নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ওদের নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিন

মিজানুর রহমান খান:  ছাত্ররাই বাংলাদেশ গড়েছিল, কিন্তু গড়ে দেওয়ার পরে তারা তাদের সেই গৌরব বা কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। তারা শৃঙ্খল পরেছিল। বিষয়টি দেশের জন্য ছিল হতাশার। বছরের পর বছর ধরে আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, ছাত্ররা কবে তাদের ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসবে। নতুন প্রজন্ম কবে জাগবে। তারপর দেখেছে নতুন প্রজন্ম কথাটি বেশ জেগে উঠেছে। কিন্তু সেটাও নানা ঘটনায় ফিকে হতে শুরু করেছিল। তারা শিকল ভাঙার গান ভুলতে বসেছিল। সম্প্রতি কিশোর-তরুণেরা প্রমাণ করল, তারা ভোলেনি। তাদের কণ্ঠে গান। তবে এই গান শোনার কান থাকতে হবে। না জানলে এই গান শোনা যাবে না। স্লোগানগুলোর ভাষা লক্ষ করুন। সৃজনশীল, মাটির গন্ধমাখা ও দ্রোহী। তারা কেবল সড়কব্যবস্থা মেরামত নয়, রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখেছে।

অনেক বেশি আশাবাদী মানুষকে জানি। তাঁরাও হাল প্রায় ছেড়ে দিতে শুরু করেছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে রাজপথে সক্রিয় হয়েছে, তা হতাশা কাটিয়ে আশার সঞ্চার করেছে। যাঁরা এই আন্দোলনকে শুধুই নিরাপদ সড়ক চাই হিসেবে দেখছেন, তাঁরা ভুল করছেন। এটা উপলক্ষ মাত্র। এই শিশু, কিশোর ও তরুণেরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখছে, কীভাবে সবকিছু আইনের বাইরে চলছে। তাদের স্বনিয়োজিত ট্রাফিক হওয়াকেও প্রতীকী হিসেবে দেখতে হবে। তারা আসলে বড়দের সত্যিকারের আইনের শাসনের ধারণা দিতে এসেছে এবং এই আইনের শাসনের ধারণা তারা প্রচলিত রাষ্ট্রের অনুশীলন করা তথাকথিত আইনের শাসন থেকে নেয়নি। এটা এমন একটি প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, যখন আমরা আরেকটি সাধারণ নির্বাচন করতে যাচ্ছি, যখন আমরা সবাই প্রতিকারহীনভাবে জানি, এই নির্বাচন আমাদের ঘুণে ধরা রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা বদলে দেবে না। ওপরতলার মানুষেরা বৈধ ছাড়পত্র বিহীন যে জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, কিশোর-তরুণেরা তাকে মুখের ওপরে ‘না’ বলেছে।

কিশোর-কিশোরীদের এই আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোকে এভাবে দেখা যায়।

এক. কোনো নেতা ও সংগঠন ছাড়াই আন্দোলন সৃষ্টি ও তা সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আমরা যারা ভেবেছিলাম, পরিবর্তনটা কে আনবে, কীভাবে আনবে। কোথা থেকে কখন শুরু হবে, তাদের ভুল ভেঙেছে। পরিবর্তন আনতে একক নেতা লাগবে না। সমষ্টি পথ দেখাতে পারবে। বড়দেরই পারতে হবে, এমন নয়। ছোটরাও পথ দেখাতে পারবে।

দুই. চলমান আন্দোলন আমাদের ইতিহাসে একটি শুদ্ধতম, অনন্য ও অবিস্মরণীয় আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আমাদের ইতিহাসের যেসব ছাত্র আন্দোলন সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ও সফল, সেখানে কিছুটা হলেও সহিংসতা রয়েছে। কিন্তু এই আন্দোলন পুরো হিংসামুক্ত।

তিন. ছাত্ররা এমন একটি সাহসী ও অভাবনীয় কাজ করেছে, যার প্রতি অভিভাবক ও সাধারণ জনগণ নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, সোনারগাঁও হোটেল লাগোয়া ক্রসিংয়ে ছাত্রছাত্রীরা একটি মোটরগাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করছিল। ভিড়ের মধ্যে কেউ বললেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? ভিড়ের মধ্যেই উত্তর কানে এল: ‘যা ঘটছে, এটাই ঠিক হচ্ছে।’

