কিশোর বয়সের সন্তান ও অভিভাবকদের ভাবনা

আলম শামস: দশম শ্রেণির ছাত্র রকি। প্রায় রাতেই ঘরে ফিরতে দেরি করে। মাঝে মাঝে রাতেও বাসায় আসে না। মা ঘরে না ফেরার কারণ জানতে চাইলে রকি বলে, ফ্রেন্ডদের সাথে ক্লাসের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিল। রাত হয়ে যাওয়ায় আর বাসায় ফিরিনি, এতে টেনশনের কী আছে? আমি অবুজ শিশু নাকি, হারিয়ে যাব? মা বলেন, তোর বাবা দেশে থাকেন না। তুই একমাত্র সন্তান, তোর জন্য টেনশন হবে না কার জন্য হবে? লোকমুখে শুনি তুই নাকি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাস আর আড্ডা দিস, মেয়েরা সামনে দিয়ে গেলে শিস দিস, এসব কথা ভালো লাগে না, আমি শেষবারের মতো বলছি, আর যদি কোনো অভিযোগ শুনি তবে তুই আমার মরা মুখ দেখবি।

কলেজ পড়–য়া কিশোরী পিংকি। প্রায় দেরি করে ঘরে ফিরে। বিভিন্ন অজুহাতে সময়-অসময়ে ঘর হতে বেরিয়ে যায়। মা-বাবার কথা মানতে চায় না। তারা কিছু বললে পিংকি বলে আমি কী ছোটো খুকি, ভালো-মন্দ বুঝব না, এখন সময় পাল্টে গেছে, তাই নিজেকে সময়োপযোগী করতে না পারলে আমি পিছিয়ে যাব। মা বলেন- ওহ, তাই নাকি? ছোটো পোশাক পরা, কলেজ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ানো, রাত জেগে বিদেশি চ্যানেল দেখা, বাবার টাকায় চাইনিজ খাওয়া কী আপডেটেড হওয়া?

এসব তর্ক শুধু পিংকি আর রকিদের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়। টিন এজ বয়সি ছেলে-মেয়ের আচরণ বন্ধ করতে আদর-সোহাগ ও মমতা মাখানো এ ধরনের শাসন চলছেই। এর বিকল্পই বা কি!

অনেকেরই অভিযোগ- টিন এজ সন্তানরা মা-বাবার কথা শুনছে না, ইচ্ছেমতো চলছে, ঘুরছে, মন যা চায় তাই করছে, ভালো-মন্দ ও পাপ-পুণ্য বিবেচনা করছে না। না বুঝে বিভিন্ন অন্যায়, অপরাধ, অনৈতিক ও পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে এই কিশোর-কিশোরীদের জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।

সন্তানের সুরক্ষা আমাদেরই দায়িত্ব। এ বয়সে ভুল হতে পারে। তাই তাদের প্রতি সুনজর দেওয়া জরুরি। উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়েরা কী করে, কোথায় যায়, কাদের সাথে মিশে, কীভাবে সময় কাটায় এসব আপনার আমার সবারই দৃষ্টি রাখা একান্ত প্রয়োজন। একটি ভুলে তাদের জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।

মাদকের অবাধ বিস্তারে একটি সমাজ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উঠতি বয়সি কিশোর-তরুণরা আজ বিপথগামী। এ জন্য প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অভিভাবক, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ছাড়াও সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারেন। মা-বাবা নিয়মিত সন্তানের খোঁজখবর রাখলে ও সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হলে সন্তান অন্যায় পথে পা বাড়াবে না আশা করা যায়।

অনেক মা-বাবাকে দেখা যায়, সন্তানকে অতিমাত্রায় শাসন অথবা অতিমাত্রায় আদর করতে। এর কোনোটাই সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কারণ অতি আদর ও শাসনের ফলে ছেলে-মেয়েরা বখে যেতে পারে। তাই মা-বাবাকে সন্তানের সাথে বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানরা যখন হীনমন্যতায় ভোগে বা একাকী ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখনই সে বিপথে পা বাড়ায়। তাই অভিভাবকরা যতই কর্মব্যস্ত হয়ে পড়–ন না কেন, সন্তানের একাকীত্ব দুর করতে তাদের সময় দিতে হবে। তাদের ভালোবাসার বন্ধনে আগলে রাখতে হবে।

সন্তানদের মার্জনার চোখে দেখে ছোটোখাটো ভুলগুলো শুধরে দিতে হবে। সকল প্রকার অপরাধপ্রবণতা থেকে বাঁচতে হলে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি। মহান ব্যক্তিদের আদর্শে সন্তানদের পরিচালিত হতে উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি বড়োদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে শেখাতে হবে। আদর্শ ও মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পড়তে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, মা-বাবাকেও সৎ-নীতিবান হতে হবে। কারণ মা-বাবাকে দেখেই সন্তান শেখে। তাঁদের মূল্যবোধ সাধারণত সন্তানরা অনুসরণ করে। ছেলে-মেয়েকে জীবন চলার প্রতিদিনের রুটিন করে দিলে সুফল পাওয়া যাবে।

রুটিন মতো চলছে কী-না খোঁজ রাখতে হবে নিয়মিত। সে প্রতিদিন স্কুলে-কলেজে যাচ্ছে কী-না, কাদের সাথে মিশছে, বন্ধুদের পরিচয় কি, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অবসর সময়ে সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে খোঁজ রাখতে হবে। তার মোবাইল, ডেস্কটপ বা লেপটপে কী কী ডাউনলোড করা আছে পরখ করা ছাড়াও সে যেসব সাইটে ঢুকছে তারও খেয়াল রাখতে হবে; সাইবার ক্যাফেতে কী কাজ করছে; সন্তান নেশায় জড়িয়ে পড়ছে কী না খেয়াল রাখতে হবে; সন্তান কোন ধরনের খেলা খেলছে এবং কাদের সাথে খেলছে সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এসব করতে যেয়ে সন্তান যাতে অতি নজরদারীতে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। কারণ যে কেউ অতি মাত্রায় নাক গলানো পছন্দ করবে না।

বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করছে এমন সময় শারীরিক পরির্বতন সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে; বিভিন্ন উপলক্ষে সন্তানকে শিক্ষামূলক বই উপহার দিলে কাজে আসতে পারে; শিক্ষামূলক টিভির অনুষ্ঠান দেখতে উৎসাহিত করার পাশপাশি সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসব অনুষ্ঠান দেখাসহ শিক্ষাসফর বা ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করা যেতে পারে। এতে তাদের মন প্রফুল্ল থাকবে।

মা-বাবার ব্যক্তিগত সমস্যা, ঝগড়া, দ্বন্দ্ব থেকে সন্তানকে দূূরে রাখতে হবে। শিশু কারো সম্পর্কে অভিযোগ করলে বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে সন্তোষজনক সমাধানে সাহায্য করতে হবে।

সন্তান ছোটো, অবুঝ, তার ভুল হতে পারে। আমরা অভিভাবকরা যদি ভালোভাবে হাল ধরতে না পারি, তবে তার জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। তাদের একটি ভুলের কষ্ট সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হতে পারে। সন্তান প্রতিপালনে অভিভাবকের সচেতনতাই পরিবারের শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

পিআইডি প্রবন্ধ