সুপারনিউমারারি পদোন্নতি চান ৪৯৫ পুলিশ কর্মকর্তা

নিউজ ডেস্ক:   সারাদেশের ৪৯৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য সুপারনিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি) পদোন্নতি প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশের পাঠানো এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রশাসন ক্যাডারে উপ-সচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দিয়ে এ-সংক্রান্ত জট নিরসন করা হয়েছে। অন্যান্য ক্যাডারেও এ পদোন্নতির প্রচলন রয়েছে। এমন বাস্তবতায় পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সুপারনিউমারারি পদোন্নতি প্রদানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গতকাল বুধবার সমকালকে এ তথ্য জানায়।

এর আগে চলতি বছরের মার্চে পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিসি গ্রুপের বৈঠকে বলা হয়, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উচ্চতর পদে পদোন্নতি দেওয়া অত্যাবশ্যক। তাই সুপারনিউমারারি পদোন্নতি অত্যন্ত জরুরি। এ ব্যাপারে তখন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন পুলিশ মহাপরিদর্শক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আছাদুজ্জামান মিয়া  বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই সুপারনিউমারারি পদোন্নতি চাওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় পুলিশে গ্রেড-১, গ্রেড-২ পদও কম।’

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুলিশ ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের চাকরি সন্তোষজনক; স্বাভাবিকভাবেই এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদোন্নতিও প্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষা। তবে বাস্তবতার নিরিখে উচ্চতর পদে পদোন্নতি সম্প্রতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশের পর্যালোচনায় উঠে আসে, প্রশাসন ক্যাডারে সচিব (গ্রেড-১) পদের সংখ্যা মোট ক্যাডারের ১.২৭ শতাংশ। তবে পুলিশের গ্রেড-১ পদ দুটি, যা মোট ক্যাডারের মাত্র ০.০৭ শতাংশ। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে তুলনা করলে পুলিশে গ্রেড-১ পদ থাকার কথা ৩৮টি। প্রশাসন ক্যাডারে গ্রেড-২ (অতিরিক্ত সচিব) পদে সুপারনিউমারারিসহ কর্মরত আছেন ৩৭৪ জন। পুলিশে গ্রেড-২ পদ মাত্র ১৩টি। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে তুলনা করলে পুলিশে এ ক্ষেত্রে পদ থাকার কথা ২২৭টি। পুলিশে গ্রেড-৩ (যুগ্ম সচিব) পদ রয়েছে ৬২টি। তবে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে তুলনা করলে পদ থাকার কথা ৩৬৫টি। গ্রেড-৫-এ পুলিশের জনবল রয়েছে ৬৫৩টি। একই বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে পুলিশের পদ থাকার কথা ৮০৪টি।