চার. আরেকটি আশার জায়গা হলো, শিক্ষা দেওয়ার শিক্ষক এই ঘুণে ধরা সমাজের ভেতরেই আছে। আমরা বড়রা ইতিমধ্যে কখন সংখ্যালঘু হয়ে গেছি।

পাঁচ. এত দিন কোনো ছাত্র আন্দোলন হলে সেখানে দ্রুত বড়রা গিয়ে হাজির হতেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যুক্ত হতো। পরিস্থিতিকে একটা চেনা চেহারা দেওয়ার চেষ্টা চোখে পড়ত। এবার তা হয়নি। বড়রা বুঝে নিয়েছেন, ওদের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা তাঁরা হারিয়েছেন।

ছয়. এই কিশোরেরা হলো কুসুম কুমারী দাশের ‘সেই ছেলে’ (পড়ুন ছেলেমেয়ে), যারা কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হয়েছে। তারা দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করতে হয়। তারা বুঝতে পেরেছে, শুধু প্রতিবাদ করা বা আমাদের দাবি মানতে হবে-এসব বলাবলির দিন শেষ। তাই তারা কাজে নেমে পড়েছে।

ড. আনিসুজ্জামান স্যার ছাত্রদের দাবি ন্যায্য বলেছেন। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম এর সঙ্গে কোন আন্দোলনকে তুলনা করা যায়। তাঁর কথায় মনে হলো, কিশোর শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্য বিষয়ে ফ্রান্সে ও মিসরের ছাত্র আন্দোলনের ‘সমগোত্রীয়’ মনে করেন। কিন্তু ভিয়েতনাম প্রশ্নে মার্কিন স্কুলছাত্রদের নিশ্চয় এটা লিখতে হয়নি যে ‘রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’। এই শিশু-কিশোরেরা নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্র পাল্টানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তাই তারা বলছে, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ তারা প্রকারান্তরে বুকে-পিঠে আলপনা লিখছে, ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ।’ ওরা এভাবেই নতুন এক নিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাব্য লিখেছে। এই কাব্যচর্চা থামবে না।

আমরা স্পষ্ট দেখছি, ওরা আসছে। তাদের পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ওরা পুলিশের হাতে ফুল তুলে দিয়েছে। একটি মেয়ে পুলিশের হাতে গোলাপ গুঁজে দিয়ে বলেছে, ‘কাল গালি দিয়েছিলাম, আজ তাই ফুল দিলাম।’

ওরা ঘরে ফিরবে। তাদের অবশ্যই শান্তি বজায় রাখতে হবে। তারা আবার ফিরবে। কারও হাতিয়ার হিসেবে নয়, তারা ফিরবেই। কারণ, তারা হয়তো দেখবে ‘সে-ফুল খুঁজে পায়নি/তোমার চিত্তরসের ছোঁয়া,/পেয়েছে শুধু কঠিন জুতার তলা।’

দলমত-নির্বিশেষে, বিশেষ করে সরকারেরই বড় দায়িত্ব শান্তিপূর্ণভাবে এই বিস্ময় কিশোরদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করে দেওয়া। বিএনপির কোনো ধরনের ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত হবে না। এই শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিন। ওরা সরকার টলাতে আসেনি। ব্যবস্থা টলানোর সংকল্প ব্যক্ত করেছে। একে উৎসব হিসেবে নিন। বঙ্গবন্ধুর তৈরি বাহাত্তরের সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদটা এই প্রথম যতটা বুঝলাম, এত ভালো আগে বুঝিনি। এটি বলেছে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। ওরা মালিক। হাতে-কলমে মালিকানা বুঝে নিচ্ছে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাষ্ট্র কারা চালাবে, সেই প্রশ্নে একটি অকাল বোধন ঘটেছে। সারা দেশের শিশু-কিশোরদের প্রতি অভিবাদন। আসুন, আমরা বড়রা কান পেতে শুনি, তাদের অব্যক্ত উচ্চারণ: ‘আমার কাঁধেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি/তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ধুলো।…আমার কাঁধেই নিলাম তুলে আমার যতো বোঝা।’

মিজানুর রহমান খান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail.com