব্যবসা করবে তারা। বেনিয়াদের আবার ক্ষতি কী, তাদের তো লাভের পাল্লাই ভারী থাকে সব সময়। কিন্তুু আখেরে বিএনপির ক্ষতির পাল্লা যে এতো ভারী হবে এটা কী তখন বুঝতে পেরেছিলেন খালেদা জিয়া? তিনি এসব বুঝবেন কী করে? তিনি তো চলতেন জামায়াতের কথায় আর পাকিস্তানের আইএসআইয়ের পরামর্শে। নিজের বুদ্ধি বিবেচনা ও রাজনৈতিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বলতে তো তার কিছু নেই। বিএনপির নেতাদের মুখেই শুনেছি তার দলের জ্ঞানী-গুণি কারো কথার তিনি পাই পয়সার দামও দেন না।

বিএনপির সংখ্যালঘুনীতি : পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন, লিয়াকত আলি খান, জেনারেল আইয়ুব খান, নুরুল আমীন ও মোনায়েম খানদের রাষ্ট্র পরিচালনায় একটা গুপ্ত ফ্যাসিবাদী নীতি ছিল। ওই নীতির মূল কথা ছিল, পাকিস্তানকে অমুসলিম (বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টান) শূন্য করা। অন্যদিকে কমিউনিস্টদের শিরদাড়া এক্কেবারে ভেঙে দেওয়া। এ কারণে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্মমভাবে নির্মূলীকরণের শিকার হন। এবং পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান সাজ্জাদ জহিরকে ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়। পূর্বপাকিস্তানে ঠাঁই হয়নি ইলামিত্রদের। পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা যোগেন মন্ডলকে কলকাতায় আশ্রয় নিতে হয়। মেজর জিয়া ও বেগম জিয়ার সংখ্যালঘু নীতি হুবহু খাজা নাজিমুদ্দীন ও লিয়াকত আলিদের মতোই। এই কারণে বেগম জিয়া-গোলাম আজম-নিজামীদের আমলে দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য এবং জঘন্য হামলার শিকার হতে হয়েছিল। মাটিতে মিশে গিয়েছিল তাদের সামাজিক মান-সম্মান। তাদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা ছিল না।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এলেন ঢাকায়। খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্ত করলেন না। ঘরের লষ্ক্মী পায়ে ঠেললেন। ঠেলবেনই তো তিনি যে সরস্বতীর বরকন্যা! তার কী দরকার হয় ঠাকুর পূঁজার! তবে এখন তো হিন্দু মৌলবাদীদের আখড়া নাগপুর এবং নয়াদিল্লির চাণক্যপুরীতে লবিষ্ট পাঠিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

বিএনপির নয়াদিল্লি ক‚টনীতি ব্যর্থ হয়েছে। তারেক জিয়া লন্ডনে থেকে সুখী জীবন কাটাতে পারবেন। হাওয়া ভবনের মাধ্যমে মাতা-পুত্রের অবৈধভাবে অর্জিত টাকায় হয়তো স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আমোদ-আহ্লাদেই থাকবেন। কিন্তুু তারেক কোনোদিন বাংলাদেশের নেতা হবেন এই চিন্তা এখন পাগলও করে না। আর থাকল কী? সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক। এই আহব্বান মাঝে মধ্যেই উচ্চারিত হয় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কণ্ঠে। মির্জা সাহেব অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন। এ বিষয়ে শিক্ষকতাও করেছেন কিছু সময়। তিনি কী জানেন না স্বাধীন দেশে জাতীয় ঐক্য হয় না। আর যদি দেশ ও দেশের মানুষের বিশেষ দরকারে সমমনা দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের ঐক্য হয়ও তার তো একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি লাগবে। আজকের যুগে সেই কর্মসূচি অবশ্যই হবে মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী। সঙ্গে থাকতে হবে দেশের ধনি ও গরিবের মধ্যে আয় বৈষম্য কমোনোর দূরদর্শী দিকনির্দেশনা। মির্জা সাব! আপনার সেই কর্মসূচি কই?

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক