লর্ড ক্লাইভ থেকে লর্ড কার্লাইল

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মাননীয় সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী লর্ড কার্লাইল ভিসা নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে তাকে সম্মানের সঙ্গে ব্রিটেনে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তার দিল্লি গমনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল- বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন করা। একই উদ্দেশ্যে তিনি প্রথম ঢাকা যেতে চেয়েছিলেন। অনুমতি এখনও পাননি। লর্ড কার্লাইল তাতে ক্ষুণ্ণ হতে পারেন। আসলে তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী হয়েও নিজেই আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন।

বিএনপি তাকে খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনের লড়াই চালানোর জন্য নিযুক্ত করেছে। কিন্তু তাকে যে দলটির রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে, তা আমার জানা ছিল না। আইনের লড়াই চলে আদালতে। আদালতের বাইয়ে নয়। লর্ড কার্লাইলের দায়িত্ব ও এখতিয়ার খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াই চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি মক্কেলকে পরামর্শ দেবেন, সুযোগ পেলে আদালতে লড়বেন- এটা তার দায়িত্ব। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দলটির মুখপাত্র হয়ে দেশে-বিদেশে ক্যাম্পেইন চালানোর দায়িত্ব তার নয়। কিন্তু দেখেশুনে মনে হয়, সে দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি তার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন কিনা, এটা তিনিই বলতে পারেন। তাকে উপদেশ দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই।

লর্ড কার্লাইলকে বাংলাদেশে আসার ভিসা দেওয়া এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সঙ্গত কারণ আছে। যদি তা অসঙ্গত হয়ে থাকে, তাহলে তিনি নিজের দেশে বসেই তার প্রতিবাদ করতে পারেন। সংবাদ সম্মেলন ডাকতে পারেন। কিন্তু সে জন্য তিনি দিল্লি কেন যাবেন? বিদেশে গিয়ে আরেকটি বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাবেন কেন? আর সেই বিদেশি সরকার তাকে কী করে তার অনুমতি দেবে? সেই বিদেশি সরকার যেখানে ভারত, বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী এবং হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র!

লর্ড কার্লাইল জানেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল। এই দুই দলের মধ্যে বিরোধ শুধু রাজনৈতিক নয়, সংঘাতপূর্ণ আদর্শগত। আওয়ামী লীগ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান শক্তি। বিএনপি এই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির প্রধান নেতা। অন্য কোনো দেশ হলে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে রাজনীতিতে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ ও অধিকার খর্ব করা হতো। লর্ড কার্লাইলের নিজের দেশ ব্রিটেনে তা করা হয়েছে। ন্যাশনাল ফ্রন্টসহ বর্ণবাদী দলগুলোকে মাথা তুলতে দেওয়া হয়নি। সে জন্য লর্ড কার্লাইল কি তাদের হয়ে কথা বলতে যেতেন, না যাবেন?

বড়জোর তাদের কেউ কোনো অভিযোগে বিচারে সোপর্দ হলে তার জন্য আইনি লড়াইয়ে লর্ড সাহেব যেতে পারেন। তাদের মুখপাত্র সেজে কথা বলবেন কি? বললে ব্রিটেনের নাগরিক সমাজেই সম্মান পাওয়া দূরের কথা, কোনো ঠাঁই পেতেন কি? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা মিলে পরাজিত নাৎসি নেতাদের একতরফা বিচারে শাস্তি দেয়। তিনি তখন বর্তমান অবস্থানে থাকলে সেই বিচারের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন কি? যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কি সাফাই গাইতেন?

মানবতার শত্রু নাৎসি এবং ফ্যাসিস্টদের বিচারে যে কাজটি তিনি সম্ভবত করতেন না, সে কাজটি তিনি করেছেন বাংলাদেশের ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের বিচারের সময়ে। টবি ক্যাডমান নামে আরেক বিশিষ্ট ব্রিটিশ আইনজীবী এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি শুধু আইনজীবীর ভূমিকা পালন করেননি; জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় নেমেছিলেন। যে কাজটি লর্ড কার্লাইলও তখন করেছেন এবং এখনও করছেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য এমেরির পুত্র যেমন জার্মানিতে পালিয়ে গিয়ে নাৎসিদের ব্রিটিশবিরোধী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন; দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, টবি ক্যাডমান বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নিজ দেশে বসেই সেই বিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বময় প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। জামায়াতিদের মিথ্যা প্রচারণাকে তিনি সত্য বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন।

এই সময়েও লর্ড কার্লাইলের ছিল একই ভূমিকা। অনেক ব্রিটিশ লর্ডের যে চিরাচরিত ভূমিকা, নির্যাতিত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো, তিনি তার বিপরীত ভূমিকাটি নিয়েছেন। মানবতার শত্রুদের পক্ষ নিয়েছেন। এই পক্ষাবলম্বন শুধু আইনি পরামর্শে সীমাবদ্ধ থাকলে কথা ছিল না। না, তিনি তার বিশ্বব্যাপী প্রভাবকে বাংলাদেশের জামায়াত ও বিএনপির রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা সফল করার কাজে লাগিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশে বসে তাদের ‘হ্যানচম্যান’ হিসেবে কাজ করেছেন আরেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের জামাতা বাবাজি ডেভিড বার্গম্যান। এসবই কি জামায়াত ও বিএনপির অঢেল টাকার খেলার জন্য সম্ভব হয়েছে? এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। তারেক রহমান তো গৌরী সেনের অঢেল অর্থ নিয়ে লন্ডনেই বসে আছেন।

