শেরপুরের বিধবা পল্লী’র বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান

নিউজ ডেস্কঃ ২৫ জুলাই সোহাগপুর গ্রামের মানুষের জন্য বীভৎস একটি দিন।১৯৭১ সালের এদিনে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর বেনুপাড়া গ্রামে কৃষকের ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধা লুকিয়ে আছে এমন অজুহাতে পাক হানাদার বাহিনী চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে গ্রামের ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে। বিধবা হন গ্রামের ৬২ জন গৃহবধূ। আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের বর্বরতার শিকার হন ১৪ জন গৃহবধূ। সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞ নিঃসন্দেহে এক বর্বরোচিত ‘গণহত্যা’, যার বেদনাদায়ক ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। স্বাধীনতার পর পুরুষশূন্য ওই গ্রামটির নাম হয় ‘বিধবা পল্লী’। বুকে পাথর সমান কষ্ট চেপে স্বামী ও সন্তান হারা ওই বিধবা পল্লীতেই কালের সাক্ষী হয়ে আজো বেঁচে আছেন ২৪ জন বিধবা। বীরাঙ্গনা ১৪ জন নারীর মধ্যে দুইজন মারা গেছেন। বেঁচে আছেন ১২ জন।

দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পর একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে নির্যাতিত সোহাগপুর বিধবা পল্লীর ১২ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৫৪ তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের দু-দফায় মুক্তিযোদ্ধার এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সোহাগপুর বিধবা পল্লীর বীরাঙ্গনারা হলেন সমলা বেওয়া, হাফিজা বেওয়া, জবেদা বেওয়া, আছিরন বেওয়া, জোবেদা বেওয়া , হাসেন বানু , মহিরন বেওয়া, আছিরন নেছা, জরিতন বেওয়া, হাসনে আরা, হাজেরা বেগম (১) ও হাজেরা বেগম (২) ।

স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনারা বর্তমানে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো মাসিক দশ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। এছাড়া সরকারি চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাসহ সকল ক্ষেত্রে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান, তার সবটাই পাবেন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যরা।

বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা সমলা বেওয়া (৭৭) ও হাফিজা বেওয়া (৬৮) বলেন , বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । প্রধনামন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানাই। আগে আমরা খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাতাম। বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পেয়ে বর্তমানে নাতি-পুতি নিয়ে ভালই চলছি।

বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা জোবেদা বেওয়া (৭৪) ও হাসেন বানু (৬২) বলেন, সরকার আমাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির পাশাপাশি থাকার ঘর বানিয়ে দিচ্ছে। এখন আমরা সুখেই আছি। তবে আমাদের আবাদি জমি নেই। এখন সবার বয়স হয়েছে , কবে কে যে মারা যাই। সরকারের কাছে আমাদের এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। শেষ চাওয়া এখন একটাই শেখের বেটি হাসিনার বুকের সঙ্গে যেন নিজেদের বুকটা মিলাতে পারি।

সোহাগপুর শহীদ পরিবার কল্যণ সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানীদের হাতে নিহত ১৮৭ জনের নাম সংরক্ষণের জন্য বিধবা পল্লীর বর্তমান স্মৃতিফলক ও ছাউনিগুলো ব্যাক্তি মালিকানা জমির উপর নির্মাণ করায় ভবিষ্যতে তা হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তাদের দাবী ওই জমিগুলো সরকারীভাবে কিনে তা বিধবা পল্ল’ীর নামে ওয়াকফো করার। সেসঙ্গে তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য ভাস্কর্য নিমার্ণের মাধ্যমে সোহাগপুর বিধবা পল্লীর গণহত্যার ইতিহাস সংরক্ষন করার দাবিও জানান।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামের ১৩ জন বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য পাঠালে যাচাইবাছাই শেষে ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ ছয় বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এবছর একজন ছাড়া বাকি আরও ছয় জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে ।

এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, দীর্ঘদিন পর হলেও ওইসব বীরাঙ্গনা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পাওয়ায় আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রতি অভিনন্দন জানাই। শেরপুর জেলায় দু-দফায় সোহাগপুর বিধবা পল্লীর ও রাঙ্গামাটিয়া খাটুয়াপাড়া গ্রামের ১৪ জন বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভের পরও আরও কয়েকজনের নাম অপেক্ষমাণ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তারাও তালিকাভুক্ত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে ১২৬ জন বীরাঙ্গনার অবদান ও দুঃখ- দুর্দশা নিয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট করেন একটি বেসরকারি সংগঠন। ওই রিটে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দিতে জাতীয় সংসদে আইন পাশ করেন সরকার। এরপর থেকে সারা দেশে এ পর্যন্ত ২৩১ জন বীরাঙ্গনাকে দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ।