সোনায় হেরফেরে লাভ কার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা সোনার হিসাব ও ওজনে গরমিল নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের তৈরি করা প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এতে কার লাভ হলো? বা কার সুনাম ক্ষুণ্ন হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের, নাকি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বেলাশেষে কোনও পক্ষেরই লাভ হয়নি। কারণ, প্রমাণিত হয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের তৈরি করা প্রতিবেদন সঠিক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংককে হেয় করে যে পত্রিকা সংবাদ প্রকাশ করলো, তারাও প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি ভল্টের সোনায় হেরফের হয়েছে।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর দেশের অনেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে ঝুঁকির প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারও বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন অর্থ প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সভাশেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধেরেছেন। শুধু তাই নয়, গত বৃহস্পতিবার দুই পক্ষকে (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক) গণভবনে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (আন্তর্জাতিক চুক্তি) কালিপদ হালদারের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন প্রধানমন্ত্রী। শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় অতি দ্রুত যাতে এ সমস্যার সমাধান হয়, সে বিষয়ে উভয়পক্ষকেই নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা যেভাবে রাখা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আছে। কোনও প্রকার হেরফের হয়নি। এমনকি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ১৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ভল্টে রক্ষিত সোনা সব ঠিকই আছে।

এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী যেটা বলেছেন, তার বাইরে আমাদের কারও কোনও কথা বলার সুযোগ নেই।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনার ওজন ও মানে গরমিলের অভিযোগ এনে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের দেওয়া একটি গোপন প্রতিবেদন সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পরদিন বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরসহ সোনার মান যাচাইকারী এক স্বর্ণকারের ওপর বিষয়টির দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় এবং এই ভুলকে ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক’ বলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দারা সরাসরি এ বিষয়ে প্রত্যুত্তর না করলেও ওই স্বর্ণকার দাবি করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও ভুল করেননি।

ম. মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা তিন কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার চাকতি ও আংটি হয়ে গেছে মিশ্র বা শংকর ধাতু। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই প্রতিবেদনটি সঠিক, তাহলে ৯৬৩ কেজির মধ্যে মাত্র তিন কেজি ৩০০ গ্রাম সোনা নিয়ে বিতর্ক চলছে, যা মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। এই শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ সোনা ২২ ক্যারেট থেকে ১৮ ক্যারেটে অবনমিত হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ‘পরিদর্শন চলেছে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে এ বছরের ২৫ জানুয়ারি। বিষয়টি যদি এতটাই ভয়াবহ বলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের তদন্ত দল ভাবতো, তাহলে তারা বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে জানাতো। প্রতিবেদন দাখিল করতে ২৭০ দিন দেরি করতো না। অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ সোনা ২২ ক্যারেট থেকে ১৮ ক্যারেটে অবনমিত হওয়ার বিষয়টি এত দেরিতে প্রকাশ হতো না।’

ম. মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশিরভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাহলে সোনা ভল্টে জমা দেওয়ার সময় ২৪ ক্যারেট বা ২০ ক্যারেট সোনাকে যখন ১৮ ক্যারেট বলে সার্টিফিকেট দেওয়া হলো, তখন জমাদানকারী শুল্ক বিভাগের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেছিলেন কেন। এটাও দেখার বিষয়। আর ২৪ ক্যারেট সোনা কাগজে লিখলেই কি ১৮ ক্যারেট হয়ে হবে? ওই সোনা বাজারে নিলামে বিক্রি করতে গেলে সোনার ক্রেতারা পরীক্ষা করে সোনা কিনবেন, সার্টিফিকেটের তথ্য দেখে কিনবেন না।’

সূত্র: বাংলা  ট্রিবিউন