যত্নে থাকুক রোকেয়ার পায়রাবন্দ

খুব উৎসাহ নিয়ে কয়দিন আগে মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার পৈতৃক বাড়ি রংপুরের পায়রাবন্দ পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। দুই ধারে সবুজের আভা, গ্রাম্য পরিবেশ, পুকুর, মাঝখানে এক চিলতে রাস্তা দিয়ে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রাম। বাড়িতে প্রবেশের আগে লেখা তোরণ-১। ঠিক বাম পাশে চোখে পড়ল অস্পষ্ট একটি নামফলক। নামফলকটি সবুজ শ্যাওলা দিয়ে আবৃত। অনেক কষ্টে পাঠোদ্ধার করে দেখলাম লেখা- ‘বেগম রোকেয়ার বাড়ী, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর’। খানিকটা থমকে দাঁড়ালাম। আমার উৎসাহে ভাটা পড়ল। একটু এগোতে বাম দিকে চোখে পড়ল জেলা পরিষদের পরিত্যক্ত বাংলো। শৈবাল, শ্যাওলা দিয়ে ঢাকা পড়ে আছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, ৩৩ শতকের ওপর এই বাংলোটি গত ১৫ বছর ধরে এভাবেই পড়ে রয়েছে। সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ডানদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল বেগম রোকেয়ার পারিবারিক মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। একটি মিম্বার নিয়ে খুঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

মসজিদের পাশে বেগম রোকেয়ার পিতার কবর দেখা গেল; কিন্তু মাটি সমান হয়ে আছে। নামফলক তো দূরের কথা, একজন হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, এই জায়গাটাই বেগম রোকেয়ার পিতার কবর; যিনি বাংলা ১৩২০ সনের ৩১ বৈশাখ ইন্তেকাল করেছেন। আর একটু এগোতেই ডানদিকে চোখে পড়ল পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, যে বিদ্যালয়টি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাম দিকে বেগম রোকেয়া ক্রাফট লেখা একটি দোতলা ভবন, যে ভবনটি এখন কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। ডানদিকে চোখে পড়ল টিনের নামফলক, লেখা- বেগম রোকেয়া হস্তশিল্প। টিনশেড একটি ঘরে কিছু দেশি পণ্য নিয়ে একজন নারী বিক্রেতা বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, বেশি বিক্রি নেই। জানতে চাইলাম, প্রতিদিন কেমন লোকজন আসে? উত্তরে বললেন, আসে। প্রায় প্রতিদিনই আসে। তবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে লোকজনের আনাগোনা আরও বাড়তে পারত। চোখে পড়ল সেমি পাকা একতলা ভবনে বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ, পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতিগণকেন্দ্র পাঠাগারের নামফলক। সরকার থেকে কিছু অনুদান এবং কেউ কেউ বই উপহারের মাধ্যমে পাঠাগারটিতে গ্রন্থের সংখ্যা পাঁচ হাজার। আর একটু হেঁটে সীমানা দেয়াল দিয়ে বাঁধানো লোহার ফটক। ভেতরে প্রবেশ করতেই একজন বলছিল, এটাই বেগম রোকেয়ার বাড়ি। আমি বাড়ির দেয়াল খুঁজতে লাগলাম। চোখে পড়ল ভাঙা কয়েকটি দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ। বাড়িটির সীমানা বোঝা যাচ্ছিল; কিন্তু সব ধসে পড়েছে। মনটা নিমেষেই খারাপ হয়ে গেল। জানতে পারলাম, সামনে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র রয়েছে। মনে হলো, ওইখানে গেলে বোধ হয় কিছু দেখতে পাব। ২০০১ সালে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয়। 

নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এখন স্মৃতিকেন্দ্রটি কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে বাগানের মাঝখানে বেগম রোকেয়া ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মনের ভেতর একরকম বেদনা নিয়ে ফিরলাম। যেমন আশা করেছিলাম সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছু চোখে পড়েনি বলে। পাঠাগারটির সঙ্গে প্রথম থেকে জড়িত এমন একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, রোকেয়ার এই পৈতৃক বাড়ির জন্য কী করা উচিত? তিনি বললেন, এই স্থানগুলোকে পর্যটনের তালিকাভুক্ত করে নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রতিদিন ২০০ জনের মতো এখানে বেড়াতে আসে। যদি এখানে ২০০ কাপ চা বিক্রি হয়, তাতেও একজনের পরিবার আত্মনির্ভরশীল হতে পারত। পায়রাবন্দ থেকে ফেরার সময় তাজহাট জমিদারবাড়ি পরিদর্শনে গেলাম। প্রধান ফটকের সামনেই বানান ভুল করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু শব্দ। খুব আগ্রহভরে দেখার জন্য যখন জমিদারবাড়ি প্রবেশ করছিলাম, তখন দেখি প্রবেশপথের ফোয়ারাটি নিষ্প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ির হাতলগুলো রঙহীন। একটি মাত্র সিসিটিভি নিরাপত্তার জন্য। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে রঙ নেই। জমিদারবাড়ির পদ্মপুকুরের সামনে ইট বাঁধানো রাস্তা, সেখানে শ্যাওলা মাখা। পুরনো দেয়াল ভেঙে পড়েছে তার ধ্বংসাবশেষ। আশপাশের নানা রকমের জংলি প্রজাতির গাছ। তরুণ-তরুণীদের অবাধ বিচরণ। জমিদারবাড়ির ইতিহাসটি খোঁজার চেষ্টা করলাম; কিন্তু চোখে পড়ল না। 

