পাহাড়ধসের কারণ ও প্রতিকার

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান: পাহাড় সৌন্দর্যের প্রতীক। পাহাড়ের সবুজময় সৌন্দর্য ও আঁকাবাঁকা বয়ে যাওয়া নদী মানুষকে মোহিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু পাহাড়ে আছে মৃত্যুর শংকা। কিছুটা মনুষ্যসৃষ্ট কিছুটা প্রকৃতিগত।

বাংলাদেশে পাহাড়ধস একটা নতুন আতঙ্কের নাম, নতুন দুর্যোগ, নতুন বিপর্যয়। ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে ১৬৬ জন লোক মারা যায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১২০ জন মারা যায় রাঙ্গামাটি জেলায়। ওই সময় ২২৭ জন লোক আহত হয়। ৩,৭৫০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ও ৩৬ হাজার ৬৩৭টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বছরও জুন পর্যন্ত ২৩ জন লোকের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা গেছে।

পার্বত্য তিনটি জেলার আয়তন ১৩ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮৭ হাজার। কিন্তু এ এলাকার কত অংশ ভ‚মি মানুষের বসবাসের উপযোগী? অপরিকল্পিত শহরায়নের ফলে দরিদ্র সহায়সম্বল ও ভিটেমাটিহীন মানুষেরা নিতান্ত বাধ্য হয়েই এখানে বসবাস করছে। ১৬ শতকের প্রথম দিকে আরাকানের অধিবাসীদের অত্যাচারে ভিটেমাটি ছাড়া চাকমা, মারমাসহ কয়েকটি জাতি এসে এখানে প্রথম বসবাস শুরু করে। এখন পাহাড়ি বাঙালি প্রায় সমান সমান।

ভ‚তাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলাদেশের পাহাড়ের মাটি অন্যান্য দেশের পাহাড়ের মতো পাথুরে নয়। এখানকার মাটি বেলে ও বেলে দো-আঁশ প্রকৃতির। ফলে অধিক বৃষ্টিতে পাহাড়গুলো প্রচুর পানি শোষণ করে নরম হয়ে পড়ে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ১২-১৪ জুনে রাঙ্গামাটিতে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ওই সময় ৩ জেলায় গড়ে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর পূর্বে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৩৩৫ মি.মি., ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই ৩১৭ মি.মি., ২০০৪ সালের ১১ জুলাই ৩৩৭ মি.মি. বৃষ্টিপাতের রেকর্ড রয়েছে। এ পরিমাণ বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার পথ পাহাড়গুলোতে নেই।

পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢালু পথগুলো অবৈধভাবে ভরাট করে চাষবাস হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে। পাহাড়গুলো এমন খাড়াভাবে কাটা হচ্ছে যে, অবশিষ্ট অংশ ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। পাহাড়গুলো যাতে ধসে পড়লে পরের বছর আবার মাটি কাটা যায় এজন্য দূর্বৃত্তায়ন চলছে। গাছ কেটে পাহাড়গুলোকে ন্যাড়া করে ফেলা হচ্ছে। এর পরিণাম হলো প্রকৃতির প্রতিশোধ।

পাহাড়ধসের পর অনেক পদক্ষেপই নেয়া হয় একটি ছাড়া। যেমন ২০১৭ সালের পাহাড়ধসের পর স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, রেডক্রিসেন্ট, জনপ্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ উদ্ধার কাজে নেমেছিল এবং ২৩০০ জনকে উদ্ধার করেছে। এ উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর দুইজন কর্মকর্তা ও তিনজন সৈনিক জীবন দিয়েছেন।

এ সময় ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রায় ১ কোটি টাকা ও ১১০০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন ও ১৫ লক্ষ টাকা দিয়েছে। এ বছরও সরকার পাহাড়ি ৩৫টি উপজেলায় কর্মশালা, র‌্যালি, মাইকিং, পোস্টারিং করেছে। বড়ো আকারের কর্মশালা ও র‌্যালি হয়েছে। তবে সমস্যা হলো পাহাড়ি লোকগুলো নিজের ডেরায় মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকলেও বাধ্য না করা পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না।

পাহাড়ধস প্রতিরোধে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করা হয়েছে। তারা পাহাড়ধস এলাকা পরিদর্শন করে সকল অংশীজনের মতামতের আলোকে একটি প্রতিবেদনও প্রস্তুত করেছেন। জানা যায়, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বসবাস ও বৃক্ষনিধন পাহাড়ধসের প্রধান কারণ।

