আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মাণ হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

মো: কামরুল ইসলাম ভূইয়া: পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঢালাই কাজের উদ্বোধন করেন। রাশিয়ার আর্থিক সহায়তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এ কেন্দ্রে রাশিয়ার সর্বাধুনিক থ্রি প্লাস জেনারেশনের ‘ভিভিইআর ১২০০’ প্রযুক্তির পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরো ১২০০ মেগাওয়াটসহ মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে টানা ৬০ থেকে ৮০ বছর নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বাধ্যবাধকতা প্রতিপালন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তার সবগুলো দিক যেমন পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ, রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল ব্যবস্থাপনা, রেগুলেটরি অথরিটির প্রতিষ্ঠাসহ আনুষঙ্গিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নিরাপত্তার প্রথমেই আসে রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বা প্রযুক্তি নির্বাচন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন করা হয়েছে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক রিঅ্যাক্টর- ভিভিইআর-১২০০ (AES 2006)। বর্তমানে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিতে রাশিয়ায় নির্মিত দুইটি বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। রাশিয়ার নভোভরোনেজ এনপিপিতে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে এবং এ বছর ২০১৮ সালের মার্চ মাসে লেনিনগ্রাদ এনপিপি ইউনিট-১ থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এছাড়াও রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে রাশিয়ায় ছয়টি, তুরস্কে চারটি, বেলারুশে দুইটি, হাঙ্গেরিতে দুটি, ফিনল্যান্ডে একটি ও মিশরে চারটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

ওয়াটার-ওয়াটার এনারজেটিক রিঅ্যাক্টর (ভিভিইআর) হচ্ছে প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (পিডবিøউআর) ধরনের যা রাশিয়ান প্রযুক্তি। বর্তমানে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টর। পৃথিবীর ৩০টি দেশে চালু ৪৫০টি রিঅ্যাক্টর এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি এবং ১৬টি দেশে ৫৯টি নির্মাণাধীন রিঅ্যাক্টর এর মধ্যে ৪৯টি-ই পিডব্লিউআর। অন্যান্য প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর এর মধ্যে বয়লিং ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (বিডব্লিউআর) চালু ৭৫টি, নির্মাণাধীন চারটি, ফার্স্ট বর্ডার রিঅ্যাক্টর (এফবিআর) চালু তিনটি, নির্মাণাধীন একটি, গ্যাস কুলড রিঅ্যাক্টর (জিসিআর) ১৪টি, নির্মাণাধীন একটি, প্রেসারাইজড হেবী-ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (পিএইচডবিøউআর) চালু ৪৯টি, নির্মাণাধীন ৪টি উল্লেখযোগ্য।

ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তিটি নতুন, কিন্তু এর ভিত্তি হচ্ছে পরীক্ষিত ও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ভিভিইআর ১০০০ প্রযুক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তিতে নির্মিত ও নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় ৫০টি। এর মধ্যে রাশিয়ায় ১৫টি, বুলগেরিয়ায় দুটি, ইউক্রেনে ১৪টি, চেক প্রজাতন্ত্রে দুটি, ভারতে চারটি, ইরানে চারটি এবং চীনে আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। রাশিয়ার এ প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার গাইডলাইন ও আধুনিক চাহিদাগুলো সম্পূর্ণভাবে পূরণ করে। ১৯৮০ দশক থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ বছর ধরে ভিভিইআর ১০০০ প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ও হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

দুর্ঘটনা ছাড়াই বহুবছর ধরে সফলভাবে ভিভিইআর পরিচালিত হয়ে আসছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতের কুদানকুলাম বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটেও এটি বাস্তবায়ন করা হয়, যা ২০১৩ সালে ভারতের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় এবং ২০১৪ সালের জুলাই থেকে পরিপূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিষয়ক সবচেয়ে পুরোনো ম্যাগাজিন ‘পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং’ ভারত ও ইরানে রাশিয়ান প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ২০১৪ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শ্রেণির ‘প্রজেক্টস অব দি ইয়ার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তৃতীয় প্লাস প্রজন্মের। এর সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এ রিঅ্যাক্টরে পাঁচস্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য রয়েছে যাতে কোনোক্রমেই তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। পাঁচস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথমটি হচ্ছে ফুয়েল পেলেট, যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় তার জ্বালানি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়, ফলে তেজস্ক্রিয় ফিশন প্রোডাক্টসমূহ পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে। দ্বিতীয়টি ফুয়েল ক্ল্যাডিং, ফুয়েল পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি ফুয়েল ক্ল্যাডিং দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে। বিশেষ কোনো কারণে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রোডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হয়ে আসলেও তা এই ক্ল্যাডিং ভেদ করতে পারবে না।

