কেরানীগঞ্জ শুভাঢ্যা খাল উদ্ধারে কোন তৎপরতা নেই

এইচ.এম এরশাদ কেরানীগঞ্জ: কেরানীগঞ্জের পুরনো ঐতিহ্যবাহী শুভাঢ্যা খালটি দখল, চারদিকে গার্মেন্টস্ ,বাড়ির ময়লা -আবর্জ্যনায় প্রায় ভরাট। কোন কোন স্থান ভূমিদস্যুদের দখলে, ভরাট করে দোকানপাট, বাড়ি তৈরি, হাউজিং কেম্পানীর ছোবড়ে চলে গেছে। সংস্কার বা উদ্ধারে নেই কোনো তৎপরতা। বুড়িগঙ্গা নদীর পূর্ব আগানগর এলাকা থেকে শুরু করে আগানগর ও শুভাঢ্যা হয়ে তেঘরিয়া ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুর দিয়ে পাইনার চর খালের সাথে সংযুক্ত হয়ে ধলেশ্বরী নদীর সাথে গিয়ে মিলেছে। খালটির দৈর্ঘ প্রায় ১২ কিলোমিটার। সদরঘাট থেকে মালামাল কিনে মাঝি গয়না-নৌকা চালিয়ে গন্তব্য স্থানে পৌছে দিত। গোলাম বাজারের পাকা ঘাটে শত শত লোক গোসল করতে লাইন দিত ,অল্প দিন আগের কথা। খালটিতে থৈ-থৈ করে পরিস্কার স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও জোয়ার ভাটা মানুষ উপলব্দি করতে পারত।

খালের পানিতে পাড়ের লোকজন রান্না-বান্নার কাজসহ বাড়িঘরের সকল কাজেই এই পানি ব্যবহার করত। জোয়ার ভাটার স্রোত ছিল খালটিতে । এই খালে গয়নার নৌকা চলাচল করতো। এছাড়া এই খালটি ছিল, গোলামবাজার, ঝাউবাড়ি, কদমতলী, শুভাঢ্যা, বেগুনবাড়ি, চড়াইল, রাজেন্দ্রপুর, বাঘৈরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। বিভিন্ন মালবাহী নৌযান যাতায়াত করতো। কৃষকরা ইরিধান করতো, বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে লোকজন খেতে কাজ করতো, নভ্যতা হারানোর কারনেই সেই চাষাবাদ নেই আজ। যা এখন রূপ কথার গল্পে পরিণত হয়েছে।

২০০৭ সালে যৌথ বাহিনী পূর্ব আগানগরের গুদারাঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর মুখ থেকে শুভাঢ্যার কালিবাড়ী পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায়। সে সময় পাড়ে গড়ে উঠা পাকা ,সেমিপাকা বিল্ডিং সহ অবৈধ ১৮৬টি স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। কিছু জায়গায় সরকারের অভিজান চালায় । তখন ফিরতে শুরু করেছিল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। ২০১২ সালে জুলাই মাসে উপজেলা প্রশাসন খালটি পুন:খনন ও সংস্কারে ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয় করেন। তাছাড়াও দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি ও কাবিখা প্রকল্পের আওতায় বর্জ্য অপসারণ ও নাব্যতা সৃষ্টির লক্ষে ২০ লাখ টাকা ব্যয় করেন।

শুভাঢ্যার কালিবাড়ী থেকে চরকালিগঞ্জ ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বর্জ্য অপসারণ, খালটি পুন:খনন ও তীর সংরক্ষণের জন্য ২০১৪ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট ফান্ড থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় কালিবাড়ী আধা কিলোমিটার, গোলামবাজার থেকে চরকুতুব পর্যন্ত খালের তলদেশ থেকে বর্জ্য অপসারণ ও খনন করা হয়। ব্লক বসানো হয় কালিবাড়ী থেকে চরকালিগঞ্জ পর্যন্ত। তবে, ব্লক বসানোয় খালটি পূর্বের চেয়ে প্রশস্ততা অনেক কমে গেছে।

সরেজমিন প্রতিবেদন করতে গেলে এলাকাবাসী বিভিন্ন অভিযোগ করে বলেন, পূর্ব আগানগরের জেলা পরিষদ মার্কেটের পিছনে খালে বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ও আগাছা জমে প্রায় ১০ ইঞ্চি পরিমাণ স্তর পড়ে গেছে । যে কেউ এর উপর দিয়ে হেটে চলাচল করতে পারবে। কালিগঞ্জ জোড়া ব্রীজ এলাকার অবস্থা আরো সোচনীয় । কালিগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জ্যনা, পলিথিন, বাঁশের ঝুড়ি, হাস-মুরগীর পালক, হাডিড থেকে শুরু করে জবাইকৃত গরু-মহিষ ও ছাগলের নাড়ি-ভূড়ি ফেলছে। নয়াশুভাঢ্যা ও কৈবর্তপাড়া এলাকায় খালের ভিতর হাজার হাজার পলিথিনের ব্যাগসহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে খালটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এসব জায়গায় পানির কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কালিগঞ্জ জোড়া ব্রীজ থেকে কৈবর্ত পাড়া পর্যন্ত খালের পাড় দখল করে অনেকেই বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। এসব এলাকায় ছোট-বড় শতশত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও দোকান-পাট গড়ে উঠায় সেখান থেকেও বিভিন্ন বর্জ্য নিয়মিত ফেলা হচ্ছে। আমবাগিচা, কদমতলী ও ঝাউবাড়ি এলাকায়ও ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর। এখানে খালে কিছুটা পানির অস্থিত্ব দেখা গেলেও তা দূষিত হয়ে বিষে পরিণত হয়েছে। বেগুনবাড়ি এলাকায়ও কলকারখানা এবং বাড়িঘরের ময়লা-আবর্জনা ফেলে দূষিত করে ফেলছে।

গোলাম বাজার এলাকায় পাড়ে অবৈধ কয়েক শতাধিক দোকান-পাট নির্মাণ করে হাজার হাজার টাকা লুট-পাট করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ করেন, যে টাকা খনন ও ময়লা পরিস্কারের নামে সরকার ফান্ড দিয়েছেন, সে টাকা দিয়ে আরো একটি খাল কাটা যেত।

এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহে এলিদ মাইনুল আমিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী খালটি সংস্কার ও উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা বর্জ্য অপসারনের কাজ শুরু করেছি। খালটিকে পুন:খনন করা হবে এবং এর দুই পাড়ের তীর সংরক্ষণ করা হবে। অপসারণ করা হবে সকল ভাসমান বর্জ্য এবং পানি প্রবাহের ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা হবে। ময়লা-আবর্জ্যনা ফেলতে না পারে সেটা তদারকি করার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রিন্স, ঢাকা