ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে জ্যামিতিক হারে

নিউজ ডেস্ক: নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে, তারপরও ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রতিদিনই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এর বিস্তৃতি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকেও ত্বরান্বিত করছে জ্যামিতিক হারে। এখন অনলাইনে কেনাকাটার বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি গড়ে উঠেছে। তাই লেনদেনও বেড়েছে। সহজ হয়েছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তি। দ্রুত বাড়ছে ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোর মতো অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার।

পাশাপাশি বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো বড় সাফল্য নিয়ে আসছে। তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ফ্রি ল্যান্সাররাও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ব্রডব্যান্ড সেবা গ্রাহকের কাছে সুলভে পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) বর্তমানে অনেক বেশি তৎপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ইন্টারনেট বিস্তৃতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করতে উদ্যোগী হলে ২০২১ সালের অনেক আগেই ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য শতভাগ অর্জিত হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, সরকার যে রূপরেখা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে, এর সুফল হিসেবেই দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। আগামী দু’-এক বছরের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হবে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা আরও সুলভে তৃণমূলের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া।

ইন্টারনেট ব্যবহার বিস্তৃতির চিত্র: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে চার কোটি ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার ৭৪৯ জন। ২০১৪ সালের জুন মাসে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৭৯ লাখ ২৩ হাজার ২৫১ জন। আর ২০১৮ সালের জুনে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট কোটি ৭৭ লাখ ৯০ হাজারে। অর্থাৎ, বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশ। অথচ ২০০৮ সালে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ গত ১০ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জুন মাসে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ তিন হাজার ৩১ জন। আর ২০১৮ সালে এসে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার। অবশ্য ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আইএসপিএবি সূত্র জানায়, প্রকৃতপক্ষে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় এক কোটি।

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বতোভাবে চেষ্টা করছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেবা বিস্তৃত করতে। সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে সরকার উদ্যেগী হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জন ২০২১ সালের আগেই সম্ভব হবে।

ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে: ইন্টারনেট বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ডিজিটাল পদ্ধতিতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠছে মানুষ। বিটিসিএল সূত্র জানায়, চলতি বছর ঈদুল ফিতরের সময় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সরাসরি বিদেশ থেকে আসা ভয়েস কলের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল। প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ভবিষ্যতে সরাসরি ভয়েস কল আরও কমবে। তবে এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশের সঙ্গে বিদেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো প্রভৃতির ব্যবহার বাড়ছে। উন্নত বিশ্বে এরই মধ্যে সরাসরি ভয়েস কল প্রায় বিলুপ্তির পথে। ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও সে পথেই এগিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে এখন কত রাজস্ব আয় হলো, সেটি বিবেচনা না করে ১০ বছর পর কত দূর এগিয়ে থাকা যাবে, সে চিন্তা করতে হবে। সরকারি নীতিতে এর প্রতিফলন ঘটলে জাতি অনেক বেশি সুফল পাবে।

শুধু যোগাযোগ নয়; বাংলাদেশে দ্রুত জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে অনলাইনে কেনাকাটা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-ক্যাব সূত্র জানায়, গত ঈদুল ফিতরে অনলাইনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেচা-কেনা হয়। গত বছর যা ছিল একশ’ কোটি টাকার কিছু বেশী। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানেই উৎসবকে কেন্দ্র করে অনলাইনে বেচা-কেনার পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার কেনার অর্ডার আসছে অনলাইনে; ডেলিভারিও হচ্ছে প্রায় সমপরিমাণ। পণ্য হাতে পাওয়ার পর তা পছন্দ না হলে সহজে তা পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে অনলাইনে কেনাকাটা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানাচ্ছে, বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে বাংলাদেশের ফ্রি ল্যান্সারের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ হাজার ফ্রি ল্যান্সার তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে নিয়মিত সক্রিয়। অনিয়মিত ফ্রি ল্যান্সারের সংখ্যা আরও প্রায় ৭৫ হাজার। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পেশাজীবী ২০ লাখে উন্নীত করার।

এ ছাড়া বর্তমানে জাপান, কানাডাসহ বিশ্বের প্রায় ১০ টি দেশে সফটওয়্যার রফতানি করছে বাংলাদেশ। বিশেষত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ডাটা সফটের জাপানে স্মার্ট ভবন প্রযুক্তি বাস্তবায়ন দেশের জন্য বড় গৌরব বয়ে এনেছে। ২০২১ সালের মধ্যে সফটওয়্যার থেকে এক বিলিয়ান ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্র: সমকাল