বাংলাদেশে লর্ড কার্লাইলকে কি আইনজীবী হিসেবে ভিসা দেওয়া এখনও বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে? সেটা আমার মনে হয় না। ‘৭১-এর মানবতার শত্রুদের পক্ষের একজন রাজনৈতিক প্রচারক হিসেবেই তার বড় পরিচয় থাকায় তার পক্ষে ভিসা পাওয়া হয়তো এখনও সম্ভব হয়নি। এটা অনেক দেশেই হয়ে থাকে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য দায়ী এই অভিযোগে মার্কিন সরকার একসময় তাকে আমেরিকা গমনের ভিসা দেয়নি। ব্রিটেনের লর্ড কার্লাইল যতই গণ্যমান্য লোক হন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু ও গণতন্ত্রের শত্রুদের রাজনৈতিক মুখপাত্র হয়ে কাজ করবেন এবং সে দেশে ঢোকার অনুমতি তাকে সহজে দেওয়া হবে, এটা তিনি কী করে আশা করেন?

ভারত ও ব্রিটেনের ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব বিদিত। তিনি সেই ব্রিটেনের হাউস অব লর্ডসের সম্মানিত সদস্য খ্যাতিমান আইনজীবী। তা সত্ত্বেও ভারত সরকার তাকে দিল্লিতে ঢোকার অনুমতি দিল না কেন? বাংলাদেশবিরোধী সংবাদ সম্মেলন করতে কেন দিল না? ভারত সরকারও কি তার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে? মোটেই না। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে তারই মিত্র দেশ বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে একজন বিদেশি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিষোদ্গার করবেন- স্বাভাবিকভাবেই মোদি সরকার তা মেনে নিতে পারেনি।

মোদি সরকার তাদের এই স্পষ্ট ভূমিকা দ্বারা বাংলাদেশের বিএনপি এবং ব্রিটেনের লর্ড কার্লাইল সাহেবকেও দুটি মেসেজ দিয়েছে বলে আমার মনে হয়। বিএনপির জন্য মেসেজটি হলো, মোদি সরকার হাসিনা সরকারের প্রতি বিরক্ত এবং তাদের দিকে ঘুরছে- তাদের এই প্রোপাগান্ডটি সঠিক নয়। তাই ভারত বারবার বলছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তারা হাসিনা সরকারের উন্নয়নের সহযোগী। এই উন্নয়নের প্রশংসা জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের কর্তাও সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে করেছেন।

লর্ড কার্লাইলের জন্য মোদি সরকারের মেসেজটি সম্ভবত এই, তিনি ব্রিটেনের গণ্যমান্য লর্ড এবং বিশিষ্ট আইনজীবী হিসেবে ভারতের মাটিতে অবশ্যই স্বাগত লাভের অধিকারী। কিন্তু প্রতিবেশী মিত্র দেশের সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার এবং সেদেশের চিহ্নিত অগণতান্ত্রিক শিবিরের দ্বারা নিযুক্ত রাজনৈতিক মুখপাত্র হয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারতের মাটি ব্যবহারের কোনো অধিকার তার নেই। তিনি নিজের অধিকারের সীমা অতিক্রম করেছেন।

ব্রিটেনে দীর্ঘকাল ধরে বাস করি। এ দেশ আধুনিক গণতন্ত্রের উৎসভূমি। বহু মনীষী ও মনীষার প্রসূতি। এ দেশের মানুষ রক্ষণশীল হলেও চরিত্রে কতটা সরল ও সহিষুষ্ণ, তা দেখেছি। আবার এ দেশের শাসকশ্রেণির শঠতা, ক্ষমতার দম্ভ, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও নিপীড়নের কথাও জানি।

দুইশ’ বছর আগে এই শাসকশ্রেণিরই একজন লর্ড ক্লাইভ বাংলাদেশে বাণিজ্যের জন্য গিয়ে নবাবের দরবারে বিনাশুল্ক্কে সে দেশে বাণিজ্য করার অনুমতি চেয়ে ভিক্ষুকের বেশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নবাবের সাহায্য ও সমর্থন পেয়েছিলেন, সে কথাও এখন ইতিহাস। তারপর ষড়যন্ত্র ও শঠতা দ্বারা সেই নবাবকেই তিনি দেশি মীরজাফরদের সহায়তায় হত্যা করেন এবং গোটা দেশটিতে লুটপাট চালিয়ে প্রচুর সম্পদ নিয়ে বিলাতে ফিরে এসেছিলেন। ব্রিটিশ শাসকরা তাকে লর্ড খেতাব দেয় বটে। কিন্তু ক্লাইভকে আত্মহত্যা করে তার জীবনাবসান ঘটাতে হয়। এ যুগের লর্ড কার্লাইল আমাকে ক্ষমা করুন; দেখেশুনে মনে হয়, তিনি এই লর্ড ক্লাইভদেরই উত্তরসূরি। প্রার্থনা করি, তার যেন লর্ড ক্লাইভের পরিণতি না ঘটে।

সূত্র: সমকাল