রোকেয়ার বাড়ি ও তাজহাট জমিদারবাড়ি পরিদর্শন করে যখন ফিরছিলাম, তখন স্মৃতিপটে ভেসে উঠল কলিকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, বীরভূমের শান্তিনিকেতন, আগ্রা ফোর্ট, তাজমহল, আম্বার ফোর্ট, জলমহল, হাওয়া মহল, লাল কেল্লা এবং আরও অনেক পর্যটনের স্থান। যেগুলো থরে থরে সাজানো। একজন সমাজসচেতন নারী বেগম রোকেয়াকে যিনি জন্ম দিলেন, তার পিতার কবরটি এখন নিশ্চিহ্ন, পাশের মসজিদটিও বিলুপ্তির পথে। আমরা আমাদের ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন নই। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও অনেক ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যে স্থানগুলোকে সংরক্ষণের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাতক্ষীরা শ্যামনগরের জমিদারবাড়ি, মানিকগঞ্জের জমিদারবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা দুর্গ এবং আরও কত ঐতিহাসিক স্থান, যা সংরক্ষণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বেগম রোকেয়ার বাড়ির কাছে যে পরিত্যক্ত বাংলো, সেটিকে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি- বাড়ির সামনে পর্যটকদের জন্য বিশ্রাম কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদটির দ্রুত সংরক্ষণ, রোকেয়ার পিতার কবরকে চিহ্নিত করে সেটিকে সংরক্ষণ করা। পাঠাগারটিকে আধুনিক করা, রোকেয়া জাদুঘর করা, রোকেয়ার বাড়িটিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন এবং আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে বেগম রোকেয়ার পৈতৃক বাড়িটিকে নান্দনিকভাবে স্থানটিকে পর্যটন স্থান  হিসেবে ঘোষণা করা সময়ের দাবি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই স্থানটিকে যত্ন করলে এ এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে আমি মনে করি। মানুষ এখন অবসরে বেড়াতে পছন্দ করে। 

রংপুরের পায়রাবন্দও হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনন্য একটি স্থান এবং সেই সঙ্গে তাজহাট জমিদারবাড়ির জন্য যত্ন করা খুব প্রয়োজন। আমাদের ইতিহাসে যারা স্মরণীয় তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করা পবিত্র দায়িত্ব। যেখানে বাংলাদেশের নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে দেশের কৃষিকাজ পর্যন্ত সবটা জায়গায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন, সেখানে বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কতটুকু জুতসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি! তা পায়রাবন্দে রোকেয়ার বাড়ি পরিদর্শন করলে পরিস্কার হয়ে যাবে। যে মহীয়সী নারী সংগ্রাম করে নারীদের প্রতিষ্ঠিত করলেন, তার প্রতি ঋণ শোধ করার মোক্ষম সময় এখনই। সরকারের কাছে আবেদন, যদি সম্ভব হয় কলকাতা থেকে বেগম রোকেয়ার কবরের মাটি এনে আমাদের এই দেশে বেগম রোকেয়াকে সমাহিত করার ব্যবস্থা করা। বেগম রোকেয়া বাংলাদেশের মাটির সন্তান। তার দেহাবশেষ এই বাংলাদেশের রোকেয়ার পারিবারিক কবরস্থানে যদি ফিরে আসে, তাহলে তিনি আবারও ফিরে আসবেন আলোকবর্তিকা হয়ে। মিশে থাকবেন বাংলাদেশের মাটিতে। বেগম রোকেয়া তার একটি কথায় লিখেছেন- ‘ভারতের লোকেরা একটু চেষ্টা করলেই সূর্যোত্তাপ লাভের উপায় করতে পারেন। বিশেষ একখণ্ড কাঁচ দ্বারা যেমন রবিকর একত্রিত করে কাগজাদি দগ্ধ করা যায়, সেরূপ কাঁচবিশিষ্ট যন্ত্র নির্মাণ করতে অধিক বুদ্ধি ও টাকা ব্যয় হবে না।’ 
বেগম রোকেয়া আমাদের প্রেরণার উৎস। আমাদের অস্তিত্ব। তার পৈতৃক বাড়িকে পর্যটন স্থানে পরিণত করে দেশে-বিদেশে বেগম রোকেয়াকে নতুনভাবে পরিচিতি দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করলে বেগম রোকেয়ার সংগ্রামী জীবন এবং তার উদ্দেশ্য পথচলার জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে যুগে যুগে সব নারীর কাছে।
সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়