এর পরের স্তরে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল যা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য বিশেষ মান-নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরু ইস্পাত দিয়ে তৈরি করা হয়, যা উচ্চ তেজস্ক্রিয় অবস্থাতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়। চতুর্থটি হলো প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং যা রিইনফোর্সড কনক্রিট দিয়ে ১.২ মিটার পুরুত্বের তৈরি যেটি যে-কোনো পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে। এবং পঞ্চমটি হলো দ্বিতীয় কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করার জন্য আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং-এর পর আরও ০.৫ মিটার পুরুত্বর একটি কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং যুক্ত করা হয় যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা ইত্যাদি থেকে প্ল্যান্টকে সুরক্ষা করে। এই পাঁচস্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যর কারণে মানব সংঘঠিত কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন- শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প, বন্যা ইত্যাদির প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম থাকবে এই পারমাণবিক চুল্লি।

এই পাঁচস্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তির রয়েছে অনন্য ও অপ্রতিদ্ব›দ্বী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কোর ক্যাচার। পারমাণবিক দুর্ঘটনারোধ ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় রাশিয়ান প্রকৌশলীদের দিয়ে উদ্ভাবিত ও নির্মিত একটি পরিকল্পিত অনন্য ডিভাইস। এটি পারমাণবিক চুল্লির নিচে স্থাপিত একটি বিশেষ কন্টেইনার। জরুরি অবস্থায় পারমাণবিক চুল্লির তরল ও কঠিন পদার্থগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটির ভিতরে এসে জমা হয় এবং সুরক্ষিত থাকে।

পারমাণবিক দুর্ঘটনা ও মেল্টডাউনের ক্ষেত্রে কোর ক্যাচার গলিত পারমাণবিক পদাথর্কে সীমাহীন সময়ের জন্য ধরে রাখতে পারে। ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাইরে বেরিয়ে আসতে বা ছড়িয়ে পড়তে পারে না। রাশিয়ান প্রযুক্তিতে নির্মিত চীনের তিয়ানওয়ান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সর্বপ্রথম এটি ব্যবহার করা হয়। আরেকটি অনন্য নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হলো প্যাসিভ হিট রিমুভাল (পিএইচআর) পদ্ধতি। এ প্রযুক্তিটি মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়াই বিদ্যুৎ না থাকা অবস্থায় বা প্ল্যান্টে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের সময় অবশিষ্ট তাপ অপসারণ এবং রিঅ্যাক্টর কোরকে শীতল করে। ভারতের কুদনকুলামে ও রাশিয়ার নভোভরোনেজ ইউনিট- ২-তে এটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং তুরস্কের আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও এটি ব্যবহার করা হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ৮-৯ মাত্রার ভ‚মিকম্পেও প্ল্যান্ট নিরাপদ থাকবে। বন্যাপ্রবণ এদেশে প্ল্যান্টকে বন্যামুক্ত রাখার জন্য গত ১০০ বছরের বন্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করে রিঅ্যাক্টর এর স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। জাপানের ফুকুসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনার পর যেসব প্রতিকার ও প্রতিরোধের বিষয় উঠে এসেছে তা বিবেচনায় নিয়ে রূপপুরের রিঅ্যাক্টরের ডিজাইন করা হয়েছে। এছাড়া ৫.৭ টন পর্যন্ত ওজনের বিমানের আঘাতেও এটি অক্ষত থাকবে। সর্বশেষ প্রজন্মের অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং থেকে ৮০০ মিটারের (এক্সক্লুসিভ জোন) বাইরেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মতো যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিশাল জনগোষ্ঠির ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ঝুঁকি ও বিপদ মোকাবিলায় শুরু থেকেই সরকার সচেতন। বর্তমান সরকারের উন্নয়নাদর্শ হলো দেশের ও দেশের মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ। এ উন্নয়নাদর্শ অনুযায়ী এ মেগা প্রকল্পেও দেশের এবং দেশের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে নিরাপত্তার ওপর দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। বাছাই করা হয়েছে বর্তমান সময়ের সেরা প্রযুক্তি ভিভিইআর-১২০০। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পাওয়ার বা শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

পিআইডি প্রবন্ধ