প্রস্তাবে বলা হয়, সড়ক ও জনপথ, ফরেন সার্ভিস, শুল্ক্ক ও আবগারি এবং কর ক্যাডারের তুলনায়ও পুলিশের উচ্চতর পদে ঘাটতি রয়েছে। পুলিশের নেতৃত্ব পর্যায়ে কর্মস্পৃহা, মনোবল, মর্যাদা, শৃঙ্খলা, গতিশীলতা নিশ্চিত করতে উচ্চতর পদের আনুপাতিক ও তুলনামূলক অপর্যাপ্ততা একটি বড় অন্তরায়। বর্তমান সরকারের আমলে অন্যান্য সংস্থার মতো পুলিশে জনবল বাড়লেও উচ্চতর পদের প্রসারণ কাঙ্ক্ষিত অনুপাতে হয়নি। বর্তমানে ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ ব্যাচের ১১ জন কর্মকর্তার কর্মকাল ৩০ বছর অতিক্রান্ত হলেও তারা গ্রেড-১-এ পদোন্নতি পাচ্ছেন না। একইভাবে ১৯৯১, ১৯৮৯ এবং ১৯৮৫-র বিসিএসে যোগ দেওয়া ৪২ জন ডিআইজির কর্মকাল ২৭-৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের গ্রেড-২-এর পদোন্নতি এখনও অনিশ্চিত।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রেড-১ পদে ১১ জন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য বছরে আরও চার লাখ ৯৮ হাজার ৪৮০ টাকা প্রয়োজন হবে। তবে অন্যান্য পুলিশ ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দেওয়া হলে বাড়তি কোনো অর্থের প্রয়োজন হবে না। কারণ এরই মধ্যে এসব ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রত্যাশিত পদের প্রারম্ভিক বেতন স্কেল অতিক্রম করেছেন। ৪৯৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে অতিরিক্ত আইজি (গ্রেড-১) পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ২ জন, অতিরিক্ত আইজি (গ্রেড-২) পদে ১৯৮৫ ব্যাচের ৭ জন, ১৯৮৯ ব্যাচের ১৬ জন, ১৯৯১ ব্যাচের ১৯ জন। ডিআইজি (গ্রেড-৩) পদে ১৯৮৫ ব্যাচের ৩ জন, ১৯৮৯ ব্যাচের ৮ জন, ১৯৯১ ব্যাচের ১০ ও ১৫তম বিসিএসের ২৪ জন। অতিরিক্ত ডিআইজি পদে ১৯৮৯ ব্যাচের ৪ জন, ১৯৯১ ব্যাচের ৫ জন, ১৫তম বিসিএসের ১৩ জন, ১৭তম বিসিএসের ১৮ জন, ১৮তম বিসিএসের ২৬ জন। পুলিশ সুপার পদে ১৭তম বিসিএসের ৩ জন, ১৮তম বিসিএসের ২ জন, ২০তম বিসিএসের ১১ জন, ২১তম বিসিএসের ৯ জন, ২২তম বিসিএসের ৮ জন, ২৪তম বিসিএসের ৯২ ও ২৫তম বিসিএসের ১৮৮ জন।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসন ক্যাডারের মতো পুলিশে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দেওয়া হলে মাঠ পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মনোবল চাঙ্গা হবে। এ প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি হলে কর্মকর্তারাও পদবঞ্চিত হবেন না।

এর আগে চলতি বছর পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে পুলিশের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এসব প্রস্তাবে বলা হয়, প্রশাসনের অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের তুলনায় পুলিশে গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদে কর্মকর্তা অনেক কম। সরকারের বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে এক দশমিক ১৭ থেকে চার দশমিক ৪৫ শতাংশ গ্রেড-১ এবং ৫-১০ শতাংশ গ্রেড-২ পদ আছে। তবে বাংলাদেশ পুলিশ সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে। পুলিশে বর্তমানে ক্যাডার পদ রয়েছে দুই হাজার ২৮৯টি। এর মধ্যে মাত্র দুটি গ্রেড-১ ও ১৩টি গ্রেড-২ পদ রয়েছে। ২০১৭ সালের পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও এখনও ৩টি গ্রেড-১ পদ সৃষ্টি করা হয়নি। পাঁচটি গ্রেড-১ পদের বিপরীতে দুটি পদ সৃষ্টি হয়েছে। পদ না থাকায় ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা একই পদে আটকে আছেন। সব যোগ্যতা থাকার পরও শূন্য পদ না থাকায় ২৭-৩০ বছর দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার পরও শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেড-৩ (ডিআইজি) ও গ্রেড-৪ (অতিরিক্ত ডিআইজির সমতুল্য) পদে আটকে আছেন। তাদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন যারা একেবারে অবসরের দ্বারপ্রান্তে। শুধু পদ না থাকায় অনেকে অ্যাডিশনাল আইজি হতে পারছেন না।

পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ভারসাম্যহীন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, নিবিড় তদারকিসহ সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন ব্যাহত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে জননিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে। একই পদে এক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে তার কাজেও সেটার প্রভাব পড়ে বলে জানান তারা।