আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করছে বিএনপি

নিউজ ডেস্ক: আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দাবি আদায় করতে ‘সর্বাত্মক শক্তি’ প্রয়োগ করবে বিএনপি। এ লক্ষ্যে ‘কঠোর আন্দোলনে’র চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়নে ব্যস্ত দলটির হাইকমান্ড। মূলত পাঁচটি দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে বিএনপি- ভোটের আগে দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন।

বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা, ২০ দলীয় জোট, সমমনা উদারপন্থি রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় প্রকাশ্যে ও গোপনে বৈঠক করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতারা। এসব বৈঠকের মাধ্যমে পাওয়া সবার প্রস্তাব বিচার-বিশ্নেষণ করে চূড়ান্ত আন্দোলনের রোডম্যাপ প্রণয়ন করবেন দলটির হাইকমান্ড।

সূত্রমতে, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি দিনব্যাপী বৈঠক করবে। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির নেতাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করা হবে। চূড়ান্ত আন্দোলন এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার ব্যাপারে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দলের দুই শীর্ষ নেতা একমত হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে রূপরেখা ঘোষণা করবে বিএনপি।

সূত্রমতে, চূড়ান্ত আন্দোলনের রূপরেখা তৈরির আগেই উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে চায় তারা। এ লক্ষ্যে আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ঐক্যের ব্যাপারে দলের প্রাথমিক রূপরেখাও ঘোষণা করতে পারে বিএনপি। এরই মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারে উদারপন্থি সংশ্নিষ্ট দলগুলোর কাছ থেকেও অনানুষ্ঠানিকভাবে রূপরেখার খসড়া প্রস্তাবনা সংগ্রহ করেছে দলটি। সম্ভাব্য বৃহত্তর ঐক্য জোটের শীর্ষ নেতা এবং আসন বণ্টনের ব্যাপারে এখনও পুরোপুরি একমত হতে পারেনি তারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, তারা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। এ ব্যাপারে সরকারকে সংলাপে বসার আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা মনে করেন, এখনও সময় আছে। ক্ষমতাসীন দল দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সংলাপের মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে। অন্যথায় ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে সব দলকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে বাধ্য করবেন। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

অবশ্য বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ সমকালকে বলেন, বিএনপি ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কোনো হঠকারী কর্মসূচিতে যাওয়া উচিত হবে না। মানুষ জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল ও অবরোধ পছন্দ করে না। কারাবন্দি হওয়ার আগে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এমন বার্তাই দিয়ে গেছেন। তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

সূত্র জানায়, আগামী আগস্ট মাসে জাতীয় শোক দিবস ও পবিত্র ঈদুল আজহার কারণে বিএনপি বড় ধরনের কোনো কর্মসূচিতে যাবে না। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেই দাবি আদায়ের জন্য তারা জোর আন্দোলন শুরু করবে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামতে শুরু করবে বিএনপি। ওই দিনই বৃহত্তর জোট গঠনের প্রাথমিক রূপরেখার খসড়া ঘোষণা হতে পারে।

সূত্রমতে, শুধু নিজ দল এবং ২০ দলীয় জোটের মাধ্যমে আন্দোলন করে দাবি আদায় সম্ভব নয় ভেবে উদারপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য।

অবশ্য এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নির্বাচন সামনে রেখে জোট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্যজোট করতে আগ্রহী দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলও যোগাযোগ চালাচ্ছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বৈঠক করেছেন। অন্যান্য দলের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

সূত্র জানায়, লন্ডনে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে সম্প্রতি অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে জাতীয় ঐক্য গড়ার ব্যাপারে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ইতিবাচক কথাবার্তা হয়েছে। একই সঙ্গে ড. কামালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন দলের দুই শীর্ষ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সমকালকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প কিছু দেখছেন না। এরই মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বৈঠকেও সবাই একমত পোষণ করেছেন। তফসিল ঘোষণার আগেই তারা দাবি আদায় করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে জানান ব্যারিস্টার মওদুদ।