পাহাড়ধস রোধে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো কাজ শীঘ্রই করা প্রয়োজন। প্রথমেই পাহাড়গুলোর অবস্থা, প্রকৃতি, ভ‚মিরূপ, প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর আলোকে এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাহাড়গুলোর ধারণক্ষমতা ও আবাদের সক্ষমতা অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ করে দুর্যোগঝুঁকির ভিত্তিতে ভূমি বিভক্তিকরণ বা ল্যান্ড জোনেশন করা; জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকাসমূহ চিহ্নিত করে মানচিত্র প্রণয়ন ও প্রকাশ্য স্থানে প্রদর্শন করা; ঝুঁকি মানচিত্র থাকলে স্থানীয় বসতিদের পাশাপাশি পর্যটকরাও চলাফেরায় সতর্ক হতে পারবেন। রাস্তাঘাট নির্মাণের সময় পাহাড়ের কন্ট্রোল লাইন সঠিকভাবে মেনে নির্মাণ করা; পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প রাস্তা নির্মাণও একান্ত জরুরি। বিকল্প রাস্তা না থাকায় ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সময়মতো ত্রাণসামগ্রী, জ্বালানি ও খাবার পানি পৌঁছানো যায়নি।

২০১৭ সালের পাহাড়ধসে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। কারণ পাহাড়ের উঁচুতে যেসব পুল স্থাপন করা হয়েছে, পাহাড়ধসে সেগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মেরামত করা যায়নি। কারণ ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে বিদ্যুৎকর্মীরা উঁচুস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক স্থানের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পানি নামার পথ রাস্তাঘাট নির্মাণ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে পানি নিয়মমতো নামতে পারছে না। পরিণামে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হচ্ছে। কাপ্তাই বাঁধ ও হ্রদের নাব্যতা বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। পাহাড়ভিত্তিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা না হলে প্রতিবছরই পাহাড়ধসের আশংকা থাকতে পারে।

যদি পাহাড়ি এলাকায় মানুষের বসবাসের জায়গা দিতেই হয় তবে পাহাড়ের উচ্চতা ও ঢাল অনুসরণ করে ১:২ অনুপাতে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া উচিত। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ীভাবেই বসতি স্থাপন বন্ধ হওয়া উচিত। অতিবৃষ্টির আশংকা তৈরি হলে পূর্ব থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের বাধ্যতামূলক সরিয়ে নিতে হবে। দুর্যোগকালে পাহাড়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার যন্ত্রপাতি পাহাড়ি এলাকায় সংরক্ষণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করা যায়।

পাহাড়গুলো নিয়ে একটি পরিপূর্ণ গবেষণা দরকার। স্বল্পমেয়াদি হিসেবে ভারী বৃষ্টিপাতের শঙ্কার বার্তা পাহাড়িদের কাছে মোবাইল ও মাইকের মাধ্যমে দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়িদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে প্রথমে নিজের জীবন বাঁচাতে হবে পরে অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থানের সংস্থান। জাপান হলো পাহাড়ি দেশ, অগণিত পাহাড়। পাথুরে হওয়া সত্তে¡ও জাপানে জনবসতিপূর্ণ ও রাস্তার পাশের পাহাড় ১৫-২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু করে গাইড ওয়াল দিয়ে বাঁধাই করে দেওয়া। আমাদের পাহাড়গুলো যেহেতু নরম মাটির তাই জনবসতিপূর্ণ ও রাস্তার পাশের পাহাড় ঐ রকম বাঁধাই করে টেকসই করা যেতে পারে। এর জন্য অর্থের সংস্থান থাকা প্রয়োজন।

পাহাড়ি এলাকা বাংলাদেশের পর্যটনের একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, সবুজে মিলে মিশে একাকার এক প্রশান্তিময় প্রকৃতি। যে-কোনো মূল্যে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এর জন্য কমিটি হয়েছে, সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদনও প্রস্তুত হয়েছে। প্রকৃতিকে বাঁচিয়েই পরিবেশ ও মানব উন্নয়নে কাজ করতে হবে। পাহাড়ধস বন্ধে প্রথম শর্তই হলো পাহাড় কাটা বন্ধ হতে হবে। তবেই আমাদের অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড় বেঁচে যাবে, বন্ধ হবে পাহাড়ধসে অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।